name
প্রথম পাতা নিবন্ধ  

 

 

 

অভিজিৎ মজুমদার
‘উন্নয়নের’ সন্ত্রাসবাদঃ এক উত্তরবঙ্গীয় উপাখ্যান

অন্যান্যদের নিবন্ধ

অভিজিৎ মজুমদার

আর্যনীল মুখোপাধ্যায়

বানীপ্রসন্ন মিশ্র

অশেষ দাস

সব্যসাচী সরকার

 

chandmoni1
চাঁদমণি বাগানঃ উচ্ছেদের আগে

“ The old world is dead, the new world is not yet born,
monsters emerge in the twilight “ --- Antonio Gramsci.

শিরোনামের শুরুর শব্দবন্ধে পাঠকের ভুরু কুঁচকে যাওয়া স্বাভাবিক। একবিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বে উন্নয়ন অবশ্যই তার পূঁজিবাদি চরিত্রকে ঔদ্ধত্তের সঙ্গে ঘোষনা করেই হরেক রকম প্রতিশ্রুতি আর চমক-ধমক নিয়ে উপস্থিত। বিশ্বায়নী ঠাঁটে পুঁজিবাদি কেন্দ্র ও অন্তেবাসী দেশগুলি (centre-periphery) কী এক ম্যাজিকে উন্নয়নের একই মোহনিয়া মডেলে সুস্থির। অন্যদিকে, ৯/১১ পরবর্তী বিশ্বদর্শনে সাম্রাজ্যবাদী একনায়ক আমেরিকার ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ’ ও সন্ত্রাসী ইসলামি জিহাদের বশবর্তীদের ‘সভ্যতার সংঘাত’ সন্ত্রাসবাদের বেশ একটা একমাত্রিক গ্রহনযোগ্য সংজ্ঞা হাজির করেছে। এর মাঝে এই দুই প্রতিস্পর্ধী সূচককে একই পঙ্‌ক্তিতে দাঁড় করিয়ে দিলে তা এক মস্ত বিভ্রাট বলে মনে হতেই পারে। অতএব এই বিভ্রম দূর করার দায় শেষ বিচারে লেখককেই নিতে হবে।

নিবন্ধটির নিরীহ প্রস্তাবনাকে প্রতর্ক্যের (discourse) উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অক্ষমতার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে, অধুনা ‘উন্নয়ন’ এর ঝাঁ-চকচকে মডেলটির পেছনে যে পুঁজিবাদী চালিকা শক্তি, তার চরিত্রটি আসুন একটু প্রাঞ্জলভাবে বুঝে নেওয়া যাক। এ প্রসঙ্গে মার্কসবাদ শিরোধার্য্য।

ধ্রুপদী মার্কসবাদী ব্যাখ্যায় শিল্প পুঁজিবাদের আবির্ভাবের পূর্ববর্তী পর্বকে ‘আদি সঞ্চয়নের পর্ব (Primitive Accumulation of Capital) বলে বর্ণনা করা হয়। ‘এই পর্বে জমির পণ্যায়ন ও জমি ব্যক্তি মালিকানাধীনে চলে যাওয়া এবং জমি থেকে কৃষকের বলপূর্বক উচ্ছেদ; বিভিন্ন ধরনের সম্পত্তির অধিকারের (সাধারন, যৌথ, রাষ্ট্রাধীন ইত্যাদি) ব্যাক্তিগত সম্পত্তিতে রূপান্তরন; সাধারন অধিকারের অবদমন; শ্রমশক্তির পণ্যায়ন এবং বিকল্প (দেশীয়/সামূহিক) উৎপাদন ও উৎপাদিত সামগ্রী ভোগের উপর অবদমন; প্রাকৃতিক সম্পদ সহ অন্যান্য সম্পদের ঔপনিবেশিক, নয়া-ঔপনিবেশিক এবং সাম্রাজ্যবাদী আত্মসাঁৎ এর ঘটনা; অর্থকে বিনিময় ও করের মাধ্যম করে তোলা (বিশেষ করে জমির ক্ষেত্রে) - এই পরিঘটনাগুলি ঘটে চলে। দাস ব্যবসা, মহাজনি, জাতীয় ঋণ ব্যাবস্থা হল আদি সঞ্চয়ের (radical) উপায় সমূহ’। এবং “রাষ্ট্র তার হিংসার একচেটিয়া অধিকার আর আইনের নানারকম সংজ্ঞা দিয়ে এই প্রক্রিয়াকে মদত দেওয়া ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে”, (পুঁজি, কার্ল মার্কস)।

