name
প্রথম পাতা নিবন্ধ  

 

 

 

অশেষ কুমার দাস
বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের শ্মশানঃ নাম তার চন্ডাল

অন্যান্যদের নিবন্ধ

অভিজিৎ মজুমদার

আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

বানীপ্রসন্ন মিশ্র

অশেষ দাস

সব্যসাচী সরকার

 

 

দার্জিলিং জেলার মহকুমা বা তরাই অঞ্চলের আর একটি নাম হয়তো হওয়া উচিত ছিল কিরাতভূমি। তার একটি বড় কারন হল পৌরানিক যুগ থেকেই মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীর মানুষেরাই শুধুমাত্র এখানে বাস করত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এখানকার মানুষের আচার ব্যবহারও এই জনগোষ্ঠীর ছাপ ছিল স্পষ্ট। এখানকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালী রাজবংশীরাই ছিল সংখ্যাগুরু। তাদের জীবন চর্চা বা সংস্কৃতিতে হিন্দুয়ানার চাইতে বাঙালিয়ানাই ছিল প্রবল। তারই একটা বড় উদাহরন হল এই জনগোষ্ঠীর শেষকৃত্য সমাপন বা শ্মশান ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় রক্তচক্ষু নিয়মের চাইতে কোনো রকমে শেষকৃত্য সমাপন করাটাই ছিল বড় কথা। যার ফলে দেখা যায় যে এখানকার শ্মশানভুমিতে স্বামীর সাথে সহমরণে গিয়ে যেমন কেউ সতী হয়নি, তেমনই এখানে সাধন করে কোনো ক্ষ্যাপা সিদ্ধি লাভ করেননি। এখানকার নিয়মতন্ত্র এতটাই সাদামাটা ছিল যে তা সম্ভবও ছিল না। এর জন্য অবশ্যই দায়ী ছিল অসম্পূর্ণ আর্য সংস্কৃত্যায়ন বা অসংস্কৃত্যায়ন এবং খুব সামান্য হলেও এখানকার ভৌগলিক অবস্থান।

এখানে যখন প্রথম মানব বসতি শুরু হয়েছিল সেই সময় থেকে শিলিগুড়ি মহকুমা বা তরাই অঞ্চলে ছিল বনভুমির প্রাধান্য। এই গভীর বনভুমির কারণেই হয়তো বা বিভিন্ন সময়ে প্রাগজোতিষপুর বা পুন্ডবর্ধন, কামরূপ বা কোচবিহার অথবা গৌড় রাজ্যের রাজারা এই অঞ্চল অধিগ্রহনে তেমন কোনো উৎসাহ দেখায়নি। তবে বর্তমানে শিলিগুড়ি শহরের মহানন্দা নদীতীর পর্যন্ত কোচবিহার রাজ্যের অধীন ছিল। ধারনা করা যায় যে এই শিলিগুড়ি মহকুমাতে প্রথম জনবসতি শুরু হয়েছিল প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ২৩০০ থেকে। প্রাগজোতিষপুর রাজ্যে কিরাত শাসন অবসানের পর এই রাজ্যের জনবিন্যাসে এসেছিল ব্যাপক পরিবর্তন। সে সময়ে অষ্ট্রি নরগোষ্ঠির আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কিরাত জনগোষ্ঠীয় মানুষের পান্ডব বর্জিত শিলিগুড়ি মহকুমাতে প্রথম বসতি স্থাপন করে। এখানে বসতি স্থাপনের আর একটা বড় কারণ ছিল যে জনগোষ্ঠিগুলো নিজ নিজ সংস্কৃতি স্বাধীনভাবে অনুশীলন করতে পারত এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অঞ্চল হওয়াতে রাজস্ব প্রদানের ব্যাপার ছিলনা। পৌরানিক যুগেই বর্তমান শিলিগুড়ি মহকুমায় ছিল কিরাত প্রাধান্য। উত্তরের ধ্যান-মৌন হিমালয় আজো যার নীরব সাক্ষী।

