name
প্রথম পাতা নিবন্ধ  

 

 

 

সব্যসাচী সরকার
তাড়িত আর্সেনিক!

অন্যান্যদের নিবন্ধ

অভিজিৎ মজুমদার

আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

বানীপ্রসন্ন মিশ্র

অশেষ দাস

সব্যসাচী সরকার

 

 

১৯৫৩ সালে রোমের রাজকীয় প্রাসাদোপম বাড়িতে bed chember বসে সকালের কফি খেতে খেতে নিজের ফেলে আসা দিনগুলি ভাবছিলেন প্রেসিডেন্ট Isenhower এর প্রিয়পাত্রী ও ইটালিতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত Mrs Clare Booth Luce। প্রেসিডেন্ট বড় কঠিন কাজ দিয়েছেন, কারণ সময়টা cold war-এর আর ইতালিতে কমুনিষ্ট পার্টির শক্তি অনেক ৷ পুরানো সফলতার সোপানগুলি, একাধারে ‘Vanity Fair’ এর সম্পাদক, ‘The Women ’ এর মত জনপ্রিয় নাটকের নাট্যকার, লাইফ ম্যাগাজিন এর সাংবাদিক, ‘Time Magazine’-এর প্রতিষ্ঠাতা, Henri Luce-এর সঙ্গে বিয়ে ও আরো কত কি -- একে একে চোখের সামনে ছবির মত দৃশ্যপটের পরিবর্তন হচ্ছিল ৷ কিন্তু কফিটা এত তেতো কেন? আর কেনই বা এতে মেটালিক স্বাদ? না, যুদ্ধের পরে ইতালিতে কিছুই ভাল জিনিষ পাওয়া যায় না ৷ নিজের প্রিয় কফি আমেরিকা থেকেই আনাবেন মনস্থ করলেন ৷ আমেরিকার কফিতেও একই স্বাদ না রোমের হাওয়াতেই সব কিছু বিস্বাদ! সময় এগিয়ে চলে আপন খেয়ালে ৷ অবশেষে ১৯৫৪ তে কাজে কর্মে তাঁর স্বাস্থ্য বাধা হয়ে দাঁড়াল ৷ তিনি বুঝতেই পারছিলেন না কেন তাঁর মাথার চুলগুলি কমে যেতে লাগলো, হাতে-পায়ের নখগুলি সব যেন ভঙ্গুর, কেন তাঁর দাঁতগুলি পড়ে যেতে লাগলো, রক্তাল্পতা, পায়ে সময় সময় স্নায়ুগুলি যেন জবাব দিয়ে যেতে লাগলো ৷ কিন্তু তিনি সহজে হার মানার পাত্রী নন, আর তাই প্রায় আরো দু বছর লড়ে গেলেন এই না জানা অসুখের সাথে ৷ পরিশেষে তিনি রোম ছাড়তে বাধ্য হলেন ৷ আমেরিকাতে তাঁর এই রোগ ধরা পড়ল ৷ প্রথম তিনটি উপসর্গের কারণ হিসেবে জানা গেল ক্রমাগত আর্সেনিক এর প্রয়োগ ঘটেছে তাঁর শরীরে আর পরের দুটি উপসর্গের কারণ lead বা সীসা ৷ অনুসন্ধানে ধরা পড়ল যে রোমের সেই প্রাসাদোপম বাড়ির সিলীং (ceilling) এর পেইন্টিং হিসাবে ব্যাবহৃত হয়েছিল lead arsenate আর প্রত্যেক দিন সেই পেইন্ট সমৃদ্ধ সিলীং থেকে ধূলোর মত lead arsenate বেরিয়ে আসতো ৷ Mrs Claire Booth Luce শুধু তাঁর কফিতেই এই ধুলো পেতেন না, নিশ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমেও এই ধুলো তাঁর শরীরে প্রবেশ করত ৷ আমেরিকাতে সুচিকিত্সার মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ হয়ে ১৯৮৭ সাল পযর্ন্ত বেঁচে ছিলেন৷