chandmoni2
চা বাগান উচ্ছেদের প্রতিবাদে গণমিছিল

ভারতবর্ষ সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ৯০ দশকে পরিবর্তিত হয় মার্কিন শাসিত নয়া অর্থনীতি। এই অর্থনীতি বাজারের উদারীকরণ, সম্পদের বেসরকারীকরণ ও সংস্কৃতির বিশ্বায়নকে দূর্বল দেশগুলির উপর চাপিয়ে দেয়। এই উদারীকরণ নীতি এমন কোনও সম্মানপূর্ণ ব্যাবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি যেখানে সকলেই সুখে থাকতে পারে। পরিবর্তে এই নীতি সামাজিক স্তরগুলির মধ্যে আগের থেকেও অনেক বেশি অসাম্যের জন্ম দিয়েছে। আদতে এই নয়া উদারনৈতিক মতবাদ হলো পুঁজিবাদের আদি সঞ্চয়নের পর্বে ফিরে যাওয়া। এর মূল কথা হ্ল “ --- অধিকারচ্যুতির মাধ্যমে পূঁজির সঞ্চয় করা। দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অধিকারচ্যুতি ঘটানো হয়েছে। এক, সাধারন সম্পদের বেসরকারীকরণ (বিদ্যুৎ, জল, যোগাযোগ ব্যাবস্থা, শক্তি ইত্যাদি)। দুই, কাঠামোগত পূনর্বিন্যাস (structural adjustment) নীতির মাধ্যমে IMF, বিশ্ব ব্যাংক, বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা দ্বারা বাস্তবত বিশ্বের গরিব দেশগুলির পূনঃঔপনিবেশিকরন। বর্তমানের শিল্পীয় পূঁজির ক্রমবর্ধমান ফাটকা পূঁজিতে রূপান্তরনে এই লুন্ঠন প্রক্রিয়া আগের সবগুলি রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বের পরিবেশগত সাধারন সম্পত্তি (জমি, বাতাস, জল) দ্রুত নিঃশেষিত করে ফেলা, স্বাভাবিক বাসস্থানের দ্রুত অবনমন ইত্যাদি কৃষি উৎপাদনে পূঁজিনিবিড় পদ্ধতিকে বাতিল করে এবং প্রকৃতির পাইকারী পণ্যায়ন ঘটে সবরকমভাবে। সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মেধাগত সৃজনশীলতার পণ্যায়নের বাঁধনে ঘটে চলে সার্বিক অধিকারচ্যুতির ঘটনা”। (নয়া সাম্রাজ্যবাদ। ডেভিড হারভে)।

উপরিউক্ত মার্কসীয় সন্ধর্ভে আজকের পূঁজিবাদের এই মানুষখেকো সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র, উন্নয়নের নতুন মডেল (বিপুল রাস্তা, উড়ালপুল, সফটওয়্যার পার্ক, তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স, বহূতল আবাসন, আন্তর্জাতিকমানের স্কুল, পাঁচতারা হোটেল এবং অগনিত শ্রমজীবি মানুষের পূনর্বাসনহীন উচ্ছেদ) রাষ্ট্রের হিংসার একচেটিয়া অধিকার (সন্ত্রাসবাদ) কে সূত্রায়িত করতে হবে।

আধুনিক নগরায়ন হলো এই ফাটকা পূঁজির ‘উন্নয়নধর্মী’ চরিত্রের চমৎকার প্রতিফলন, যা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মদতে প্রাকৃতিক সম্পদের পণ্যায়নের মাধ্যমে পূঁজির সম্প্রসারনকে অব্যাহত রাখে।

