name
প্রথম পাতা নিবন্ধ  

 

 

 

বানীপ্রসন্ন মিশ্র
সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসবাদঃ কিছু ভাবনা

অন্যান্যদের নিবন্ধ

অভিজিৎ মজুমদার

আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

বানীপ্রসন্ন মিশ্র

অশেষ দাস

সব্যসাচী সরকার

 

 

ব্যুৎপত্তিগতভাবে সন্ত্রাস কথাটার মানে হল খুব বেশি ভয়, শঙ্কা বা ত্রাস। শব্দটির প্রয়োগের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অবশ্য সহজেই প্রতীতি হয় যে শুধুই ভয়ের পরিমান দিয়ে সন্ত্রাস করা যায়না; তার সঙ্গে আরও কিছু শতর্পূরণের প্রয়োজন আছে। সন্ত্রাস কোনও প্রাকৃতিক কারনে উদ্ভুত ভয় নয়, আসলে সন্ত্রাসের একটি সামাজিক অবয়ব বিদ্যমান, একপক্ষ অপরপক্ষকে ভয় দেখায়, ভয় দেখিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নেয়, তাতে যে ভয় দেখায় তার স্বার্থসিদ্ধি হয়, কিন্তু যাকে ভয় দেখানো হয় তার ক্ষতি হয় এবং তার জীবন ও সম্পত্তির হানিও হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় কথা ভয় সঞ্চারের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদীরা সন্ত্রস্তকে তার সংকল্পের বিপরীতে নিয়োজিত করে। এর ফলে মনুষ্যত্বের মান লঙ্ঘিত হয়। যে প্রজাতি-চেতনা (species conscious) মানুষের দেশ-কাল নিরপেক্ষ স্বভাব-ধর্ম যে ধর্মের সহজ প্রেরণা থেকে সহজের উপলব্ধ হয় শাশ্বত নীতি-সবার সত্য, সেই নীতিবোধকে সতত আহত করে সন্ত্রাস।

এই প্রসঙ্গে আধুনিক মননের একজন বিশিষ্ট পথপ্রদর্শক দার্শনিক ইম্যানুয়েল কান্টের সূত্রগুলি স্মর্তব্য। কান্ট আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে মানুষকে উদ্দেশ্য করেই তো বিশ্বসংসারের যাবতীয় আয়োজন; মানুষ মানুষের জন্য নিছক অভীষ্টলাভের কৌশলমাত্র বা হাতিয়ার নয়। যে কাজের আয়োজন যথার্থই মানুষের মঙ্গলে অভীপ্সা সঞ্জাত, সেই কাজ কখনো মানুষকে বলপ্রয়োগ বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে ক্রীড়নকে পরিনত করে সাধিত হওয়ার নয়।

কিন্তু আমরাও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল যে, রাষ্ট্রব্যবস্থা সর্বদাই ক্রমবর্ধমান শক্তিপ্রয়োগ ও কাজের উপযোগী উপকরন সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। কথাটি যে সত্য এই ব্যাপারে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই, তবে এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে কথাটি আংশিক সত্যমাত্র। আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে আমাদের দেশে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনার সমকালীন বিশিষ্ট ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবি মেকিয়াভেলী সুনির্দিষ্টভাবে একটি কথা বলেছিলেন, যার মর্মার্থ এই যে, রাজপাটের স্থায়িত্বে প্রয়োজনে রাজাদের একটি নয়, দুটি গুনের মধ্যে সুষম সমন্বয় থাকা দরকার। রাজারা একাধারে হবেন সিংহসুলভ শক্তি ও সাহসের অধিকারী এবং গল্পের শেয়ালের মত চালাক ও ফন্দিবাজ। আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে এই কথাগুলি আরও বিস্তৃত ও স্পষ্টতর আলোচনা করেন সমাজ- দার্শনিক পেরেটো এবং একটি ভিন্নতর স্তরে বিপ্লবী চিন্তানায়ক গ্রামসি। তাঁদের বক্তব্য এই যে, শক্তিপ্রয়োগ (force) এবং সহমত সৃষ্টি (consensus) এই দুয়ের সার্থক সমন্বয়ের দ্বারাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়। রাষ্ট্রব্যবস্থার সপক্ষে সহমতের অভাব স্বল্প সময়ে হয়তো সমস্যার সৃষ্টি করেনা, কিন্তু দীর্ঘকালীন সময়ে এর অভাব অবশ্যই অনুভূত হবে কেননা শুধুমাত্র ভয়ের বিকৃত মুখ কিংবা ত্রাসের বিকটভঙ্গী দিয়ে দীর্ঘদিন রাজ্যশাসন একটি অবাস্তব প্রস্তাবমাত্র।