আর্সেনিক দিয়ে মানুষ মেরে ফেলার অনেক বিষাক্ত ইতিহাস আছে, কিন্তু দৈনিক ব্যবহারে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ভিক্টোরিয়ান যুগ খুবই প্রভাবিত হয়েছিল ৷ কাপড়ের রঙে, খেলনাতে, ওয়ালপেপারে, পেইন্ট-, এমনকি খাবারের প্যাকেটেও ব্যাবহৃত হতো ৷ এছাড়াও ওষুধ হিসাবে এর ব্যবহার প্রায় সেই Hippocrates (খ্রীস্ট পূর্ব ৪৬৬-৩৭৭)-এর সময় থেকে, যখন “riyelgaar” (যার বাংলা প্রচলিত নাম "মনছাল") আলসারের জন্য ব্যবহৃত হত ৷ ১৮৮৯ সালের মেটিরিয়া মেডিকাতে “acid arsenusএর প্রয়োগ “ম্যালেরিয়া জ্বর, স্কিনের অসুখ, কলেরা, নিউরালজিয়া, পেটের অসুখ, মুত্র রোগ, ডায়েবেটিস, ব্রঙ্কাইটিস ও ক্যানসার " ইত্যাদিতে করা হত বলে লেখা আছে৷ এর মধ্যে দুটি আর্সেনিকের মিশ্রন খুব নাম করেছিল৷ প্রথমটি হল Donovan এর সলিউশন (এটি আর্সেনিক আর মার্কারি আয়োডাইড এর মিশ্রণ) আর দ্বিতীয়টি হল Fowler এর সলিউশন (পটাশিয়াম আর্সেনাইট এর দ্রবণ)৷ ১৯৮৯ সালের মেটিরিয়া মেডিকাতে এও লেখা আছে যে এটি “খালি পেটে খাইবেন না” । সেই সময় এই দ্রবণ সাধারণ ভাবে যেকোন শারীরিক অসুবিধায় ব্যবহৃত হত ৷ এমন কি ১৯৯৬ সালের Merck Index-এও এই দুটি দ্রবণের কথা লেখা আছে ৷ Fowler- এর সলিউশন London Pharmacopoeia তে ১৯০৯ সালে স্থান পায় ৷ সাধারন ওষুধ ছাড়াও বিশেষ ভাবে এক antineoplastic antitumor agent হিসাবেও স্কিনের সমস্যা দূর করতে এর ব্যবহার হত ৷ উনিশশো শতাব্দীতে সাধারণ ভবে বলা হত যে ডাক্তারদের সব কাজ শুধু “আর্সেনিক” আর “আফিং” (opium) এর মত দুটো ওষুধ দিয়েই হতে পারে ।

জনশ্রুতি আছে যে Charles Darwin তাঁর একজিমার জন্য Fowler এর সলিউশন ব্যবহার করতেন ৷ ১৯০৫ সালে sodium p-aminophenylarsonate-এর নাম ছিল atoxil আর এটি মানুষের এর ঘুমের সমস্যায় (Tripaanosomiasis) মোটামুটি ভালো ই ফল দিত ৷ এই রকম রসায়নের ব্যবহারে উত্সাহ পেয়ে Ehrlich তাঁর কাজ শুরু করেন, যা পৃথিবীতে chemotherapy-র আরম্ভ বলে ধরা যেতে পারে । Ehrlich-এর তৈরী arsephenamine (salvarson) সিফিলিস রোগের ক্ষেত্রে ছিল “ম্যাজিক বুলেট” ৷ Atoxil বা aresephenamine-এর অবশ্য বিষাক্ত ওষুধ বলে দুর্নাম ছিল যা সচরাচর রোগিদের মৃত্যু ঘটিয়ে সম্পূর্ণ রোগমুক্ত করে দিত! পরে কম বিষাক্ত 3-amino4-hydroxyphenylarsinoxide hydrochloride (অন্য নাম: oxophenarsine hydrochloride Mapharsen) ওষুধ প্রচলিত হওয়াতে রোগিরা বাঁচার আশা দেখতে পেল ৷ ১৯৪০-এ অন্যান্য ওষুধ, Melarsoprol, pentamidine অথবা Suramin সঙ্গে ব্যবহৃত হতে শুরু করায় Africa trypanosomiasis রোগের উপশম সহজতর হয়ে উঠল ৷ একটি চৈনিক ওষুধ, যাতে বিষাক্ত Arsenus Oxide থাকে, তা acute leukemia (APL)-এ ব্যবহার হত ৷ ১৯৯৭ সালে Memorial Sloan Kettering Cancer Centre, USA-এর ডাক্তারেরা এই চৈনিক ওষুধ থেকে শুধু Arsenus Oxide কে বেছে নিলেন ৷ ওষুধের ব্রান্ড নাম হল Trisenox আর সেটি হল আসলে Arsenic Trioxide ৷ APL-এর চিকিত্সাতে আশ্চর্য ভাবে ভালো ফল পাওয়া যেতে লাগল ৷ সেপ্টেম্বর, ২০০১ সালে এই Trisenox ওষুধ হিসাবে APL রোগীদের ব্যবাহারের জন্য FDA, USA-এর স্বীকৃতি পেল ৷