কর্পোরেট পূঁজি তার বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার লক্ষে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের মডেলটিকে মাথায় করে রেখেছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের যুগে দেশি বিদেশি ফাটকাপূঁজি লাভজনক রিয়্যাল এস্টেট কারবারে এসেছে। মহানগরগুলি পূণগর্ঠন আসলে বিশ্ব বাজারে ফাটকাপুঁজির অবাধ গতায়াতের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় নডাল কেন্দ্রগুলিকে বাস্তবায়িত করার অবশ্যম্ভাবী কর্মকান্ড। একটি মহানগরকে ঘিরে কতকগুলি উপনগরী গড়ে তোলা আদতে বিকেন্দ্রীকরনের নামে জল, জঙ্গল, জমিনের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কর্পোরেটের আধিপত্য স্থাপন। শ্রমজীবি সহনাগরিকদের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ থেকে উচ্ছেদ করে অধিকারচ্যুতির মাধ্যমে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া। নগরায়নের জাতীয়স্তরে পরিকল্পনার পরিবর্তে ফাটকাপূঁজির দ্রুত মুনাফা লাভের তাগিদে রাজ্য বা আঞ্চলিক শাসন কর্তাদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে দেশি-বিদেশি অর্থলগ্নীকারী সংস্থা অনর্গল এগিয়ে আসছে। তাই এখন সাম্রাজ্যবাদী নগরায়নের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক/স্থানীয় স্তরের পরিকল্পনা। ব্রিটিশ সরকারের সংস্থা DFID (Department For International Development) র মতে নগরায়নই না কি এখন আধুনিক ও উন্নত সমাজ গঠনের অন্যতম মাপকাঠি। আর কী আশ্চর্য্য ! পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এই কথারই অবিকল প্রতিধ্বনি।

সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের শহর-শহরতলি জুড়ে এখন নগরায়ন নামক এই উন্নয়নের সন্ত্রাসী আক্রমণের অসংখ্য নজীর গড়ে উঠছে। ধৈর্য্য ও পরিশরের অভাবে আসুন মাত্র একটি ক্ষেত্রের নমুনা সমীক্ষা করা যাক।

upanagari upanagari2
চাঁদমণি চা বাগানঃ বহুতল আবাসিক প্রকল্প উত্তরায়ন

সমীক্ষাঃ চাঁদমনি উপনগরী প্রকল্প
বৃত্তান্তটি সকলেরই জানা। এর একদিকে রয়েছে একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্পের সর্বনাশ করে তুরন্ত মুনাফার তাগিদে রিয়্যাল এস্টেট এর ফাটকাপূঁজির চমৎকারি খেলা। অন্যদিকে, চা-শ্রমিকদের জমি-জিরেত, চাকরি অর্থাৎ বেঁচে থাকার অধিকার জিইয়ে রাখতে সরকার-পুলিশ-প্রমোটারদের দালাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম অথচ সচেতন লড়াই এর এক অন্যায় উপাখ্যান।
পশ্চিমবঙ্গে বামশাসনের বিগত ৩০ বছরে চাঁদমনি চা-বাগান উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন মুনাফার বিরুদ্ধে শ্রমজীবি মানুষের রুখে দাঁড়াবার আন্দোলন। জীবন, জীবিকা, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন। তাই শেষ বিচারে মর্মবস্তু ও নির্য্যাসে একটি বামপন্থী আন্দোলন। উন্নয়ন বনাম উচ্ছেদের বিশ্বজোড়া বিতর্কের আপাত গনতান্ত্রিক ধাঁচের আড়াল ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে ’ ৯৬ - ’ ৯৭ সালে। এরই সূত্র ধরে ফাটকাপূঁজির স্বার্থে রাষ্ট্রশক্তির নিরস্ত্র শ্রমিকদের উপর নির্বিচার, নির্বিকার আক্রমনের যে সিলসিলা আমরা বিগত কয়েক বছর চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি, তা ভীতিপ্রদ সন্দেহ নেই। আবার একই সঙ্গে উন্নততর বামফ্রন্ট এর ধার করা উন্ননয়নের উন্নত মডেলটি যে কতটাই পুঁজিবন্ধু, জনস্বার্থবিরোধী হতে পারে তার নির্লজ্জ নজিরের জন্ম ও এই প্রকল্পের গর্ভগৃহে। ছোট-মন্ত্রী, বড়-মন্ত্রী, ছোট-আমলা, বড়-আমলা আর মাঝারি শিল্পপতি ও কর্পোরেট পূঁজিপতিদের প্রতিষ্ঠিত শিল্পকে লাটে তুলে দিয়ে সরকারী জমি নিয়ে ফাটকা মুনাফার এই উপনগরী প্রকল্পের অন্যতম চরিত্রলক্ষন অবশ্যই অমৃতভাষন। জনস্বার্থের নামে উন্নয়নের সরকারী ব্যখ্যা বারবার প্রমানিত হয়েছে গনআন্দোলনের অভিঘাতে।