কিন্তু সে যাই হোক, রাষ্ট্রমাত্রেরই শক্তির সাধনা আমাদের যতটা দৃষ্টিগোচর হয়, সহমত সৃষ্টির প্রক্রিয়া ততটা নয়। সহমত অনেকটা শিশিরের শব্দের মতন ধীরলয়ে নেপথ্যে ক্রিয়াশীল। স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র ও গনতন্ত্রসম্মত শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে তুলনা করলে দেখা যাবে যে, এই তিনের ভেতর শক্তি ও সহমতের সমানুপাত পরিবর্তনশীল। স্বৈরতন্ত্র স্বভাবতই শক্তিনির্ভর, রাজতন্ত্রে অবস্থাভেদে শক্তি ও সহমতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, আর গনতন্ত্র তত্ত্বগতভাবে সহমতের উপরেই প্রতিষ্ঠিত; সন্ত্রাসের অবকাশ এই শেষোক্ত ক্ষেত্রে অনুপস্থিত হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আজ সর্বত্রই অনুভূত হচ্ছে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে কেন এমনটা ঘটে তার কিঞ্চিৎ অন্বেষণ এই নিবন্ধের পরবর্ত্তী অংশের মূল প্রতিপাদ্য।

অনেকেই মনে করেন যে, মনুষ্যজাতির ভেতর সংখ্যাগরিষ্ঠি অংশ বস্তুত স্বার্থপর এবং অতি অল্পসংখ্যক লোকই পরার্থপর। স্বার্থপরেরা অর্থগৃধ্নূ ও ক্ষমতালিপ্সু হয়, অপরপক্ষে পরার্থপরেরা হয় যুক্তিনির্ভর ও বিবেকবান। এমতবস্থায় সমাজ জীবনের মৌলিক সমস্যা হল, পরার্থপরদের শাসন বলবৎ করা এবং উপযুক্ত মাত্রায় শক্তিপ্রয়োগ করে স্বার্থপরদের অবদমিত রাখা। আধুনিকতার উষালল্গে ফরাসি দার্শনিক রুশো একটি বিপরীত প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেন। তাঁর বিচারে ব্যষ্টি ও গোষ্ঠির স্বার্থের সমন্বয়সাধন সম্ভব এবং একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমাজের একটি সাধারন ইচ্ছা (general will) ই ক্রমে বলবতী হয়ে ওঠে।

কিন্তু যে ভৌগলিক পরিসরে জনগন বর্ণ, জাতি, ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা, বিত্তসম্পত্তি বা অঞ্চলভেদে শতধাবিদীর্ণ, তাদের ইচ্ছা ও অনুভুতি বহুমাত্রিক হতে বাধ্য। বিদেশি শাসকগষ্ঠীর বিরুদ্ধে এ জাতীয় জনগনের সাধারণ ইচ্ছা যত সহজে বাঙ্ময় হয় ওঠে, স্বশাসনের পর্যায়ে কিন্তু ‘সমানী ব আকুতিঃ তমানা হৃদয়ানি বঃ’ – জাতীয় ঋগ্বেদীয় প্রার্থনা হাত দিয়ে চাঁদ ধরার মতো অপূর্ণ থেকে যাওয়ারই আশঙ্কা। ফলে পৃথিবীর বৃহত্তম গনতন্ত্রে গনতন্ত্রের অঙ্গসজ্জা যত ব্যাপক, প্রাণপ্রতিষ্ঠা ততটাই অগভীর। এখানে একের ইচ্ছা অপরের উপর চাপানোর অভিপ্রায়ে বিবাদ, বিতন্ডা বা জল্পের অবতারণা হয়, কুৎসা বা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে অপরের কন্ঠরোধ করার চেষ্টা হয়, যে সব তথ্য ব্যতিরেকে সুষ্ঠু আলোচনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ অসম্ভব সেই সব তথ্য গোপন করে রাখা হয়, আর এসবের ফলে গণতন্ত্রসম্মত সাধারণ ইচ্ছা রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনা, সৃষ্টি হয় সন্ত্রাসের বাতাবরণ।

