![]() |
||
|---|---|---|
| প্রথম পাতা | প্রতর্ক্য | |
|
সেদিন এবং এখনো গত পরশু সাঁঝের গভীরে পায়ে হেঁটে গ্রামের পথে চলেছি। সঙ্গে কমঃ বাসু। খড়িবাড়ির যে গ্রামে আমাদের পার্টির ব্লক কমিটির মিটিং তার নাম হাতিডোবা। কমঃ চানেশ্বর সিংহ-এর বাড়িতে ঢোকার মুখে দেখি বাড়ির ভেতরের উঠোনে গ্যাস বাতির আলোয় বেশ ভীড়। প্রথমে ভাবলুম আমাদের কমরেডরা বুঝি সবাই অনেক আগেই চলে এসেছেন। তাই তাঁদের রাতের খাওয়া ও আলোচনার জন্যই এহেন আয়োজন। ভুল ভাঙলো বাড়িতে ঢুকতেই। মাটি দিয়ে লেপা বারান্দার একপাশে ঝলমল করছে একটি আনকোরা স্কুটি আর একটা বড়সড় টেলিভিশন। আমরা চমকিত। জিজ্ঞাসা করার আগেই চানেশ্বর জানালেন এসব জুটেছে লটারী জেতার দৌলতে। উঠোনে মস্ত বড় হাঁড়িতে ততক্ষনে আশেপাশের গ্রামের মানুষজন জমা করে রান্নাবান্না শুরু হয়ে গেছে, ভোজের। শংকিত হলুম। আমাদের মিটিং এই অপ্রত্যাশিত উৎসবের মেজাজে চৌপট না হয়। আমাদের আশংকা তাকে জানিয়ে আমরা পার্টি কমরেডদের নিয়ে বসে পড়লাম খোলা আকাশের নীচে, সংগঠনকে মজবুত করতে করনীয় যা কিছু নিয়ে আলোচনায়। মিটিং হল ঠিকঠাক। এবারে আমাদের ভুরিভোজের(!!!) পালা। হঠাৎ শুনি চানেশ্বরের লাজুক বৌ নাকি জ্বরের ঘোরে বেবাক ভুল বকছে। ইতিমধ্যে হাজির করা হয়েছে ডাক্তার নামধারী এক ফচকে হাতুড়ে তিনি অ্যালোপ্যাথীর চিকিৎসার "first line of treatment" শুরু করেছেন ততক্ষনে। কিছুপরে শুরু হল মহিলাটির অন্যজগতের সাথে কথা চালাচালি। ডাক্তার বাইরে অনেকক্ষন বসে থাকার পর হঠাৎ ঘরে ঢুকে বিড়বিড় করতে থাকা মহিলাকে চিৎকার করে নাম জিজ্ঞাসা করে চলেছেন , সে কিছুতেই পরপুরুষের কাছে নিজের নাম বলবেনা। বেশ কিছুক্ষন জবরদস্তির পর ডাক্তারবাবু নিদান দিলেন এতো জ্বর নয়, পাশের গ্রাম কিলাঘাটার কুখ্যাত ভুত মংলু মহিলার শরীরে ঢুকে পড়াতেই এই বিপত্তি। এবার গ্রামের কজন ডেকে নিয়ে আসে একজন ওঝাকে। চলতে থাকে ভুত ছাড়ানোর সার্কাস । আমাদের আপত্তি, প্রতিবাদ ভেসে যায় গ্রামের লোকজনের তুমুল বিশ্বাসের তোড়ে। শেষে সেই মহিলা নিজেই জেহাদ দেখিয়ে সব লাজলজ্জা ভুলে উঠোনের মাঝখানে বসেই পেটপুরে রাতের খাওয়া সেরে কিছুক্ষনের মধ্যে ঘরে ঢুকে গভীর ঘুমে অসাড়। অন্তরতদন্তে জানলুম আগের দুদিন অপুষ্টিতে ভোগা তিনটি শিশুর হিত কামনায় উপোসে কেটেছে তার। বাড়িভর্তি লোকের খাবারদাবার তৈরীর জাঁকজমকে সবাই তাকে ভুলেছে। জ্বরের ঘোরে ছোট্ট ঘরের অন্ধকার কোণে পরে থাকা অভুক্ত মহিলাকে কারো মনে পড়েনি। কেউ একটুখানি খেয়ে নিতে বলেনি। প্রতিবাদের আর কোনো রাস্তা না দেখে অবচেতনে যুগ যুগ ধরে জমিয়ে রাখা পুরুষ-অবহেলার বিরুদ্ধে তার স্মৃতি থেকে পরিচিত টোপ মংলু-ভুতের অশরীরি অস্তিত্ব আঁকড়ে ধরে তবেই তাকে নিজের দাবি আদায় করতে হয়েছে। সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে কুয়োতলার দিকে মুখ ধুতে যেতেই একগাল হেসে আমার দিকে টুথপেষ্ট এগিয়ে দেয় সে। ভাবতে থাকি এভাবেই কি মেনে নিয়ে, মানিয়ে নিয়ে চলতে থাকবো আমরা, আর কতদিন! গ্রামীন সমাজে বিজ্ঞানমনস্কতা কি এতটাই ব্রাত্য? বামমতাদর্শের লক্ষনই বা কোথায়? এই তো সেই চারদশক আগের নকশালবাড়ি আন্দোলনের রক্তাক্ত প্রান্তর! মন ভেঙে যায়না তবু, ভাবি কত নিবিড় কাজ এখনও বাকি। বাকি কত পথ চলা, চলতেই হবে বরং একা এবং কয়েকজন। ।
... আর একটা কথা, রাত্রের ওই সংকটের মধ্যেও চানেশ্বর তার বৌকে মাধ্যম করে পরের বারের লটারীর টিকিটের নাম্বার জেনে নিতে চাইলে ওই জেহাদি মেয়ের মুখে এক চিলতে হাসি ছাড়া আর কিচ্ছু দেখিনি।
|
|