![]() |
||
|---|---|---|
| প্রথম পাতা | নিবন্ধ | |
|
অশেষকুমার দাস |
|
হিমালয়ের বুকে অপেক্ষাকৃত নবীন রাষ্ট্র সিকিমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল তিব্বতী বংশোদ্ভূতদের দ্বারা। এ ব্যাপারে যে কাহিনী প্রচলিত আছে, তার মধ্য দিয়ে অবশ্য লেপচাদের হেয় করা হয়। সে কাহিনীতে বলা হয় যে পূর্ব তিব্বতের মী-নায়াক রাজবংশের গুরু তাসী তিব্বতী তীর্থ দর্শনকালে দৈববানী শুনতে পান যে তিনি ও তাঁর পরিবার যদি দেশের দক্ষিণ সীমা অতিক্রম করে বসবাস করেন, তবে তাঁর উত্তরসূরী কেউ রাজা হবেন। সে মতন তিনি তার পরিবার নিয়ে তিব্বতী সীমা অতিক্রম করে বর্তমান সিকিম বা দেমাজং এর মাটিতে উপস্থিত হন। সেখানে তারা দেখতে পান একদল মানুষ একটি বৌদ্ধ মন্দির নির্মানের জন্য কিছুতেই মাটিতে স্তম্ভ স্থাপণ করতে পারছে না। গুরু তাসীর পুত্র একক প্রচেষ্টায় সেই স্তম্ভ স্থাপণ করে দেন। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই স্থানীয় মানুষ খুশি হয় এবং তাকে খ্যে-বুমসা (khey-bhumsa) উপাধি দেন। যার অর্থ সেনাপতি। এ ঘটনা যে তিব্বতী ধর্মগুরু দলাইলামার প্রাসাদে লেখা হয়েছিল তা বলা আজ বাহুল্যমাত্র। কারণ সে সময় সিকিমে যে জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল, সে লেপচাদের ধর্ম ছিল প্রকৃতির উপাসনা। সুতরাং তারা যে কেন বৌদ্ধ স্তূপ নির্মান করবে, এ ব্যাপারে যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর নেই। এর পরের ঘটনা - স্তূপ নির্মাণে খুশী হয়ে লেপচাদের আদি ধর্মগুরু থে-কুং-টেক (the-kung-tex) তাঁর কন্যার সাথে খে-ভুমসার (khey-bhumsa) বিয়ে দেন। এরপর থেকেই অনাবাসী তিব্বতীরা সিকিমের বুকে রাজতন্ত্র গড়ে তোলার চেষ্টা করে। ১৬৪১-৪২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সিকিমের বুকে তিব্বতী রাজতন্ত্র শুরু হয়। ধর্মগুরু দলাইলামা এই রাজতন্ত্রকে প্রথম স্বীকৃতি দেন। ধর্মীয় মৌলবাদি লেপচাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে এই রাজতন্ত্রের জন্ম হয়। এই নবীন রাজতন্ত্র কে কেন্দ্র করে তিব্বতী মৌলবাদের দল ধর্ম প্রচারের জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আর ধীরে ধীরে নিজ ভূমে পরবাসীতে পরিণত হতে থাকে লেপচারা। লেপচারা নিজেদের মুতনচি রোঙ্ (mutnachi-rong) বলে পরিচয় দেয়, যার অর্থ হোল অপেক্ষাকারী। এ ব্যাপারে একটা সুন্দর গল্প আছে। প্রাচীন সিকিমের মানুষেরা উত্তর তিব্বতে যেত লবন সংগ্রহের জন্য। মধুর বিনিময়ে তারা লবন সংগ্রহ করতো। এ জন্য তাদের দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হোত। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের চলার পথে গড়ে উঠেছিল বহু বিশ্রামাগার। লেপচাদের ভাষায় ওগুলোকে বলা হোত রোঙ-ল্যাঙ্ (rong-lang)। এই রোঙ-ল্যাঙ্ এর মানুষদের বলা হোত রোঙ্, যা লেপচাদের আসল পরিচয়। এই জনগোষ্ঠিকে প্রথম লেপচা বা লাপচে নামে ডাকে সিকিমের অনাবাসী নেপালীরা। কারণ লেপচা হল হিমালয়ের বুকে শান্ত প্রকৃতির এক ধরণের মাছ। লেপচারাও প্রকৃতিতে খুব শান্ত। সে কারণে তারা লেপচা নামে পরিচিত হয়। এ নামের আড়ালে রয়েছে এক ধরণের উপহাস। তাদের বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তা তাসেদিং তাঁর হিমালয়ের বুকে লুকিয়ে রাখা ধনভান্ডার নিয়ে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু, মানুষকে বিশ্বাস করে তাদের মিলেছে শুধুই যন্ত্রনা। সিকিম রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তাদের তিব্বতী বংশোদ্ভূত রাজা ভেবেছিলেন হিমালয়ের বুকে লেপচা বসতি মাত্রেই তাদের রাজতন্ত্রের বাসিন্দা। সিকিম রাজতন্ত্র কখনোই লেপচা জনগোষ্ঠীর সামাজিক অনুশাসন, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনকে গুরুত্ব দেয়নি। যার ফলে রাজতন্ত্রের সাথে লেপচাদের সংঘাত ছিল এক অনিবার্য ঘটনা। সে কারণেই দেখা যায় যে কালিম্পং এর বুকে স্বাধীন লেপচারাজ তাকে স্বীকৃতি না দিয়ে আগ্রাসনে উদ্যত হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল লেপচা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটানো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা গেল যে হিমালয়ের এই দলিত লেপচারা কালিম্পং এর সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে উপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণ করে তাদের রাজা গেবু আচকের (Gaeboo Achayok) এর নেতৃত্বে। এই রাজা যেমন তাদের সামাজিক সম্পত্তির অংশ কে কতটা পাবে, তার বিধান দিতেন তেমনই শত্রুর মোকাবিলায়ও তৎপর হতেন। সামাজিক সম্পত্তির মধ্যে প্রধান ছিল ভূমি। আবাদযোগ্য ভূমির বন্টন হোত পারিবারিক সদস্য সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। এছাড়াও ছিলেন বুংথিং (Bung Thing) বা পুরোহিত। তিনি ছিলেন লেপচা সমাজে পারিবারিক অভিভাবকের মতো। বিপদে আপদে তিনিই ভরসা। ঈশ্বরকে তুষ্ট রেখে এই বুংথিং মানুষের অসুখ বিসুখের চিকিৎসাও করতেন। সিকিম রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই কালিম্পং এর লেপচা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তিব্বতী ও ভূটিয়াদের দ্বারা নানাভাবে আক্রান্ত হয়। ভূটান এবং সিকিম রাজতন্ত্র লেপচা সাম্রাজ্যের প্রত আগ্রাসী মনোভাব গ্রহণ করে। কারণ সিকিম যেমন লেপচা সমাজ থেকে কোনো প্রকার কর আদায় করতে পারতো না, তেমনই সেখানকার বৌদ্ধ ধর্মগুরুরাও লেপচাদের মধ্যে ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারে ব্যর্থ হয়। ধারণা করা যায় যে লেপচাদের বৌদ্ধ ধর্মের ছাতার নীচে আনবার জন্য ধর্মগুরু দলাই-লামার ভূটান ও সিকিমের ওপর যথেষ্ঠ চাপ ছিল। ভূটিয়ারা লেপচা বসতি আক্রমণ করে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত। মহিলা ও শিশুদের নানাভাবে হেনস্থা করত। ১৭০০ খ্রীস্টাব্দের পর এই অত্যাচার চরমে ওঠে। এই অশান্তিকর পরিবেশে ১৭৫০ খ্রীস্টাব্দের পর লেপচাদের রাজা হন গেবু আচক। তার বাবার নাম ছিল অপ্রাং-জাপ্ এবং মা অসিস্ক মিত। বংশপরম্পরায় এই রাজতন্ত্র চালু ছিল। রাজা গেবু আচক এই বিদেশী আক্রমণ প্রতিহত করতে লেপচা সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। সিকিম রাজ দু-দুবার কালিম্পং আক্রমণ করে পরাজিত হয়ে ফিরে যায়। রাজা গেবু কালিম্পং সীমান্তের নজরদারীর জন্য অন্ততঃ পাঁচটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। সিকিম সীমান্তে পাকিং দুর্গ, নেপালের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে লেপচু বাজারে ফিয়ং দুর্গ, তিস্তা নদীর পারে সাভাওং দুর্গ, পেডং পাহাড় চূড়ায় দামসং দূর্গ এবং ভূটানের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে ডালিমকোট দুর্গ নির্মাণ করেন। এই দুর্গগুলোর অস্তিত্ব এখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কালিম্পং-এর দেশীয় মানুষের মুখে মুখে রয়ে গেছে তার ইতিহাস। ভূটানের গারো অঞ্চলের শাসনকর্তা জং-পে (Jong-pay) কালিম্পং আক্রমণ করে ঘোষনা করেছিলেন যে যদি কেউ গেবু আচককে বন্দী অথবা মৃত অবস্থায় তার সামনে হাজির করতে পারে, তবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। কিন্তু সেই যুদ্ধে ভূটিয়ারা লেপচাদের কাছে পরাজিত হয়। বাধ্য হয়ে জং-পে কালিম্পং রাজের সাথে সন্ধি চুক্তি করে। সেই সন্ধিচুক্তির মধ্যে ছিল শয়তানের দুরভিসন্ধি। ঐ চুক্তি অনুযায়ী জলঢাকা নদীকে কালিম্পং ও ভূটানের মধ্যেকার স্বাভাবিক সীমানা বলে চিহ্নিত করা হয়। এই নদীর পশ্চিম দিকে ছিল ডালিম কোর্ট দুর্গ। একদিন গভীর রাতে রাজা গেবু আচক যখন ঐ দুর্গে গভীর নিদ্রায় মগ্ন তখন ভূটিয়ারা সমস্ত রকম চুক্তিকে নস্যাৎ করে অনৈতিকভাবে কালিম্পং রাজ গেবু আচককে হত্যা করে। রাজহত্যা করে ফিরে যাওয়ার সময় গেবুর ঘাতক চেল নদীতে পরে মারা যায়। লেপচা জনগোষ্ঠীর মানুষের বিশ্বাস ধরিত্রীর দেবতা লিয়াং ডকের আত্মা তাদের রাজার শরীরে প্রবেশ করেছিল সে কারণে তারা গেবুকে মহান বলে মনে করেন। গেবু আচকের মৃত্যুর (১৭৮০) পর ভূটান কালিম্পং দখল করে নেয়। ১৮৬৪ সালে দার্জিলিং জেলা গঠন না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীন লেপচা ভূমি ভূটানের দখলেই ছিল। দার্জিলিং জেলা গঠনের পর কালিম্পং মহকুমার মর্যাদা পায়। মুক্ত সীমান্ত এবং ইংরেজদের নীতির ফলে নেপাল, ভূটান ও সিকিম থেকে দলে দলে মানুষ এসে এখানে বসবাস শুরু করে। যার ফলে হিমালয়ের প্রিয় সন্তান ও ভূমিপুত্র লেপচারা সখ্যালঘুতে পরিনত হয়। ইতিমধ্যেই তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মানুষও দেখা যাচ্ছে। যা বৃহত্তর সমাজেরই প্রভাব বলে মনে করা হয়। লেপচারা কিন্তু তাদের লোকবিশ্বাস থেকে এক পাও পিছু হটেনি। তাদের জীবন জুড়ে আছে তাসেদিং বা দাসেথিং দেবতার স্বপ্ন। লেপচারা বিশ্বাস করে একদিন তাদের চূড়ান্ত বিপদে এই ঐশ্বর্য্যের দেবতা এসে তাদের উদ্ধার করবে। লেপচাদের হৃদয়ে তাসেদিং আর চেতনায় যেন গেবু আচক। কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ |
||