১৯৯৭ এর ডিসেম্বর মাস। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শ্রীযুক্ত জ্যোতি বসু শিলিগুড়ি তে সভা আলো করে সাড়ম্বরে ঘোষনা করলেন চাঁদমনি উপনগরী প্রকল্পের। পাঠকের মনে পড়বে, রাজ্য শিল্পায়নের যোয়ার আনতে '৯৭- '৯৮ সালে শিল্প নিগমের চেয়ারম্যান সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তখন বেসরকারী পুঁজিপতিদের সঙ্গে একের পর এক MOU-চুক্তি (memorandum of understanding) সই করে চলেছেন। এই সময় একই সঙ্গে সাক্ষরিত হলো দুটি ঐতিহাসিক (!) উপনগরী প্রকল্প, রাজারহাট ও চাঁদমনি। অথচ প্রতিরোধ আন্দোলনের ধারায় চাঁদমনি চা বাগানের শ্রমিকদের জেহাদি আন্দোলনের তীব্রতা এক্ষেত্রে একটি সুনিদির্ষ্ট পার্থক্যরেখা তৈরী করে। চা বাগানের নতুন পূঁজিপতি মালিক-প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাজ্য সরকারের MOU - চুক্তি সম্পাদিত হয় ৯৮ এর গোড়ার দিকে। চুক্তির আড়ালে মানুষমারা উন্নয়নের অন্ধি-সন্ধি জেনে ফেলে অচিরেই গড়ে ওঠে ‘চাঁদমনি চা বাগান উচ্ছেদ বিরোধী যৌথ সংগ্রাম কমিটি’। এই যুক্ত মঞ্চের নেতৃত্বে রইলেন শহরের কয়েকটি অতিপরিচিত সমাজসেবী, পরিবেশপ্রেমী ও মানব অধিকার সংগঠন। এঁরা শুরুতেই এই প্রকল্পের যৌক্তিকতা এবং সেই সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের MOU-মুখি উন্নয়নের অভিনব মডেলটি নিয়েই প্রশ্ন করতে শুরু করেন। রাজ্যসরকারের সরকারী জমি লেনদেন সংক্রান্ত আইন, শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন আধিকারিকের শহর উন্নয়নের খসরা পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষন সংক্রান্ত চলতি সমস্ত আইনগুলিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোনোরকম স্বচ্ছতার তোয়াক্কা না করে এই প্রকল্প ঘোষিত হয়। যৌথ সংগ্রাম কমিটি জনবিরোধী, শ্রমিকবিরোধী এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রচার আন্দোলন শুরু করে। এঁদের বিরুদ্ধে ‘উন্নয়ন বিরোধী’ র তকমা লাগানোর সরকারী অপচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও ‘উন্নয়ন --- কার স্বার্থে’ এই প্রশ্নটি বিবাদের কেন্দ্রে এসে পড়ে।

প্রখ্যাত চা-কর দীপংকর চট্টোপাধ্যায় ১৯৯২ সালে বাগানটি কেনেন। মালিকানার হাত বদলের সঙ্গে সঙ্গে বাগানের কলেবর বৃদ্ধি বা সংরক্ষনের দিকটি সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়। জাতীয় সড়ক সংলগ্ন দামি সরকারী জমি মন্ত্রী ও আমলাদের সঙ্গে আতাঁতের মধ্য দিয়ে জলের দরে বাগিয়ে নেওয়াই এই জনস্বার্থবিরোধী উন্নয়নের আসল গল্প। ৪০৬.৬৪ একর জমির মূল্য মাত্র ১৩ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা ! (প্রকৃত সরকারী দাম ১২৩ কোটি টাকা)। অর্থাৎ প্রতি কাঠা জমি পেছন দরজা দিয়ে বিকোল মাত্র সাকূল্যে ৬০০ টাকা কাঠার কম দামে। নতুন শহর-ফহর গুলি মারো! ৬০০ টাকায় কিনে ‘উন্নত’ জমি প্রতি কাঠা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় বেচে দিতে পারাটাই চ্যাটার্জী ও তাঁর সাকরেদ বেঙ্গল-অম্বুজা খ্যাত হরষ নেওটিয়া দের আশু লক্ষ্য।