এমনতরো পরিবেশ বিরোধীমাত্রেই পরিভাষিত হয় প্রতিক্রিয়াশীল বা সন্ত্রাসবাদী হিসেবে। যুক্তিপ্রয়োগকে বিধিসিদ্ধ করার এ এক নতুন পরিকল্পনা। সুতরাং আমাদের গণতন্ত্র আছে, নিবার্চনের পার্বণে অসীম উৎসাহ আছে, কিন্তু সম্মানিত বিরোধীপক্ষ নেই; দলাদলি আছে কিন্তু ভাববিনিময় হয়না; এক কথায় বহিরঙ্গ সর্বত্রগামী কিন্তু অন্তরঙ্গতা অনুপস্থিত; ফলতঃ সহমত নিতান্তই অবান্তর। রাজনৈতিক পরিসরে রাজনীতির বিষয়সূচি কিংবা প্রতিযোগিতার নিয়মনীতি মূলতঃ নিয়ন্ত্রিত বা নিবন্ধীকৃত হয় শাসকগোষ্ঠির ক্রিয়াকলাপের ওপর ভিত্তি করে। শাসকগোষ্ঠি নিজেই যেখানে সন্ত্রাসের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সমাজের সর্বস্তরে সন্ত্রাসের বিস্তার অবশ্যম্ভাবী।

শাসকেরা যদি আলোচনার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করার প্রয়াসী হয় এবং বিরোধীদের সম্পর্কে অশালীন ভাষাপ্রয়োগ ও হিংস্র ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়, তাহলে সেখানে বিরোধীরা রাজনীতির মুক্তাঙ্গন থেকে সন্ত্রাসবাদের চোরাপথে অনেকসময় নিজেদের অজান্তেই অপসৃত হতে বাধ্য। পরাধীন দেশে এভাবেই অনেক দেশপ্রেমিক – ব্যক্তি, দল বা উপদল – হিংসা ও সন্ত্রাসকে রাজনৈতিক ক্রিয়াকান্ডের অঙ্গ হিসাবে বরণ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, সেই ট্রাডিশন আজ ও সমানে চলেছে। দেশ স্বাধীন হলেও আমাদের নেতা, দল, আমলা, পুলিশ, আইন ইত্যাদি অনেক কিছুই যেহেতু পরাধীন যুগের ছাঁচে ঢালাই হয়ে আছে, সুতরাং রাজনৈতিক প্রতর্কের চাইতে পেশিপ্রদর্শন অনেক সময়েই মানানসই বিকল্প বলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই কারনেই আমাদের দেশে তথাকথিত সচেতন নাগরিকেরা মিছিলে মিটিং এ একে অন্যকে যদৃচ্ছ হুমকি হুঁশিয়ারি দেয়, ঘাড় কিংবা হাত ভেঙ্গে দেওয়ার ভয় দেখায় এবং অত্যন্ত দৃষ্টীকটুভাবে নিস্তার পেতে হলে তাদের আজ্ঞাবহ হওয়ার আদেশ জারি করে।