তরাইয়ের বসবাসরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে রাজবংশী বাঙালিরাই ছিল সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়। কিরাত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ হিন্দু ধর্ম গ্রহনের মধ্যে দিয়ে বাঙালি রাজবংশীতে পরিণত হয়। এই জনগোষ্টীর একটি জীবন-সংস্কৃতিতে জন্ম থেকে মৃত্যু পযর্ন্ত প্রতিটি অধ্যায়ে বাঙালি কৃষ্টির ছাপ সুষ্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়। শেষকৃত্য সমাপনের ক্ষেত্রেও তাই অন্যান্য বাঙালিদের সাথে সাদৃশ্য লক্ষ করা গেলেও, তা হিন্দুধর্মীয় গোঁড়ামি মুক্ত ছিল। আর একটা কথাও এক্ষেত্রে বলা দরকার যে ভৌগলিক কারনেই এখানে বহু শ্মশান গড়ে উঠেছিল। প্রতিটি জনপদেই একটা করে শ্মশানভূমি ছিল। কারণ অরণ্যবহুল অঞ্চল হওয়াতে মৃতদেহ সৎকারের জন্য বাসস্থানের নিকটবর্তী স্থানেই দাহ করা হত। এই সমস্ত শ্মশানগুলোর স্বাভাবিক চিহ্ন হিসাবে ছিল অন্তত তিনটি আমগাছ এবং খুব সামান্য হলেও জলাভূমি। জলে স্নান করিয়ে মৃতদেহ চিতায় তোলাই হল হিন্দু শাস্ত্রসম্মত কাজ। এর সাথে চিতার আগুনে আম্রপল্লব সহ কাঠ দিতে হত শ্মশানযাত্রীদের। এই ধরনের শ্মশান সংখ্যা কত ছিল তা আজ বলা সম্ভব নয়। নাগরিকে জীবন বিকাশের সাথে সাথে এই ধরনের শ্মশান লুপ্ত হতে থাকে। তবে একটা কথা অবশ্যই বলা দরকার যে উত্তর বাংলার উপহিমালয় অঞ্চলে বাঙালি রাজবংশী বাঙালি-প্রধান গ্রামগুলোতেও দেখা যেত।

ভারতবর্ষে কোম্পানি শাসন বা ইংরেজ শাসন শুরু হবার পর থেকেই তরাই অঞ্চল বা পূর্ব মোরাং এ বসবাস শুরু করেছিল বিদ্রোহী সন্ন্যাসী নামধারী এক বিশেষ জনগোষ্ঠী। অধ্যাপক বাণীপ্রসন্ন মিশ্রর মতে এই গোষ্ঠী নবম শতাব্দীর শঙ্করাচার্যের ভাবাদর্শে বিশ্বাস করতো। এরা ছিল জটাধারী ও গায়ে ছাই মাখত এবং মাথায় কালো পাগড়ি ব্যবহার করত। ঘরের মধ্যে আগুনের পাশে উলঙ্গ অবস্থায় বসে থাকত এবং ওই অবস্থায় প্রকাশ্যে আসতে দ্বিধাবোধ করতোনা। পেশা হিসাবে এরা যেমন কোম্পানি এলাকায় লুঠতরাজ ডাকাতি করত, তেমনই ব্যবসা বাণিজ্যও করত। ডঃ মিশ্রর মতে, এই সন্ন্যাসীরা ছিল আদতে বানিয়া গোষ্ঠী। খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ভেকধারী সন্ন্যাসীদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় জানা যায়না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এই সন্ন্যাসীদের হাত ধরেই কিরাতভূমি অথবা অনার্য ভূমি তরাইতে আর্যসংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল। যার ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই আর্য বিধান অনুযায়ী একদল মানুষ লাঞ্ছিত হয়েছে অপর একদল মানুষের হাতে। এই ধর্মীয় ভাবাদর্শই তরাইয়ে শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনে বয়ে এনেছিল বিভেদের রেখা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত স্থানীয় মানুষ তা তিলে তিলে প্রত্যক্ষ করেছে। সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় আবেগ আর সন্ত্রাসের ভয়ে মানুষ তখন চুপ থাকতে বাধ্য ছিল।

