name
প্রথম পাতা প্রতর্ক্য  

 

শাহরিয়ার কবির

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে নীরব দুর্ভিক্ষ ও জরুরি অবস্থা

 

খালেদা-নিজামীদের জোট সরকারের মন্ত্রীরা না বুঝলেও উত্তরবঙ্গের প্রায় এক কোটি প্রান্তিক মানুষ প্রতি বছর নভেম্বরে মঙ্গাক্রান্ত হয়। মঙ্গার ধকল সামলে ওঠার আগেই হিমালয় থেকে নেমে আসে নির্মম শৈত্যপ্রবাহ। দারিদ্রসীমার নীচে অবস্থানকারী অসহনীয় অপুষ্টির শিকার এই জনগোষ্ঠী শৈত্যপ্রবাহের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। জীবিতরা অপেক্ষা করে আগামীতে আরও নির্মম মঙ্গা ও শৈত্যপ্রবাহের।

উত্তরবঙ্গের এ বছর শীতের প্রকোপ গত দেড় দশকের চেয়ে বেশি ছিল। শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে গত দেড় মাসের শীতে। দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহের পর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাষ অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক জনগোষ্ঠি এই জানুয়ারিতে আরও একটি বা দুটি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের আশংকায় অনাহারে অর্ধাহারে দিনযাপন করছে।

শৈত্যপ্রবাহে মৃত্যুর প্রাত্যহিক সংবাদের ভেতর গত ৯ জানুয়ারি জনকন্ঠের শেষের পাতায় উত্তরবঙ্গের একটি সংবাদ আমাদের অত্যন্ত বিচলিত করেছে। 'দিনাজপুরে সংখ্যালঘুর ৫০ বাড়িতে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়েছে সন্ত্রাসীরা' – শিরোনামের এই সংবাদে বলা হয়েছে, 'প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাত্র ১৩ দিন আগে দিনাজপুর সদর উপজেলার পল্লীতে রবিবার গভীর রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি পাড়া পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আমুইর গ্রামে খাসজমিতে গড়ে ওঠা ৫০টি বাড়িতে সন্ত্রাসীরা আগুন ধরিয়ে দিলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। রামদা ও হাঁসুয়া নিয়ে শতাধিক সন্ত্রাসী ভূমিহীন হিন্দু সম্প্রদায় অধ্যুষিত এই গ্রামটি চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে। লোকজন ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় ৫০টি বসতবাড়িতে তারা পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘুমন্ত লোকজনের আর্তচিৎকারে পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন ছুটে এলে সন্ত্রাসীরা শম্পা রানী () নামে এক শিশুকে আগুনে ছুঁড়ে দেয় এবং ঐ সব বাড়িতে বসবাসরত দেড় শতাধিক মানুষকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। রাত ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত দুই ঘন্টাব্যাপী সন্ত্রাসীদের এই তান্ডবে গ্রামটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বাড়িঘর জ্বালিয়ে চলে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা সব ক'টি বাড়ির মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। তাদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই পায়নি বাড়ির থালাবাসন থেকে শুরু করে গৃহবধুর নাকের ফুল পর্যন্ত। তাদের হামলায় আহত হয় কমপক্ষে ২২ জন। এর মধ্যে ৬ জনকে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে প্রায় দু'শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দেয়। এই ঘটনার পর গ্রামটিতে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের দেড় শতাধিক ভূমিহীন মানুষ বর্তমানে প্রচন্ড শীতের মধ্যে খোলা আকাশের নীচে মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।'