বাকিটা ইতিহাস। ৯৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত উচ্ছেদ বিরোধী কমিটির নাছোড় একক প্রচার। ২০০০ এর নভেম্বর এ তাবর দালাল শ্রমিক নেতাদের শ্রমিক বিরোধী চুক্তির বিরোধীতায় বাগান-শ্রমিকদের ‘মজদুর-মোরচা’ গঠন।

এবারে বিপদ বুঝে, মধ্যবিত্তের সচেতন প্রতিবাদ ও সংগঠিত শ্রমশক্তির মিলিত প্রতিরোধ ভাঙ্গতে অগত্যা বাম সরকারের দাঁত-নখ উন্মোচন। চাঁদমনিতে নিরস্ত্র প্রতিরোধী শ্রমিকের উপর গুলি চললো ২৬ শে জুন, ২০০২। প্রমোটার এর স্বার্থে রাজ্য পুলিশ বাহিনির চা-গাছ উচ্ছেদ অপারেশন রুখতে বুকের রক্ত ঢেলে শহিদ হলেন অস্থায়ী শ্রমিক রাম ভগৎ ও রনজিৎ জইসোয়াল। গুলিবিদ্ধ হলেন শ্রমিক পরিবারের আরও তিনজন। উত্তাল গন আন্দোলনের জোয়ারে পিছু হটতে হলো সরকারী, বেসরকারী মুনাফাখোরদের। মিথ্যার বেসাতি ছাড়া উপায়ান্তর নেই দেখে কোমর কষে নেমে পড়লেন ছোট-বড় মন্ত্রী-আমলারা। তৈরী হল পুলিশ-গোয়েন্দাদের যোগসাজসে চা বাগানে মাওবাদী গোপন ডেরার রোমহর্ষক গল্প। কিন্তু এই আজগুবী গল্পটি নেহাতই মাঠে মারা গেল মূলতঃ প্রতিরোধ আন্দোলনের গনতান্ত্রিক মর্মবস্তুর সুবাদে। তাই শেষমেশ তারা আটঘাট বেঁধে চরম রাষ্ট্রীয় হানাদারির ছক সাজিয়ে নিলেন অনেকটা সময় নিয়ে।

১ ফেব্রুয়ারী, ২০০৩। গন প্রতিরোধ রুখতে শিলিগুড়ি ও বাগান সংলগ্ন মাটিগাড়া এই দুটি থানা এলাকায় ৭২ ঘন্টা ব্যাপী ১৪৪ ধারা জারি করা হলো। ৩ জন পুলিশ সুপার ও ১২ জন ডি এস পি র নেতৃত্বে RAF, Combat Force, Darjeeling Police, State Armed Police এমনকি দুর্গাপুর থেকে আগত জনযুদ্ধকে শায়েস্তা করতে তৈরী বিশেষ ঠ্যাঙ্গারে বাহিনীর এক হাজারের ও বেশি সৈন্য-সামন্ত দিয়ে বাগান ঘিরে ফেলা হলো। সকাল থেকে শুরু হলো ট্রাক্টর, পে-লোডার ও বহিরাগত ৩০০ দিনমজুর দিয়ে চা-গাছ উচ্ছেদ অভিযান। ক্ষুব্ধ, বেপরোয়া শ্রমিকদের খালি হাতে লড়াই থেকে নিরস্ত করতে বাগানের চৌহদ্দিতে জারি করা হলো অঘোষিত জরুরী অবস্থা। শ্রমিকদের পুলিশি ঘেরাটোপে বন্দুকের মুখে ঠায় বসিয়ে রেখে চা-গাছ উপড়ে ফেলা হলো। ৩ দিন ব্যাপী মারণযজ্ঞ সম্পন্ন হলো গাছের কংকাল নিয়ে লুঠতরাজের মধ্যে দিয়ে। অসহায় শ্রমিকেরা চোখের জল ফেললেন। ছোট মন্ত্রী হাসলেন, বড় মন্ত্রী হাসলেন, আর দীপংকরের আড়ালে বেঙ্গল- অম্বুজার কর্পোরেট কর্তা হর্ষ নেওটিয়া অট্টহাসে ফেটে পড়লেন। চিত্রনাট্যের শেষ অঙ্কে সফেদ মুখ্যমন্ত্রী নেওটিয়াকে ট্যাঁকে গুঁজে ১৬ মার্চ চাঁদমনির খাঁ খাঁ মরুভূমির শান্তিতে, নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র বলয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর সুভাষিত শোনালেন। ট্রাকবাহনে সমবেষ্টিত সি পি এম পার্টি সদস্যদের বোঝাতে চাইলেন আজকের উন্নয়নের মূলমন্ত্র। কেমন করে প্রতিষ্ঠিত শিল্পকে অ-লাভজনক আখ্যা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে কর্পোরেট শাসিত, সরকার লালিত রিয়্যাল এস্টেট এর আকাশচূম্বী উন্নয়ন।