প্রশ্ন আসে যে তরাইতে আর্য সংস্কৃতির এই ডামাডোল কবে প্রথম শুরু হয়েছিল। অধ্যাপক মিশ্রর মতে পৃথ্বীনারায়ন শা নেপাল সিংহাসনে আসীন হবার আগে পযর্ন্ত নেপালের আঞ্চলিক রাজাদের সাথে নেপালিদের সম্পর্ক ভালো ছিল। কিন্তু এই নেপালি রাজার সর্বগ্রাসী নীতির কারণেই সন্ন্যাসীরা নেপাল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ধারনা করা যেতে পারে ১৭৭০ সাল থেকে সন্ন্যাসীরা তরাইতে তাদের আখড়া গড়ে তোলে। এই তরাইতে দাঁড়িয়েই সন্ন্যাসীরা ভূটান রাজের সাথে মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং কোচবিহার রাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সেই ঘটনা ইতিহাসের অন্য আর এক অধ্যায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যেতে পারে যে এমত অবস্থায় তরাইয়ের প্রশাসনহীন নিরপেক্ষ ভূমি সন্ন্যাসীদের কাজ চালাবার পক্ষে আদর্শ বলে মনে হয়। তাই তারা এখানে এসে খুব সুপরিকল্পিতভাবে তাদের আখড়া গড়ে তোলে। গৈরিক সন্ন্যাসীদের আগমনে তরাইয়ের গগনে গর্জে ওঠে বিভাজনী মন্ত্র, আর ভূমিপুত্রের দল হয় নিজভূমে পরবাসী।

তরাইতে সন্ন্যাসীদের বাসস্থান, নাম তার সন্ন্যাসী স্থান। এই সন্ন্যাসীদেরই অপর একটি শাখা পরিচিত ছিল গোঁসাই নামে। পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত একই সরল রেখায় অবস্থিত ছিল এই সন্ন্যাসী আর গোঁসাইদের বাসভূমি। যদিও আশ্চর্যের কথা যে ১৯২১-২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলা সরকার যে jurisdiction list প্রকাশ করেছে তাতে দুটি নাম, সন্ন্যাসী স্থান ও গোঁসাইপুর অনুপস্থিত রয়েছে। তবে এই সন্ন্যাসী গোঁসাইদের শেষকৃত্য সমাপনের জন্য শ্মশানভূমি ‘চন্ডাল’-এর নাম ওই সরকারি তালিকাতে রয়েছে। রাজা ঝাড় মৌজার অন্তর্গত এই চন্ডালজোত। মৌজা নম্বর ৮৯, মোট আয়তনে ৫৯৫.৯০ একর। ১৯৯০ সালের ৩রা জুন তারিখে প্রকাশিত Bengal Tenancy Act অনুযায়ী জারি হওয়া বিজ্ঞপ্তি নং ১০১২ থেকে এই তথ্য জানতে পারা যায়। ১৯৫৪-৫৬ সালে জরিপের ভিত্তিতে গঠিত এই মৌজা তালিকাতে এই রাজা ঝাড় মৌজা নম্বর হয় ১০১, তখন এটি নকশালবাড়ি থানার অন্তর্গত ছিল। এই তালিকাতে কোনো জোতের উল্লেখ হয়নি। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই চন্ডাল জোতও অনুল্লেখ রয়েছে। আরো আশ্চর্যের কথা যে সন্ন্যাসী ও গোঁসাইদের বাসস্থান সন্ন্যাসীস্থান এবং গোঁসাইপুর নাম দুটি কোনো তালিকাতে জোত হিসাবেও ঠাঁই পাইনি।