মঙ্গা ও শৈত্যপ্রবাহের শিকার হয় জাতিধর্ম নির্বিশেষে প্রান্তিক জনসাধারণ। এদের ভেতর নিঃসন্দেহে অধিকতর প্রান্তিক – যারা সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত। দিনাজপুরের আমুইর গ্রামে দুষ্কৃতিকারীরা যাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা সবাই সাঁওতাল ও হিন্দু সম্প্রদায়ের। জনকন্ঠে অসহায় বিপন্ন মানুষের উপর ভূমিদস্যুদের নৃশংস নির্যাতনের মর্মন্তুদ সংবাদ পড়ে আমরা স্থির করেছিলাম – যতটুকু সাধ্যে কুলোয় এই দুঃসময়ে ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। নির্মূল কমিটির বন্ধুরা যে যতটুকু পেরেছেন সব একত্র করে একশ কম্বল, শাড়ি, লুঙ্গি আর কিছু নগদ টাকা নিয়ে ১১ জানুয়ারি আমরা দিনাজপুর গিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সমাজসেবামূলক সংগঠন 'যাত্রিক' – এর সভাপতি নাবিল মুনতাসীর ও তার সহযোগি সেলিম। নাবিলরা আমাদের ত্রাণ তহবিলে দশ হাজার টাকা দিয়েছে।

দিনাজপুরে নির্মূল কমিটির বন্ধুরা আগের দিন উপদ্রুত এলাকায় গিয়ে যাদের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল তাদের নাম ও পরিবারের সদস্য সংখ্যার তালিকা তৈরি করে রেখেছিলেন। ১১ তারিখ বিকেলেই তাদের সঙ্গে আমরা আমুইর গিয়েছিলাম। শহর থেকে বেশি দূরে নয় , বেশ কিছুটা পথ কাঁচা, গাড়ির ঝাঁকুনিতে মনে হচ্ছিল আমার ভাঙা পায়ের নাটবল্টু সব খসে পড়বে।

তিনপাশে গ্রাম, একপাশে ধানক্ষেত, মাঝখানে পাঁচ ছয় বিঘা খাস জমির উপর পঞ্চাশ ঘর ভূমিহীন পরিবার ঘর বেঁধেছিল কয়েক মাস আগে। আমাদের সামনে এখানে সেখানে শুধু ছাইএর স্তূপ। কোনো ঘরের চিহ্ন ছিল না, কোথাও আধপোড়া বাঁশের খুঁটির কাঠামো দেখে বুঝে নিতে হয়েছে সেখানে ঘর ছিল। ৪২টি বাড়ির দেড়শ নারী-পুরুষ- শিশু-বৃদ্ধ আশ্রয় নিয়েছে পাশের প্রাচীন বটগাছের তলায়। নিজেদের জীবন ও পরনের কাপড়টুকু ছাড়া আগুনের হাত থেকে কিছুই বাঁচানো যায়নি।

হামলার চারদিন পরও তাদের চোখে অসহায়ত্ব ও আতঙ্কের ছায়া। দুঃসহ বেদনাক্রান্ত মুখের দিকে তাকানো যায় না। কথা বলার সময়ে ভয়ে কাঁপছিল, খবরের কাগজে যা বেরিয়েছে ঘটনার ভয়াবহতা তার চেয়ে অনেক বেশি। আমরা পরিবার প্রতি পাঁচশ টাকা দিয়েছিলাম। প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য, একজন বললো চারদিন ভাত খায়নি' এ টাকা থেকে চাল কিনে ভাত রেঁধে ছেলেমেয়েদের মুখে দেবে।

সন্ধ্যেবেলা শহরে ফিরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছি প্রেসক্লাবে বসে। এ ধরনের হামলা ও নির্যাতনের শিকার আর্ত মানুষের অবস্থা জানবার জন্য যখন দুর্গত এলাকায় যাই তখন সবার আগে কথা বলি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে। গ্রাম -বাংলার সাংবাদিকরা অসহায় মানুষের উপর হামলা ও নির্যাতনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু ক্ষেত্রে নিজেরাও নির্যাতনের শিকার হন। খালেদা-নিজামীদের চার দলীয় জোট সরকারের আমলে রাজধানীর বাইরে ১৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। জোট সরকারের দলীয় সন্ত্রাসী ও প্রশাসনের হাতে নিগৃহীত হয়েছেন প্রায় এক হাজার সাংবাদিক। তারপরও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকরা দমে যাননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তারা এখনও দুর্গম অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভাব -অভিযোগ-নির্যাতন-বঞ্চনার কথা লিখে যাচ্ছেন।