তবু, ভবি ভুলবার নয়। ঐদিন শ্রমিক মহিলা-পুরুষ, এমনকি পরিবারের শিশুরা উপনগরীর বিরোধীতায় বুকে ব্যাজ এঁটে বুদ্ধবাবুর মঞ্চের সামনে দিয়েই বাগানের ধুকুরিয়া ডিভিসনে কাজ করতে গেলেন। কাজ শেষে বিক্ষোভ জানাতে বাগানেই আয়োজিত হলো শহিদ স্মরণে প্রতিস্পর্ধী সমাবেশ।

শুধুমাত্র সরকারী কড়া দাওয়াই দিয়ে শ্রমিকদের দমানো যাবেনা - একথা বিলক্ষন জানেন এই মন্ত্রী, আমলারা। আর এও জানেন চাঁদমনিতে একবার শিকে ছিঁড়লেই শিলিগুড়ি সংলগ্ন দাগাপুর, মোহরগাঁও-গুলমা, মাটিগাড়া, নিশ্চিন্দিপুর এই ছোট - বড় চা বাগানগুলির মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দেওয়া যাবে। দাজির্লিং শহর লাগোয়া দুটি চা বাগানের মালিক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই শহর সম্প্রসারণে শিল্প তুলে দেওয়ার আরজি নিয়ে হাজির! এভাবেই উন্নয়নের ধমাকা ছুটছে, ছুটবে। লগ্নী ছাড়াই লভ্যাংশ! একুশ শতকের উন্নয়নের ২০০ মজা। শহর শিলিগুড়ির মালিকানার মানচিত্র নিঃসন্দেহে দ্রুতই পাল্টাচ্ছে।

অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ/উন্নয়নের সন্ত্রাসবাদ
এই নিবন্ধের উপজীব্য আসলে যে রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী আধিপত্যবাদের মধ্য দিয়ে ‘উন্নয়ন’ নামক লুন্ঠনের আখ্যান তা বিচক্ষন পাঠক বেশ বুঝতে পেরেছেন। একেই অধুনা অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ
(economic terrorism) এর অভিধায় চিহ্নিত করা হয়েছে জগৎ জুড়ে। এই নয়া উদারনীতিবাদ (neoliberalism) বাজার ব্যবস্থার বাইরে থাকা সমস্ত প্রতিরোধকে নস্যাৎ করেই অর্থনীতির সীমানা ক্রমে পেরিয়ে একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসে পর্যবসিত হয়। এবং তা ততক্ষনই সাবলীলভাবে স্থায়ী, যতক্ষন দেশের অভ্যন্তরে একটি সংসদীয় গনতান্ত্রিক (!) কাঠামো থাকবে, অথচ জনসংখ্যার বৃহদাংশই তথ্যের পূঁজি ও নীতি নির্ধারণের অর্থবহ অংশগ্রহনের অধিকার থেকে বেবাক বঞ্চিত থাকবে। প্রতিটি নির্বাচন আরও বেশি বেশি করে বাজারের নীতিকে মান্যতা দেয়। আর এভাবেই কর্পোরেট শাসন প্রশ্নাতীত মান্যতা পেয়ে যায়। (Globalisation is the accelerated integration of capital, production and markets globally, a process driven by the logic of corporate profitability - Walden Bello).

উত্তরবঙ্গ এবার কর্পোরেটের কবলে।
মুনাফা মানুষ খাচ্ছে!!!

প্রাজ্ঞ পাঠক কী ভাবছেন?

(উত্তরবঙ্গের ছোট পত্রিকা বৈতানিকের সৌজন্যে )