এদিকে আর্সেনিকের বিষাক্ত প্রভাব থাকা সত্ত্বেও এর ব্যাবহার খাবারের সাথে ও প্রসাধন সামগ্রী হিসাবে অনেক দিন থেকেই প্রচলিত। এটা সম্ভব হলো কি করে? শুনলে কিন্তু অবাক লাগবে যে ১০-২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিক খাবারের সাথে প্রায় প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। প্রতিদিন প্রস্রাবের সাথে প্রায় ততোধিক আর্সেনিক শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। জাপানীরা লোকেদের শরীরের এ বেশী আর্সেনিক পাওয়া যায়। এর জন্য দায়ী তাদের সামুদ্রিক খাবারে রুচি। কিছু সামুদ্রিক প্রানীর প্রয়োজনীয় ধাতূর সুচীতে আর্সেনিক ও থাকে এবং সেই সূত্রে ওই সব সামুদ্রিক প্রানী খাদ্য হিসাবে জাপানের লোকেদের শরীরে আর্সেনিকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। Styria নামে এক অস্ট্রিয়ান প্রদেশের লোকেরা Arsenicophagy আর Arsenophagy হিসাবে বিগত শতাব্দীতে পরিচিত ছিল। এর সোজাসুজি অর্থ হলো যে এরা আর্সেনিক যুক্ত অনেক ধরনের জিনিষ খাবার হিসাবে ব্যবহারে করতো। মানুষের বিশ্বাস ছিল যে আর্সেনিক শরীরের সৌন্দর্য ও ত্বকের মসৃণতা বাড়াতে আর ভালোভাবে শ্বাস নিতে সাহায্য করে, যা পাহাড়ে ওঠার পক্ষে অপরিহার্য। এই ঘটনাগুলি বিস্তারীতভাবে ইউরোপে ও বিশেষভাবে ইংলন্ডে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় আর্সেনিক এক অতি প্রয়োজনীয় বস্তু হিসাবে বেশিরভাগ বাড়িতেই স্থান পেয়েছিল। Styrian রা প্রায় প্রতি সপ্তাহে তিন দিন ১৩০ মিঃগ্রাঃ করে আর্সেনিক অক্সাইড খেত। আজ আমরা জানি যে ১০০ মিঃগ্রাঃ arsenic trioxide মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। এই সব ঘটনা থেকে এটাই প্রমানিত হয় যে ক্রমে ক্রমে একটু একটু করে আর্সেনিক খেয়ে এই সব লোকেরা ভাল ভাবেই বেঁচে থাকাটা এবং তা ব্যাক্তিবিশেষের সহ্যক্ষমতার প্রমান। এটা যেন সেই বিষ কন্যার মত ব্যাপার যাদের ছোট থেকে একটূ করে বিষ খাইয়ে বড় করে তোলা হোত ও তাদের দংশন বিষাক্ত সাপের দংশনের মত প্রাণঘাতী হত। অবশ্য এই আর্সেনিক খাওয়া লোকেদের বিষ কন্যার মত কোনো বিশেষ প্রয়োগের কথা জানা নেই।