দিনাজপুরের সাংবাদিক বন্ধুদের মোনাজাতউদ্দিনের কথা বলেছি। রংপুরের মোনাজাতউদ্দিন বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর উত্তরসূরীরা আছেন। উত্তরবঙ্গের মঙ্গা সম্পর্কে মোনাজাতউদ্দিনের গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন দেশবাসীকে সচেতন করবার পাশাপাশি ধিক্কার দিয়েছে রাষ্ট্রপরিচালকদের।

সাংবাদিকরা বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। বলেছি - আপনারা উত্তরবঙ্গের মঙ্গা ও শৈত্যপ্রবাহকবলিত অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান, যাতে সরকার ও বেসরকারী সংস্থাগুলো বিপন্ন মানুষকে বাঁচাবার জন্য জরুরিভিত্তিতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। খবরের কাগজে যৎসামান্য কম্বল বা শীতবস্ত্র বিতরণের যে ছবি দেখি প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য, যা প্রান্তিক মানুষের প্রতি নির্মম রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। এক থানায় এক লাখ মানুষের জন্য একশ কম্বল দেয়া হয়েছে। এর সরল অর্থ – এক হাজার মানুষকে একটা কম্বল ভাগ করে গায়ে দিতে হবে।

১১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দিনাজপুর প্রেসক্লাবে বসে সাংবাদিকদের যখন উত্তরবঙ্গের দুর্গত এলাকায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার কথা বলছিলাম ঠিক তখনই টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠল সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারির খবর। এরপর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার মোড় ঘুরে গেল দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জরুরি অবস্থার ইতি ও নেতিবাচক বিষয়ের দিকে।

প্রেসক্লাবে থেকে আমাদের যাওয়ার কথা ছিল দিনাজপুরের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধানের অন্যতম রচয়িতা অ্যাডভোকেট আবদুর রহিমের বাড়িতে, যাঁকে গত ৪ নভেম্বর আমরা ঢাকায় সংবর্ধনা প্রদান করেছি ডঃ কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামসহ অন্যান্য সংবিধানপ্রণেতার সঙ্গে। তাঁর কনিষ্ঠপুত্র ইকবালুর রহিম আগামী নির্বাচনে দিনাজপুরে মহাজোটের প্রার্থী, যার প্রতিদ্বন্দী হচ্ছেন স্বয়ং খালেদা জিয়া।

দিনাজপুরে নির্মূল কমিটির সভাপতি উলফাতুর রহমান কাজল ও তাঁর সহযোগীরা আমাদের নিয়ে গেলেন আবদুর রহিমের আশি বছরের পুরোনো বাড়িতে। সেখানে ইকবালের সুপরিসর নির্বাচনী অফিস ভরা ছিল আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের তরুণ নেতাকর্মীদের দ্বারা। সবার একটাই প্রশ্ন – এই জরুরি অবস্থা ভাল না খারাপ।

তখনও রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেননি, তিনি প্রধান উপদেষ্টা পদ ছেড়েছেন কি না জানি না। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মহাজোটের কর্মীদের বলেছি – আপনারা ২২ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করেছেন। আপনাদের দাবি অনুযায়ী নির্বাচনের তারিখ পেছাতে হলে জরুরি অবস্থার কোন বিকল্প নেই। জরুরি অবস্থা জারি না করে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৮ জানুয়ারির পর একদিনও ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।   

এরপর মধ্যরাতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনে মনে হয়েছে এতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাঐক্যজোটের আন্দোলনের আংশিক দাবি পূরণ হয়েছে – যা অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের ৭৫ দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা -নিজামীদের ৪ দলীয় জোটের প্রথম পরাজয়। কারণ খালেদা-নিজামীরা বার বার বলেছেন যে কোন মূল্যে ২২ জানুয়ারি নির্বাচন করতেই হবে, মহাঐক্যজোটের কোন দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মানা সম্ভব নয়, বলা যেতে পারে প্রধানতঃ পশ্চিমের উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রসমূহের আগ্রহ ও চাপের কারণে রাষ্ট্রপতি সমূহ সংঘাত এড়াবার জন্য জরুরী ঘোষণা করেছেন। এরপর তিনি অবিতর্কিত এবং সজ্জন হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তণ গভর্ণর ফখরুদ্দিন আহমেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে সংক্ষুব্ধ মহাঐক্যজোটের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে খালেদা - নিজামীদের চার দলীয় জোট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ফখরুদ্দিন আহমেদের নিয়োগে সন্তুষ্ট হয়নি। নিজামী ও জোটের অন্যান্য নেতা এই নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতা সম্পর্কে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন।

