name
প্রথম পাতা নিবন্ধ  

 

 

 

 

 

 

গৌতম রায়

লোকসংস্কৃতিঃ প্রতিবাদ পদে পদে প্রবাদে

সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি মানব সভ্যতার সৌধচূড়া যার ভিত রয়েছে সমাজে। কাজেই লোকসংস্কৃতি বলতে জনগনের সংস্কৃতি বোঝাতে কোনো বাধা নেই। তবুও লোকসংস্কৃতি একটি সীমাবদ্ধ পরিমন্ডলে তার অর্থদ্যোতনা করে। তাই লোকসংস্কৃতি বলতে সাধারণভাবে বুঝি গ্রামীন জনগণের মৌখিক বা অলিখিত সংস্কৃতি। প্রকৃতপক্ষে লোকসংস্কৃতি মানব-সমাজ-সংস্কৃতির অঙ্গ যা অতীতের নৌকায় চড়ে বর্তমানের স্রোতে ভেসে ভবিষ্যতের বেলাভূমির দিকে এগিয়ে চলেছে। ফলে, লোকসংস্কৃতিতে অতীতের প্রতিধ্বনি ছাড়াও বর্তমানের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর শুনতে পাই। লোকসংস্কৃতির মধ্যে যেমন একটা স্থিতিস্থাপক শক্তি আছে, তেমনি তা সমন্বয়ধর্মীও বটে। তাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর সংস্কৃতির সমন্বয় হতে দেখি লোকসংস্কৃতিতে। দেখি কখনো নগর সংস্কৃতি লোকসংস্কৃতির সমুদ্রে পুষ্ট হচ্ছে আবার কখনোও লোকসংস্কৃতি নগর সংস্কৃতি দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে। জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠি এবং ভৌগলিক সীমানার বন্ধন অতিক্রম করে লোকসংস্কৃতির এই যে যাত্রা তা আজও অপ্রতিহত রয়েছে। জনগণের মধ্যেকার সেতুবন্ধনের কাজে লোকসংস্কৃতির অবদান অনস্বীকার্য। কোনো বিশ্বাস বা মত, প্রতিবাদের ভাষা, সংগ্রামের সুর লোকসংস্কৃতির মাধ্যমে যত সাধারণ মানুষের কাছে যত সহজে এবং ব্যাপক আকারে নিয়ে যাওয়া যায় এমন আর কোনো গণ মাধ্যমে সম্ভব নয়। তা সে লোকাচারের কাহিনি, লোকগান, প্রবাদ প্রবচন, ছড়া, হেটো কবিতা বা লোকনাট্য যার মাধ্যমেই হোক না কেন।

মানবজীবনের কতকগুলো মৌলিক বিষয় নিয়ে প্রবাদ রচিত হয়। প্রবাদ প্রবচন বিস্তৃততম জীবন অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ততম সাহিত্যিক প্রকাশ। মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা তার নিজস্ব প্রাত্যাহিক ব্যবহারিক জীবনকে কেন্দ্র করেই গঠিত হয়। যা বহূলপ্রচলিত, আকারে সংক্ষিপ্ত, প্রকারে সরস, আপাততুচ্ছ কিন্তু স্বরূপগত গভীর উক্তি। কোনো কোনো প্রবাদের মধ্য দিয়েই ব্যাখ্যাত হয় অসংযমীর নির্মম সমালোচনা, তার প্রকাশও বিদ্বেষপূর্ণ এবং শ্লেষাত্মক। সমাজতাত্ত্বিকরা সমাজের কন্ঠস্বর শুনতে পান প্রবাদের মধ্য দিয়ে। খুঁজে পান বহূবিধ অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার-উৎপীড়ন, বঞ্চনা-বেদনা, ক্ষোভ-অসন্তোষ, অসংগতি, শ্লেষ ও ধিক্কারের চিহ্ন। প্রতিবাদী মানসিকতার প্রতিফলনও বহূ প্রবাদ প্রবচনে দেখা যায়। প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচনগুলির সহায়তায় এর যথার্থতা প্রমান করা যেতে পারে –
"কলির কথা কইগো দিদি, কলির কথা কই
গিন্নির পাতে টক আমানি, বউয়ের পাতে দই"
অথবা
"বৌএর বেলায় ঢাকাই শাড়ি

মায়ের বেলায় গলায় দড়ি।"