আজকাল পানীয় জলে আর্সেনিকের অত্যাচার বিষয়ে আমরা জানি যে পৃথিবীর অনেক দেশে এবং বিশেষত আমাদের দেশের পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশ প্রথমে আর্সেনিকের অত্যাচারে কাহিল হয় এবং ক্রমে ক্রমে তা এখন উত্তরপ্রদেশ ও নেপালের দস্তক দিচ্ছে৷ পৃথিবীর অন্য অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশেও এই আর্সেনিক জনিত অসুবিধার কথা জানা গেছে ৷ পানীয় জল থেকে আর্সেনিকের বিষক্রিয়াকে arsenicosis বলা হয় ৷ এখন একটা কথা প্রথমে প্রচলিত হয়েছিল এবং তা তাদের ভাষায়: “poor suffers arsenicosis৷ ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে ২০০১ সালে সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “if a developed country was cursed with the geology of Bangladesh it would have mechanisms in place to deal with it and its people would not be drinking poisoned water. Water problems tend to disappear when a country becomes richআর্সেনিকের কি নিদারুণ পতন! ভিক্টোরিয়ান যুগে এটি লর্ড, ব্যারণদের ঘরে ঘরে ঘুরতো এবং এর নাম হয়েছিল “powder of inheritance”, যা বংশের উত্তরাধিকারী ঠিক করার ব্যাপারে চক্রান্তে ব্যবহতৃ হত আর এখন আর্সেনিক বড়লোকদের ছেড়ে গরীব লোকেদের জীবন নিয়ে খেলা শুরু করেছে৷

পশ্চিম জগতের বিজ্ঞানীরা বলতে শুরু করলেন যে এই আর্সেনিক প্রকৃতির দান৷ এর স্বপক্ষে এরা তত্ত্ব খাড়া করেছেন এবং আমাদের বোঝালেন যে halocene যুগের শুরুতে (প্রায় ১০,০০০ বছর আগে, যখন বরফ যুগের শেষ হয়) বেশ কিছু বন্য অঞ্চল (সুন্দরবন অঞ্চলে) জলোচ্ছাসে ডুবে গিয়েছিল এবং সেই গাছপালা জলে ডুবে অনেক জৈব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাটি-স্থিত সুপ্ত আর্সেনিক উপরে তুলে এনেছিল। বেশি করে নলকূপ বসানোতে সেই আর্সেনিক জলের সাথে বেরিয়ে এল। খুবই ভাল মতবাদ, পৃথিবী ছাড়া কাউকে দোষারোপ করা হলনা। বলা হল যে, এটির কারন হল “anthropojenic”, আমরা দোষের ভাগী নই। ভুল কিন্তু ভেঙে দিল আর্সেনিকের বাড়াবাড়ন্ত নেপাল ও উত্তরপ্রদেশেও। এবং সেক্ষেত্রে এর কারন আর “haloceneথাকে না। এই জায়গাগুলো সমুদ্র ও সুন্দরবন থেকে বহু দূরে আর আর্সেনিক কোনো জীবন্ত প্রাণী নয় যে নদী গুলির উজানে বেয়ে বেয়ে হাজার কিলোমিটার উপরে উঠে আসবে। আরও মজার কথা প্রথম দিকে এই আর্সেনিক একটা নলকূপ বসালেই জলের সঙ্গে বেড়িয়ে আসতোনা, কয়েক বছর সময় নিত। এর মানে কী এই দাঁড়ায় যে “holocene periodএর ১০,০০০ বছরেও যে রাষায়নিক প্রক্রিয়াগুলি সম্পূর্ণ হয়নি তা শেষ হতে আরও ৮-১০ বছর লেগে গেল।