এছাড়া আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানিক কাঠামোতে আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের দায়িত্ব হলেও সন্ত্রাসবাদ সমাধানে কেন্দ্রের ভূমিকা প্রত্যাশিত। বিরোধীপক্ষকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে প্রতিপালিত করে কেন্দ্রের কোর্টে বল ঠেলে দিলে রাজ্যস্তরে শাসকগোষ্ঠিকে বিরূপ সমালোচনা শুনতে হয় কম। তদুপরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বাহানায় কেন্দ্রের কাছ থেকে কিছূটা অতিরিক্ত অর্থাগমও হয়, যার হিসেব অনেক ক্ষেত্রেই অবস্থা বিবেচনায় কঠোরতার সঙ্গে করা হয় না। বিভিন্ন আঞ্চলিক দলশাসিত রাজ্যস্তরের রাজনীতির আঙিনায় অতএব সন্ত্রাসবাদ একটি স্বাভাবিক পরিপূরক। আবার যে সব ব্যক্তি বা দল প্রকাশ্য রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা সেই রাজ্যেই হঊক বা কেন্দ্রেই হঊক, তারাও কোনো কোনো সময় গুন্ডাবাহিনীর বা সন্ত্রাসের গোপন পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকের রাজনৈতিক বিরোধীদের সহজ রাস্তায় প্রতিহত করার মানসে।

আন্তর্জাতিক স্তরে শীতযুদ্ধকালীন সময়ে বিবদমান রাষ্ট্রগোষ্ঠি একে অন্যকে পর্যুদস্ত করার অভিপ্রায়ে তুলনীয় আচরন করেছিল। ভারতবর্ষের অনেক সীমান্তরাজ্যে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠির জন্ম ও বাড়বাড়ন্ত ঐ সময়েই হয়েছিল। বিশেষত একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর জাতীয়বাদের মোড়কে ভারত ভূখন্ডে একের পর এক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়। এটা নিছক কাকতালীয় ছিল এমনটা ভাবার কারন নেই। আবার, এটাও মনে রাখা দরকার যে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসবাদের পক্ষে উৎসাহব্যঞ্জক আরও কয়েকটি উপাদান উপেক্ষণীয় নয়। বিশ্ববাণিজ্যে খনিজ তেলের পরেই সর্ববৃহৎ ব্যাবসা হল অস্ত্রশস্ত্রের বেচাকেনা এবং মাদকদ্রব্যের চোরাবাজার। সন্ত্রাসবাদ এই উভয়েরই সহায়ক হিসাবে চিহ্নিত। সন্ত্রাসবাদের সম্প্রসার ঘটলে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয়ভাবে দীঘমেয়াদি সশস্ত্র সংঘর্ষ চলতে থাকে। আর এর ফলে অস্ত্রশস্ত্রের উৎপাদক রাষ্ট্র সমূহের ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। খোদ আমেরিকার বুকে ৯/১১ এর সন্ত্রাসবাদী হামলা অবশ্য শীতযুদ্ধের সময়ে লালিত ভস্মাসুরের চেহারা অনেকটা বেআব্রু করে দিয়েছে। সন্ত্রাস অতঃপর বিশ্বজোড়া আলোচ্যসূচিতে প্রবলভাবে প্রথম সারিতে স্থান করে নিয়েছে।

কিন্তু শাসকদের উদ্দিষ্ট একটাই – সন্ত্রাসের উপরে নিজেদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব কায়েম রাখা। এই সাধারণ সত্যের বহিঃপ্রকাশ বিশ্ব রাজনীতিতে খুব স্পষ্ট। রাষ্ট্রসংঘে শক্তিমানদের বিধিসিদ্ধ ক্ষমতা কিংবা বিধিবহির্ভূত আচার আচরণ – এই দুইই গণতন্ত্রের পরিপন্থী। আনবিক নিরস্ত্রীকরণ, জৈব-বৈচিত্র সংরক্ষন, মেধাস্বত্বের দখলদারি, শিল্পসমৃদ্ধ দেশে অপরিমিত শিল্পায়ন ও ওজোনস্তরের ক্ষয়, অথবা অতি-সাম্প্রতিক কালে ইরাকে গা-জোয়ারি আক্রমণ – ‘give dog a bad name and hang him’ – এ সবই গণতন্ত্রসম্মত সহমতের বিস্তার নয়, সন্ত্রাসের আগ্রাসী দৃষ্ট্রান্তমাত্র।