জোতের নাম চন্ডাল। ১৮৭২ সালের প্রথম আদমশুমারিতে চন্ডাল সংখ্যা ছিল ২৯২ এই দার্জিলিং জেলাতে। আদতে এটি ছিল আর্যসংস্কৃতি অনুযায়ী সন্ন্যাসী গোঁসাইদের শ্মশানভূমি। তবে আজো মানুষ কিন্তু এই নামেই জোতটিকে চিহ্নিত করে থাকে। ক্ষেত্র সমীক্ষা কালে জানতে পারা যায় যে এখানে বর্তমানে প্রায় ২৪৩টি বাসগৃহ রয়েছে। এই মোট বাসগৃহের তিনটি বাদে বাকি সব বাড়ির মালিক হল রাজবংশী বাঙালিরা। অন্য তিনটি বাড়ির মালিক দ্রাবিড় নরগোষ্ঠীর মানুষ বলেই ধারণা করা হয়। এই রাজবংশী বাঙালিরা প্রায় সকলেই ওই দ্রাবিড়দের তুলনায় এখানে নবাগত। তবে এই অরাজবংশী এবং অনার্য জনগোষ্ঠী কবে কোথা থেকে এসেছিল সে সম্পর্কে সঠিক তথ্যের যথেষ্ঠ অভাব আছে। তবে একজন মাত্র গ্রামবাসী এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিল যে তাদের পিতৃপুরুষের পূর্ব নিবাস ছিল মালদহ। এই জোতটিতে আরো যা রয়েছে, তা হল বুড়ি বালাসন নামে একটি খাল। বালাসন নদী থেকে এই খালটি কাটা হয়েছিল। ইংরেজ ভাষ্যকারের কথায় মেচ জনগোষ্ঠী এই খালটি কেটেছিল মাছ ধরবার জন্য। এছাড়াও রয়েছে আমগাছ এবং কালীবাড়ি। এর সাথে লক্ষনীয় হল যে রাজা ঝাড় মৌজার পার্শ্ববর্তী মৌজার নাম হল শিয়াভিটা। ১৯২১ সালের তালিকা অনুযায়ী এই মৌজার নম্বর ৮৯ এবং ১৯৫৪-৬৬র তালিকা অনুযায়ী নম্বর ১০৪। এই চন্ডাল জোতটি গোঁসাইপুরের দক্ষিণে অবস্থিত আর একটি মৌজা অতিক্রম করে এই জোতে পৌঁছতে হয়। অর্থাৎ আর্য বিধান অনুযায়ী চন্ডালদের বাসভূমি শ্মশান আবাসস্থল থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানরত। হয়তো, ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার জন্যই যাতে চন্ডাল জোতের বাতাস যাতে না ধুইয়ে দিতে পারে গোঁসাইদের বাসস্থান – একথা মনে রেখেই হয়তো এমনটা করা হয়েছিল।

কিরাতভূমিতে হিন্দুধর্মের অনুশীলন চালাতে গিয়ে সন্ন্যাসী গোঁসাইদের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হয় শেষকৃত্য সমাপনে। এই ব্যাপারে যেমন ছিল তাদের কাছে শাস্ত্রীয় বিধান, তেমনই তারা নির্ভরশীল ছিল অন্য নরগোষ্ঠীর মানুষদের ওপর। ঘরে বসে হিন্দু আচার মেনে জপতপ করা বা যজ্ঞের আগুন প্রজ্জ্বলন করা আর শেষকৃত্যের জন্য চিতার আগুন জ্বালানো যে আর এক করা, কিরাতভূমিতে সন্ন্যাসীরা তা হাড়ে হাড়ে টের পায়। আবার স্থানীয় মানুষদের থেকেও এই কাজের জন্য মানুষ পাওয়া সম্ভব ছিল না। আবার শাস্ত্রীয় বিধান মেনে প্রয়োজন ছিল উপযুক্ত মানুষের। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মেচ ও ধীমলরা মৃতদেহ কবর দিত। বাঙালি রাজবংশীরা চিতা জ্বালিয়ে শেষকৃত্য সমাপনের কাজ জানলেও তারা এই ব্যাপারে আর্য উন্নাসিকতার জন্য শ্রমবিভাজন ভিত্তিক গড়ে ওঠা হিন্দু বাঙালি সমাজের সাথে কখনোই একাত্ম হতে পারেনি। যার দরুন সন্ন্যাসীদের আমদানি করতে হয়েছিল মানুষ। জীবিকা হিসাবে হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী যারা বাধ্য হয়েছিল মৃতদেহ সৎকার-এর মতন কাজকে বেছে নিতে। হিন্দু বিধান অনুযায়ী যাদের হাতে জলপান ছিল পাপ, যাদের সংস্পর্শে আসলে পরে স্নান করা ছিল বাধ্যতামূলক। ধর্মীয় অনুশাসনে যাদের পরিচয় ছিল চন্ডাল নামে। The Tribe and Caste of Bengal H.H Risley লিখেছেন, Unlike the sudras, however, the Chandals were Debarred from entering even the outer circles of Aryan system. জীবিত অবস্থায় আর্যরা এই অনার্যদের সংস্পর্শে না আসলেও মৃত্যুর পরে এই জনগোষ্ঠীর হাতে তাদের শেষ সৎকারের জন্য নির্ভর করতে হত। এভাবেই হয়তো হিন্দু পরমাত্মা স্বর্গলোকের পথে যাত্রা শুরু করত। প্রতিবেশী কোনো অঞ্চল থেকে সন্ন্যাসীরা চন্ডাল আমদানি করেছিল তরাই এ শবদাহের জন্য।