মজার কথা এই যে ২০০০ সালে WHO এর রিপোর্টেও সেই একই কথা বলা হচ্ছে যে খুব গরীব দেশের লোকেরাই আর্সেনিক দূষণে বেশী প্রভাবিত হয়৷ এর অর্থ হল ভালো পুষ্টিকর খাবার এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকলে আর্সেনিকের প্রভাব কম হয় ৷ পুষ্টিকর খাবারের কথাটা সোজাসুজি বোঝা যায় যে immunity ভালো থাকলে আর্সেনিক প্রবেশ করলেও শরীর তা সহজেই বের করে দিতে পারে ৷ ভিক্টোরিয়ান যুগে সুন্দর হবার জন্য আর্সেনিক খাওয়া বা জাপানীদের বা অষ্ট্রিয়ার পাহাড়ে চড়া লোকেদের শরীরে বেশী আর্সেনিক খাবার মাধ্যমে প্রবেশ করলেও তাদের খুব বেশী অসুবিধা হবার খবর পাওয়া যায় না ৷ এইখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে বিষ হিসাবে আর্সেনিকের প্রয়োগে অত্যন্ত বেশী মাত্রায় আর্সেনিক দেওয়া হত ৷

আর্সেনিকের একটু একটু করে শরীরে প্রবেশের প্রভাবে সাধারণ ভাবে অনেক রকম ত্বকের অসুখ হয়ে থাকে ৷ তবে হাইপারটেনসন রোগটি যেন এই আর্সেনিকের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ৷ গড়ে প্রায় ক্রমাগত ২৫ বছর আর্সেনিক যুক্ত খাবার বা পানীয় সেবনের ফলে ক্যান্সার এ মৃত্যুর ঘটনাও লিপিবদ্ধ আছে এক রিপোর্টে ৷ আর্সেনিক সংক্রান্ত রোগিদের নিয়ে কোলকাতাতে ডঃ ডি এন গুহমজুমদার ও ডঃ কে সি সাহা অনেক গবেষণা করেছেন ৷ আর্সেনিক প্রভাবিত লোকেদের চিকিত্সার জন্য ডঃ গুহমজুমদার এর প্রথম পরামর্শ ছিল আর্সেনিক দ্বারা দূষিত জল খাওয়া বন্ধ করা ৷ তার পরে বেশ প্রোটিন ও ভিটামিন যক্ত খাবার খাওয়া ৷ এগুলির রসায়ন জনিত কারনটি খুবই সাধারন ৷ প্রোটিন ও ভিটামিন মিলে আর্সেনিক কে methyl-arsenic এ পরিনত হতে সাহায্য করে ৷ মানুষের শরীরে লিভার এই মহৎ কাজটি সমাধা করে ৷ এর জন্য এর প্রচুর ভিটামিন বি-১২ ও methonine নামে একটি amino acid (যা প্রোটিনে থাকে) প্রয়োজন হয় ৷ এই methyl-arsenic, arsenic trioxide এর মত বিষাক্ত নয় আর এটি সহজেই প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে যায় ৷ পুনরায় লিখি যে এই হল কারণ যার জন্য এই arsenicosis রোগটি গরীব দেশের গরীবদের বেশী প্রভবিত করে। এটা হল অনেকটা 'দারিদ্রের মার'।

ওষুধ হিসাবে ক্রনিক রোগের ক্ষেত্রে উপরোক্ত উপাচার গুলি ভালো কাজ করে, তবে তীব্র বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে chelate therapy করা যায় ৷ কিছু chelating (কথাটির মানে হল claw অর্থাত সাঁড়াশির মত ধরা) agent আছে যেগুলি তাদের দুটি সালফার দিয়ে আর্সেনিক কে এমন ভাবে ধরে রাখে যাতে আর্সেনিক অন্য কোনো জায়গায় যুক্ত হয়ে শরীরের জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলিকে প্রভাবিত করতে না পারে ৷ এই ওষুধগুলির নাম: dimercaptopropanesulphonate (DMPS) dimercaptosuccinic acid (DMSA) ৷ তবে প্রোটিন ও ভিটামিনের মত এই ওষুধগুলিও বেশ দামী ৷