আমাদের কেন্দ্রীয় বা রাজ্যস্তরীয় রাজনীতিতেও অনুরূপভাবে একই ভাবাদর্শ ক্রিয়াশীল। মূলতঃ সংখ্যাল্প গোষ্ঠি স্বার্থে নিয়োজিত রাষ্ট্রযন্ত্র গণতন্ত্রে অনাগ্রহী হওয়াটাই স্বাভাবিক। শাসকদের কাছে মহাত্মা গান্ধি একটি অতি সরল আবেদন রেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শাসকেরা যেন যেকোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের মুখ স্মরণে আনেন। যে সিদ্ধান্ত ঐ মানুষটির উপযোগী মনে হবে, তাই সঠিক সিদ্ধান্ত – এই ছিল গান্ধিজির অভিমত। আসলে একটি যথার্থ গণতন্ত্রে তথ্য, ভাব, মতাদর্শ ইত্যাদির পারস্পরিক আদানপ্রদান এবং বিচারের ক্ষেত্র ক্রমবিস্তৃত হওয়া উচিৎ। কিন্তু দূর্ভাগ্যত আমাদের মতো একটি দেশে যেখানে এখনও বস্তুত অশিক্ষিত, দরিদ্র ও বোবা মানুষের গণতন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, সেখানে গণতান্ত্রিক দ্বিরালাপ (dialogue) কিছুটা কষ্টকল্পনা। গান্ধিজি প্রদত্ত সূত্র ঐ দ্বিরালাপেরই একটি সম্ভাব্য বিকল্পমাত্র। কিন্তু শাসকেরা গান্ধিকথিত সুসমাচারে তাৎক্ষণিক উদ্দীপ্ত হবেন এমনটা ভাবা দূরাশা। নাগরিকদের অসহায়ত্বই আমাদের নেতৃবর্গের যথার্থ উপজীব্য এবং মূলধন। উকিলের কাছে যেমন মক্কেল অথবা পুরোহিতের কাছে যজমান, আমাদের দেশে নেতাদের সঙ্গে অনুগত (নাগরিক?) – দের সম্পর্ক তথৈবচ।

যে গণতন্ত্রে প্রজা এবং নাগরিকের ভেদরেখা এমনতরো অস্পষ্ট, সেখানে নেতারা হন রাজা, নিদেনপক্ষে জমিদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ; পার্টির অফিস হয় জমিদারের কাছারি; আর জমিদারদের লেঠেল বা ঠ্যাঙাড়েদের নতুন পরিচিতি হয় পার্টির কর্মী বা ক্যাডার হিসাবে। এমতাবস্থায় মিছিল যেন অনেকটা দলবদ্ধ সংকীর্তনের প্রতিরূপ যেখানে অজ্ঞান, অনুগত, অসহায়েরা ভক্তিতে যতটা নয়, ততোধিক লোভ-লালসায় কিংবা প্রাণের দায়ে রাজনীতির স্লোগান বা ইষ্টনাম কীর্তন করতে বাধ্য হয়। সমাজ জীবনে এবং রাষ্ট্রপরিচালন-ব্যবস্থায় সন্ত্রাসের একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী প্রতিকারের উপায় হল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রীতিপদ্ধতির ব্যাপকতর প্রসার ও প্রয়োগ। এই দুয়ের ভেতরে আবার সমাজ জীবনে গণতন্ত্রের ভুমিকাই মুখ্য। কিন্তু সমাজ জীবনে কেন গণতন্ত্রের অভাব আছে বা কী উপায়ে এই অভাব মেটানো যায়, তার চেষ্টা বড় একটা হয়না। যাঁরা সন্ত্রাসে ক্ষুব্ধ বা গণতন্ত্রের অভাবে বিপন্ন বোধ করেন, তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের প্রত্যাশী হন এই ভেবে যে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের উপর নিজেদের দখলদারি। অর্থাৎ সন্ত্রাসের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব নেই বলেই যেন তারা কার্যত সন্ত্রাসের বিপক্ষে।