তরাই বা পূর্ব মোরাং – সন্ন্যাসীরা কোথায় কোথায় তাদের আখড়া গড়ে তুলেছিল, এই সম্পর্কে আমাদের ভরসা করতে হয় একমাত্র গ্রাম-নাম- এর বিশ্লেষণে। যার দরুন আমরা খুব সহজেই সিদ্ধান্ত করতে পারি যে সন্ন্যাসী স্থান-এর অর্থ হল যেখানে সন্ন্যাসীরা বাস করত। আবার তেমনি গোঁসাইপুরে বসবাস করত এই সন্ন্যাসীদের একটি গোষ্ঠী গোঁসাই সম্প্রদায়। এক্ষেত্রে লক্ষনীয় হল এই গ্রামদুটির অবস্থান। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত তিন-চার কিলোমিটার দীর্ঘ এক সরলরেখার পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থান করছে সন্ন্যাসীস্থান এবং পূর্ব প্রান্তে গোঁসাইপুর। এর মধ্যবর্তী স্থানটির বেশিরভাগ অংশের পরিচয় হল বাগডোগরা শব্দটি এসেছে বাঘ এবং ডেগর থেকে। কামরূপী বাংলায় ডেগর শব্দের অর্থ হল পথ বা রাস্তা। অর্থাৎ বাগডোগরার অর্থ দাঁড়ায় বাঘ চলাচলের রাস্তা বা পথ। সুতরাং এই ছবি থেকে আমরা সহজ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে সন্ন্যাসীদের ডেরা দুটি ছিল বনের দুই প্রান্তে। আজকে তরাইতে সন্ন্যাসীস্থান হল একটি বিখ্যাত চা-বাগান এবং গোঁসাইপুর গ্রামটি হল বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। বাগডোগরা নামক অরণ্যটি হল উত্তর বাংলার একমাত্র বিমানবন্দর।