বাংলাদেশের মানুষের চরম দুর্ভাগ্য এই যে – সব সময় দুই মন্দের ভেতর 'মন্দের ভালো' বেছে নিতে হয়েছে, প্রকৃত অর্থে ভালোর কোন উদাহরণ আমাদের সামনে নেই। জরুরি অবস্থা জারি কখনও কাম্য হতে পারে না। জরুরি অবস্থা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারসমূহ থেকে নাগরিকদের বঞ্চিত করে। কোন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সন্দিগ্ধ হয়। অথচ এবার দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের পাশাপাশি জাতিসংঘসহ পশ্চিমের উন্নয়ন সহযোগীরাও জরুরি অবস্থা ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। সংবাদ প্রকাশের উপর বিধিনিষেধের সমালোচনা করলেও কলাম লেখকরা জরুরি অবস্থা সমর্থন করেছেন। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের কঠোর সমালোচক বরেণ্য কলাম লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী জরুরি অবস্থার প্রশংসা করে পর পর দুটো কলাম লিখেছেন।

২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য খালেদা-নিজামীদের চার দলীয় জোটের প্রচন্ড গোঁয়ার্তুমি এবং এর বিপরীতে হাসিনা- মেনন-ইনু-এরশাদ-বদরুদ্দোজাদের মহাঐক্যজোটের নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের হুমকি দেশকে যে সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছিল – জরুরি অবস্থা জারি না করে একতরফা নির্বাচন পেছানো যেত না, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে রাষ্ট্রপতিও সসম্মানে পদত্যাগ করতে পারতেন না। সাধারন মানুষ যৌক্তিক কারণেই জরুরি অবস্থা জারির ফলে স্বস্তিবোধ করেছেন।

আমরা যারা খালেদা-নিজামীদের জোট সরকারের নির্যাতনের শিকার, যারা গত পাঁচ বছর ধরে চার দলীয় জোটের 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' – এর পাকাপোক্ত ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করছি, তারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে এখনও সন্দিহান। কারণ ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখনই প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কার এবং নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে চার দলীয় জোট তা হতে দেবে না। বিএনপি নেতা ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদা ইতিমধ্যে পরিবর্তন সম্পর্কে আওয়ামী লীগের উচ্ছ্বাস দেখে মন্তব্য করেছেন – চার দলীয় জোটকে বাদ দিয়ে মহাজোট কি একতরফা নির্বাচনের কথা ভাবছে?

জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশে যে সব কঠিন কথা বলা হয়েছে তার শানে নজুল এখনও অনুধাবন করা যাচ্ছে না। এতে সভা সমাবেশ এবং এতদসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নির্দেশ অমান্যকারীদের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডসহ চৌদ্দ বছরের কারাদন্ডের বিধানেরও কথা বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে এর বিরুদ্ধে আদালতে কোন মামলাও করা যাবে না। আগামী ১৯ জানুয়ারি আমরা প্রতিবছরের মতো কেন্দ্রে এবং দেশব্যাপী 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র ১৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। জরুরি অবস্থা জারির অনেক আগেই এই দিন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে সকল শাখাকে কেন্দ্র থেকে সার্কুলারও পাঠানো হয়েছে। ১৪ জানুয়ারি জরুরি ক্ষমতা অধ্যাদেশ জারির পর আমাদের উপদেষ্টারা বললেন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন স্থগিত করবার জন্য। নিছক একটা সভা করে ফাঁসিতে ঝোলা সমীচীন হবে না বলে ভাবছেন আমাদের সম্মানিত উপদেষ্টারা। নির্মূল কমিটির যুক্তরাষ্ট্র শাখার সাধারণ সম্পাদক তরুণ কবি হাসান আল আবদুল্লাহ গতকাল ওয়েব সাইটে প্রকাশিত এক লেখায় প্রশ্ন তুলেছেন, জরুরি অবস্থায় সকল মৌলিক অধিকার যখন স্থগিত – বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যগহণ বা স্ত্রীগমণের মৌলিক অধিকার থাকবে তো? এর পরদিন ১৫ জানুয়ারি দৈনিক জনকন্ঠের প্রধান শিরোনাম ছিল – 'মৌলিক অধিকার অক্ষুন্ন থাকবে'। এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নতুন উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভায়। একদিকে বলা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে, (দ্রষ্টব্যঃ জনকন্ঠ ১৫ জানুয়ারী ২০০৭) অপরদিকে মৌলিক অধিকার স্থগিত করা সত্ত্বেও মহামান্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন তারেক জিয়ার দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের প্রধান সহযোগী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে গ্রেফতার করা যাবে না। যত জরুরি অবস্থায় জারি হোক না কেন, ভোগান্তির শিকার হবে এডাব ও প্রশিকার উন্নয়ন কর্মীরা, কখনও গিয়াস মামুন – তারেক জিয়ার গ্যাং এর কেশাগ্রটি স্পর্শ করা যাবে না।

রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের জরুরি অবস্থা ঘোষণা সাধারণ মানুষের ভেতর স্বস্তি এনে দিলেও এর মাশুল কে কীভাবে গুণবেন তা আগামী দিনগুলোতে দেখার অপেক্ষায় আছি, যদি না সরকারের সমালোচনা করে ফাঁসিতে ঝুলি। ১৫ জানুয়ারি কয়েকটি দৈনিকে লেখা হয়েছে মহল বিশেষের চাপের কারণে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ পদত্যাগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত হবেন অধিকতর কট্টর বিএনপি হিসেবে পরিচিত স্পীকার জমিরউদ্দিন সরকার। তাঁকে অখুশি করে কি ভোটার তালিকা থেকে পাকিস্তানি ও বর্মি রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেয়া যাবে, না বাদপড়া হিন্দুদের নাম ঢোকানো যাবে? ভোটার তালিকায় এসব তেলেসমাতি করাই হয়েছে বিএনপি-জামাত জোটের অভিপ্রায় অনুযায়ী যা নীলনকশার নির্বাচনের অন্তর্গত।

ভোটার তালিকার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে উত্তরবঙ্গের মঙ্গা ও শৈত্যপ্রবাহের শিকার আর্ত মানুষদের কথা। আমুইর যাওয়ার আগে ভেবেছিলাম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নির্যাতিত মানুষদের জিজ্ঞেস করব ভোটার তালিকায় তাদের নাম আছে কি না। আমুইরে ভষ্মিভূত জনপদে দাঁড়িয়ে বুধানী কিস্‌কু, ধুমা টুডু, হাপনা হেমরম আর সিক্রি হাঁসদাদের সন্ত্রস্ত, অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে এ প্রশ্ন করবার সাহস হয়নি। উত্তরবঙ্গের মঙ্গাকবলিত এলাকায় এখন নিরব দুর্ভিক্ষ অবস্থা বিরাজ করছে। যে কোটি মানুষের দিন কাটে উপবাসে, একখন্ড শীতবস্ত্রের অভাবে যারা শৈত্যপ্রবাহের ছোবলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তারা কি জানে ভোটার তালিকায় তাদের নাম আছে কি না? তারা কি জানে কী তাদের মৌলিক অধিকার? জরুরি অবস্থা কি তাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের মৌলিক অধিকারও স্থগিত করেছে? তা যদি না হয় উত্তরবঙ্গকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে বাঁচাবার জন্য সরকার ও বেসরকারী সংস্থার উদ্যোগে এখনই সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক। এই এক কোটি মানুষের জন্য ভোটের আগে ভাত- কাপড়ের ব্যবস্থা বেশি দরকার।

১৫ জানুয়ারি, ২০০৭।

 
counter