যে ভৌগলিক পরিসরে জনগন বর্ণ, জাতি, ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা, শ্রেনী বা অঞ্চলভেদে বিভিন্ন গোষ্ঠিতে বিভক্ত, তাদের আকাঙ্খা ও স্বকীয়তাবোধ বহুমাত্রিক, এই কথাটি আগেও বলা হয়েছে। এমনতরো পটভূমিকায় গণতন্ত্রের প্রয়োগীকরণ ব্যবস্থায় মুনশিয়ানা যেমন দরকার, অনেক বেশি দরকার স্বচ্ছতার। কিন্তু এ-জাতীয় পরিস্থিতিতে আরও বেশি করে বলপ্রয়োগের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাই রাষ্ট্রব্যবস্থায় সচরাচর লক্ষনীয়। এর ফলে সমস্ত বিক্ষোভ ক্রমশ বিচ্ছিন্নতার অভিমুখে ক্রিয়াশীল হয়, এবং পরিশেষে সন্ত্রাস উভয়পক্ষের দ্বারাই পরিব্যাপ্ত হয়। রাষ্ট্রিয় ক্ষমতা দখলের লড়াই হিসাবেই দুভার্গ্যতঃ গণতন্ত্রের অভাব থেকে সৃষ্ট আন্দোলনসমূহ চিহ্নিত হয়। ফলে গণতন্ত্র থেকে যায় অধরা, বিচ্ছিন্নতাবোধের জন্ম হয়, রাষ্ট্রের সংখ্যা হয়তো বৃদ্ধি পায় কিন্তু বলপ্রয়োগ এবং ফলতঃ সন্ত্রাসের হাত থেকে মুক্তি আর হয়ে ওঠে না।

এই সবের মূলে আবার আছে একটি বিশ্বজোড়া রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সহমত – প্রত্যেক জাতিরই রাষ্ট্র-নির্বাচনের অধিকার আছে (right of nation to self determination)। আবার জাতি বলতে কি বুঝায় তত্ত্বগত বিপুল আলোচনা সত্ত্বেও কোনো নির্বিশেষ ধারণার অভাব বিদ্যমান। প্রথম মহাযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে লিগ অব্‌ নেশনসের (league of nations) সৃষ্টির সময়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ নিজস্ব স্বার্থের পরিপূরক এই ধারণার প্রসার ঘটেছিল।

একটু পিছিয়ে তাকালে দেখতে পাব, গোটাকয়েক পশ্চিমি-দেশের ধনতান্ত্রিক শিল্পয়ানের পরিপূরক হিসাবে সৃষ্টি হয়েছিল উপনিবেশবাদ। কালক্রমে পর-পদানত দেশগুলিতে স্বাধীনতা ঐহিক সাফল্য-লাভের চাবিকাঠি হিসাবে চিহ্নিত হয় এবং দুঃখ-দুর্দশার প্রতিক্রিয়া হিসাবে এক ধরনের সমব্যথী জাতীয়বোধের উণ্মেষ ঘটে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানে একের পর এক দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে এবং ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের একটি বিশেষ পর্যায়ের অবসান ঘটে। তবে পরাধীন অবস্থায় দীর্ঘ রাজনৈতিক সংযোগ এবং তৎপরবর্তী সময়ে গণ-মাধ্যমের অভাবনীয় উন্নতির ফলে একদা বিজয়ী ও বিজিতের মধ্যে আপাত বৈরিতা সত্ত্বেও সামাজিক গড়ন এবং আকাঙ্খা ও মূল্যবোধের এক চমৎকার সমন্বয় সাধিত হয়ে যায় ইতিমধ্যে। ফলতঃ রাষ্ট্রগুলি আলাদা হয়, স্বাধীনও হয়, কিন্তু তাদের স্বকীয়তা বলে যথার্থত কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। অভাবের হিসাবে রাষ্ট্রসমূহ একেকটা বিচ্ছিন্ন একক, কিন্তু ভাবের জগতে তারা সকলে একই টিয়ারঙের অভিবাসী।