হঠাৎ করেই বিগত ৩০-৪০ বছর ধরে ভারতের এক বিশেষ ভাগে ও বাংলাদেশে এই আর্সেনিকের পানীয় জলে আবির্ভাব এবং উত্তরোত্তর উত্তরদিশাতে এর এগিয়ে যাওয়ার কারণটি কি হতে পারে তার একটি ব্যাখ্যা আমি 'দেশ'পত্রিকার গত ১৭ মে সংখ্যাতে বলার চেষ্টা করেছি ৷ তাই শুধু সংক্ষেপে লেখা যেতে পারে যে এটি আমাদের যথেচ্ছ ভাবে নলকূপের ব্যবহার এবং ব্যবহৃত সাবান ও ডিটারজেন্টের জন্য ভালো নিকাশী নালা না থাকার ফলাফল ৷ যে আর্সেনিক জলে গুলে যেতে পারে না তাও জলে গুলে গিয়ে দুষিত করে তুলছে আমাদের পানীয় জল ৷ এগুলি সবই এক দল বিশেষ ধরণের দের microbe দের জন্য হচ্ছে ৷ ব্যবহৃত সাবান ও ডিটারজেন্টগুলিতে সালফেট থাকে, যা এই microbe দের নিশ্বাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় 'অক্সিজেন'৷ এরা anarrobic microbe এবং সালফেট ও আইরন কে বিজারিত করে দেয়, যার ফলাফল হিসাবে বাতাসের সংস্পর্শে আইরনের সাথে শক্ত ভাবে যুক্ত হয়ে থাকা আর্সেনিক সহজেই বেরিয়ে আসে ৷

উন্নত দেশগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে তারা বাথরুমের নিকাশী জলের এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যে ব্যবহৃত জল দেখাই যায় না ৷ এবার বঙ্গপ্রদেশের এক কলতলার দৃশ্য কল্পনা করা যাক: খাবার জল নেওয়া ছাড়াও সাবান দিয়ে স্নান করা, কাপড় কাচা, বাসন ধোওয়া সব একসাথে চলছে ৷ অথচ ভালো নিকাশী ব্যবস্থা নেই ৷ আগেই বলেছি যে আর্সেনিক গরীবদের দূষন করতে ভালো বাসে ৷ আর আমরা মানসিক দিক দিয়েও দীন হয়ে পড়েছি৷ বাড়ির সামনে সরকারি নলকূপ আছে, ব্যবহারও করি, কিন্তু নিকাশী ব্যবস্থার কথা কখনো ভাবি না৷ ভাগ্যের দোষে বা গুণে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে বছরের প্রায় সবসময়ই জল জমা থাকে ৷ কাজেই উল্লিখিত microbe গুলি সার বছরই এখানে বেঁচে-বর্তে থাকে৷ ভারতের অন্য প্রান্তে, যেখানে এত নিচু জলাভুমি নেই, সেখানে এই জৈব টি সারা বছর ধরে চলতে পারে না, আর তাই সেখানকার লোকের এর থেকে মুক্তি পেয়ে যায় ৷ নলকূপের নিকাশী নালা গুলি কি সিমেন্ট বাঁধানো করা যায় না, যাতে করে ঐ জল অনেক দূরে গিয়ে কোন বড় সিমেন্ট এর ট্যাঙ্কে উন্মুক্ত বাতাসের সংস্পর্শে থাকতে পারে!

প্রকৃতির ৯২ টি মৌলের মধ্যে এই আর্সেনিকই একমাত্র মৌলিক পদার্থ যে নিজে থেকে কোন দোষ না করেও সব থেকে বেশী নিন্দিত ৷ আমরা পরিবেশের কথা না ভেবেই এই সুন্দর গ্রহ, যা আমাদের বাসস্থান, তাকে নষ্ট করছি আর শেষে সামলাতে না পেরে দোষরোপ করছি সেই গ্রহটিকেই!