আগেই বলেছি চন্ডাল নামক জোতটি ছিল গোঁসাইপুরের দক্ষিণে, প্রায় তিন-চার কিলোমিটার দূরে। রাজাঝাড় মৌজার অন্তর্গত এই মৌজাতে যে তিনটি জোত রয়েছে তার নাম হল রাজাঝাড়, আলোঝাড় এবং চন্ডাল। এই নামের মধ্য দিয়ে খুব সহজেই বোঝা যায় যে রাজাঝাড় নামের অর্থ হল কোনো জমিদার বা জোতদার – এর অধীনস্থ অরণ্য অথবা অরণ্যের গভীরতার কথা মনে রেখে ঝাড়ের সাথে রাজকীয় মেজাজের কথা মুক্ত করতে রাজা ঝাড় নামকরণ হয়েছে। এমন অবস্থায় সন্ন্যাসী ও গোঁসাইরা যখন এখানে চন্ডালদের বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে শ্মশানভূমি গড়ে তোলে, তখন প্রচূর পরিমানে গাছ কাটতে হয়। যার ফলে মৌজার একটি অংশে গাছের সংখ্যা কমে অরণ্য অনেক অগভীর হয়ে যায়। যেখানে সহজেই দিনের আলো প্রবেশ করে। তাই নাম করণ হয় আলোঝাড় অর্থাৎ অগভীর অরণ্য। আর চন্ডাল অর্থ তো আগেই বলেছি শ্মশানভূমি। এই রাজাঝাড় মোজার পার্শ্ববর্তী মৌজার নাম হল শিয়াভিটা। অর্থাৎ যেখানে শিয়াল নামক প্রাণীর বাস। সামগ্রিক ছবি বিচার করে আমরা যেটা বুঝতে পারি, তা হল সন্ন্যাসী গোঁসাইরা তরাইতে বসবাসের পর রাজা ঝাড় নামক মৌজাতে শ্মশান স্থাপন করেছিল। সেই শ্মশানে চন্ডাল গোষ্ঠীর মানুষ থাকত শেষকৃত্য সমাপনের জন্য। সে শ্মশানে আমগাছ ও বুড়িবালাসন নামে এখনো একটি খাল রয়েছে। যা হিন্দু আচার পালনের সহায়ক। এছাড়া কালীবাড়িও ছিল এবং এখনো আছে। আর ছিল শ্মশানের প্রাণী শিয়াল। এই চন্ডাল জোতই হল তরাই অঞ্চল বা শিলিগুড়ি মহকুমার আর্য সংস্কৃতির অধীনে প্রথম শ্মশানভূমি। এই জোতটিকে আজো শ্মশানের কিছু কিছু চিহ্ন রয়েছে। হিন্দু ধর্মে বলা হয় আত্মা অবিনশ্বর। সেই সাথে এই সাধারন প্রতিবেদক যুক্ত করতে চাই আত্মা হয়তো অবিনশ্বর, সেই জ্ঞানগর্ভ দার্শনিক বক্তৃতায় ক্ষুধার্ত মানুষের কিছু যায় আসেনা। তবে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে তরাইয়ের সমৃদ্ধশালী কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের পাশে কীভাবে এমন চন্ডাল নামী সাংস্কৃতিক দৈন্যতা আজো অবিনশ্বর হয়ে টিঁকে আছে। একি দৈন্যের দর্শন, না দর্শনের দৈন্যতা। হায় চন্ডাল!

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র এই বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের নিয়ে অমূল্য উপন্যাস রচনা করেছিলেন, যার নাম আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানি। ফলে বাঙালি পাঠক সমাজে ধারণা করা হয় যে সন্ন্যাসীরা ছিল স্বাধিনতাকামী এবং মানবদরদী। এরকম একটা ভ্রান্ত ধারণা নিয়েই বাঙালিসমাজ আজ অগ্রসর হচ্ছে এক সামঞ্জস্য ও এক সংহতির দিকে। আর তরাইয়ের চন্ডাল জোতে যেন ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছে দলিত বাঙালি সমাজ। একমাত্র জোনাকির আলো ছাড়া সভ্যতার কোনো আলো সেখানের জ্বলেনা। এই আত্মঘাতী সন্ন্যাসী সংস্কৃতির চন্ডাল জোত প্রমাণ করে আমাদের স্বাধীনতা মিথ্যা, মিথ্যা আমাদের সংস্কৃতির দীর্ঘ পরম্পরা। এমত অবস্থায় ঘুরে ফিরে মনে আসে কবির কথা – যিনি আমাদের আঘাতে অপমানে ভরসা দেন। ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্রাঘাত করে সেই মানুষটি আমাদের জ্ঞানের আলো জ্বালাবার কথা বলেছিলেন। তিনি ছিলেন বলেই আমরা জানতে পেরেছি সেই বিখ্যাত জার্মান দার্শনিকের মন্তব্য ‘ধর্ম হল আফিং এর গোলা’। যার ফলিত উদাহরণ হল তরাইয়ে সন্ন্যাসীদের শ্মশান, তার নাম চন্ডাল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

. The Sannyasi Rebellion: The Sociology and Economics of Conflict in Sub- Himalayan Bengal – B.P. Misra.

. The Tribes and Castes of Bengal – H.H. Risley

. নমশুদ্র আন্দোলন – শেখর বন্দোপাধ্যায় – বাংলার দলিত আন্দোলনের ইতিবৃত্ত, সম্পাদক – ডঃ চিত্ত মন্ডল ও ডঃ প্রথমা রায় মন্ডল।

. A Statistical Account of Bengal – W.W/ Hunter, Volume-X

এছাড়াও উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন অধ্যাপক ও একজন কর্মী, চন্ডাল জোতের দুজন বাসিন্দা ও বুকস্‌ ক্লাবের কয়েকজন বন্ধু আমার এই রচনায় সাহায্য করেছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