আমাদের সমকালীন সময়ে বিচার-বিশ্লেষণ সঞ্জাত সহমতের একান্তই অভাব, যা আছে তা হল সহমতের একটি অপকৃষ্ট রূপ, রাজনীতির একটি গল্পকল্প বা myth। এই গল্পকল্পে মানুষ বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে সুখী হয়, বেঁচে তা থেকে কাজে প্রেরণা পায়, আর মরণেও ভয় পায় না। বিশ্বব্যাপী প্রচলিত বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থাটাই এমন যে উন্নততর ভোগসুখের কতিপয় হাতে-গোনা কেন্দ্রস্থানীয় অঞ্চল ব্যতিরেকে ব্যাপক পৃথিবী ভোগসুখের মাপকাঠিতে, তা সে যোগাযোগ ব্যাবস্থা যতই ভালো হোক না কেন, প্রত্যন্ত পরিধিস্থ অঞ্চলবিশেষে পরিণত হতে বাধ্য। একই রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে ভোগের বিস্তৃত তারতম্য সহমতের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু আন্তঃরাষ্ট্র ব্যবধান অনেকের কাছেই অনেকটা সহনীয় মনে হয়, কিন্তু শতগুণ সমস্যা সৃষ্টি হয় অন্তঃরাষ্ট্রিয় ক্ষমতা, সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার অ-সম বন্টন ব্যবস্থায়। একই রাষ্ট্রে ভেতরে অঞ্চল ভেদে বা সম্প্রদায়গত উন্নতির তারতম্যজনিত পরিস্থিতিতে বঞ্চনা ও অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের অভিযোগ ওঠাটাই স্বাভাবিক এবং ফলতঃ আঞ্চলিক বা সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে পৃথকতাবাদী আন্দোলনের জন্ম হতে পারে।

কিন্তু পৃথক হলেই কেউ পৃথক হয় না অথবা স্বাধীন বলেই স্বাধীন। উন্নয়নের কেন্দ্র, পরিধি এবং পরনির্ভরশীলতার তত্ত্ব অনুযায়ী, আমার নিজের অনুমান, স্বার্থপর এবং শক্তিধর দেশগুলির পক্ষে অনেকগুলি আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র থাকাটাই মঙ্গলজনক। যারা মনে করেন, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি জাতীয়তার ওপর প্রতিষ্ঠত, তারা নিশ্চিতভাবে একপেশে, কারণ তারা রাষ্ট্র-বহিঃস্থ সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। কিন্তু আত্মগৌরব অনেকটাই ভিত্তিহীন, সুতরাং নিষ্প্রয়োজন। উত্তর ইটালির বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা যখন অনুন্নত দক্ষিণ ইটালিকে আলাদা রাষ্ট্র বানানোর সপক্ষে কথা বলেন, কিংবা যখন দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো কোনো চিন্তাবিদ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির বিরধিতা করেন উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে, তখন তত্ত্বগত যে অবস্থান আমি নিয়েছি, তার ভিত্তি যথেষ্ঠই দৃঢ় বলে মনে হয়।

উন্নত দেশগুলিতে উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবেশ-দূষণ বিরোধী জনচেতনা এবং মেধাস্বত্ববিধি – এই জাতীয় ব্যাপারগুলিকে একযোগে নিয়ে ভাবলে এটা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক যে এখন থেকে কলকারখানাগুলি অনুন্নত দেশে বসানোই উন্নত দেশগুলির পক্ষে সুবিধাজনক হবে। গোটা পৃথিবীটাকে যদি একজনের বড়লোকের বাড়ি বলে ভাবি, তাহলে ব্যাপারটা সহজভাবে বোঝানো সম্ভব। সংখ্যাল্প উন্নত দেশগুলি হবে বৈঠকখানা ও বাগানবাড়ি, পড়াশোনা, গবেষণাজাত মেধাস্বত্বের মালিকানা, খেলাধূলা, গানবাজনা, সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। আর, অনেকগুলি অনুন্নত দেশ হবে রান্নাবান্না, গোয়াল, ঘর-গেরস্থি, চাকরবাকর, শিল্পায়ন, পরিবেশ দূষণ, বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদির জন্য নির্দিষ্ট জায়গামাত্র।

সি টি বি টি জাতীয় চুক্তির মাধ্যমে যদি অনুন্নত দেশগুলিকে আণবিক সমস্যা সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখা যায়, তাহলে ওদের নিজেদের মধ্যে সদাসর্বদা ছোটোখাটো ঝগড়াঝাঁটি বা যুদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকাটাই উন্নত দেশের পক্ষে স্বার্থসম্মত। এতে ফায়দা দ্বিবিধ – এক, শোষন এবং সন্ত্রাসের সামগ্রিক চিত্র অস্পষ্ট থেকে যাবে; আর দুই, পারস্পরিক সংঘর্ষের ফলে অনুন্নতরা দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হয়ে থাকবে, সম্ভাব্যক্ষেত্রে তারা ক্রমবিভক্ত হবে এবং শক্তিমানেরা তাদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে লাভবান হবে।

গোটা ব্যাপারটাকে তাহলে একবার একটু গুটিয়ে নিয়ে বলি। রাজনীতির যে গল্পকল্প(Myth) আপাততঃ বিশ্বের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে গেছে, তা নিম্নরূপঃ () রাষ্ট্র জাতীয়তার ওপর প্রতিষ্ঠিত; () রাজনৈতিক জাতীয়তাবোধ মূলতঃ ভাষা ও সংস্কৃতিনির্ভর; () প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রই সাবর্ভৌম; () রাষ্ট্রের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের ভিত্তিসরূপ; () গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রকৃত নিয়ন্তা নাগরিকেরা; () প্রতিটি রাষ্ট্রেরই উন্ননয়ের সুযোগ ও সম্ভাবনা নির্বাধ; () প্রতিটি নাগরিকের নিজ দেশে উন্নয়নের সমান অধিকার; () ভোগসুখের উপাচার বৃদ্ধির অপর নাম উন্নয়ন এবং দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে তা অর্জন করা সকলের পক্ষেই সম্ভব; () প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণবিমুক্ত উদারীকরণের মাধ্যমে শিল্পায়নের উপযোগী দেশি বিদেশি নিয়োগের সম্ভাবনা অপরিসীম, (১০) যদি কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রে উন্নতি যথাযথ বা ঈপ্সিত স্তরে না পৌঁছয়, তার জন্য দায়ী সেই দেশের শাসকবর্গ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা; (১১) সুতরাং জনগনের একমাত্র কর্তব্য নিজ নিজ দেশের শাসকবর্গ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার উপর নজরদারী এবং প্রয়োজনে নিবার্চন, বিক্ষোভ বা বিদ্রোহের মাধ্যমে কাঙ্খিত পরিবর্তন আনয়ন।

গোটা গল্পকল্পটাই একটা বিশেষ ধরনের খুড়োর কল। এর আড়ালে সামগ্রিক চিত্র অধরা ও ঝাপসা থেকে যায়। ব্যপক জনগনের চিন্তন ও মননকে সংহত করে বিশেষ পথে চালিত করাই এর প্রধান কাজ।

মোদ্দা কথা ধণতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের বিবর্তনের যে পর্যায়ে জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বলা হয়েছিল, তার পূনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। ধনী দেশেদের কাছে বিশ্বের অন্যত্র জাতীয়তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠনে বা জাতীয়তার বিসর্জনে কিছুই যায় আসেনা। ধর্ম, ভাষা বা আঞ্চলিকতার