লক্ষ্যণীয় সদ্যযৌবনার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের কথা প্রবাদটিতে বলা হয়েছে। নিষ্কর্মা স্বামীর প্রতি যেমন অবজ্ঞা আছে তেমনি স্বামীর অপদার্থতার বিরুদ্ধেও প্রতিধ্বনিত হয় এইভাবে –
"কাজের নাম নাই
বউ কিলানের যম"
 
অর্থাৎ বাড়িতে কিছুই নাই, মুখে বড় বড় কথা। দায়িত্বজ্ঞানহীন স্বামীর বর্বরতা প্রবাদটিতে ধিকৃত। 

পণপ্রথার বিরুদ্ধেও প্রবাদ-প্রবচন সরব। সাধারণতঃ পাত্রপক্ষই কন্যাপক্ষের কাছ থেকে পণ গ্রহণ করে থাকে। আদায়ের নামে অত্যাচার উৎপীড়নও ঘটে। নিম্নোক্ত প্রবাদটিতে কন্যার পিতার অসহায়তা চিত্রনের সঙ্গে সঙ্গে পাত্রের পিতার অর্থ-লোলুপতাকে ধিক্কার জানানো হয়েছে –

"কনের বাপ ব'সে ব'সে চোখের জলে ভাসে
বরের বাপ ব'সে আছে লক্ষ টাকার আশে।"
 
আজকাল যৌথ পরিবার প্রায় সম্ভব নয় বললেই চলে। আর্থিকদীনতা, ব্যাক্তিস্বাধিনতা যৌথ পরিবারকে ভেঙ্গে দিচ্ছে। প্রতিবাদী প্রবাদে যৌথ পরিবারের এক তিক্ত ছবি ফুটে উঠেছে –
"দেখে শুনে বড় ঘরে বিয়ে দিলে বাপে
এখন মরি জায়ের আর ননদের তাপে।" 
বহূবিবাহ শুধু কৌলিন্য প্রথার ফসল নয়। সফল পুরুষের কাছে ভোগ্যানারী চিরকাল অসহায় আমাদের সমাজে। এই বহূ বিবাহের যন্ত্রনার প্রকাশ পায় নীচের প্রবাদটিতে –
"ছুতোরের তিন মাগ ভানে কাটে খায়
তত আর থাকে নাকো যত তার যায়।"
তাই  সতীনের প্রতি তীব্র বিদ্বেষে বর্ষিত হয় –
 অশথ্ব তলায় বসত করি
সতীন কেটে আলতা পরি।"
স্বার্থপরতা প্রবাদ-প্রবচনে ধিক্কারযোগ্য হয়ে ওঠে –
"কাজের বেলা কাজি
কাজ ফুরালে পাজি।"
কর্মবিমুখ মানুষ কিন্তু ভাগের বেলায়, খাবারের বেলা অত্যন্ত তৎপর। তারাও তিরস্কৃত হয় প্রবাদে -
"কাজের বেলা ভাগে
খাবার বেলা আগে"
অথবা 
"খাইবার সময় বারো ভাই
পোয়া লইবে কেউ নাই।"
দেশের বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিও প্রবাদ-প্রবচনে ধিক্কারযোগ্য হয়ে ওঠে। আদর্শ বিচার ব্যবস্থায় দোষীর শাস্তি হয়। বিনা অপরাধে কারো শাস্তি হলে অথবা একের অপরাধে অন্যকে শাস্তিদানের ব্যবস্থা করলে বিচার ব্যবস্থার অন্তঃসার শূণ্যতাই সমর্থিত হয়। সেক্ষেত্রে –
"কুঁতিয়া মৈল দৈবকী
নাম পাড়ায় যশোদারানী"
অথবা 
"দেবতার বেলা লীলা খেলা
পাপ নেখিচে মানষির মেলা"
কিংবা 
"দই খেলেন রমাকান্ত, বিচারের বেলায় গোবধর্ন।" 
 
প্রবাদগুলি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, প্রতিবাদীও বটে।
 
আজ বিশ্বের বুদ্ধিজীবি, অভিনেতা, খেলোয়াড়, শিল্পী সবাই আহ্বান জানিয়েছেন ড্রাগহীন সুন্দর পৃথিবী গড়ার। ড্রাগ বা নেশায় যে কত মায়ের বুক শূণ্য করেছে, কত বধূর সংসার ছাড়খার করেছে, কত সোনার ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করেছে তার হিসেব নেই। গাঁজা বিষয়ে একটা প্রবাদে একই সঙ্গে গাঁজার প্রতি বক্রোক্তি ও গাঁজা খাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে –   
"গাঁজা খেলে পাঁজা বাড়ে, গর্দানে বাড়ে জোর
বাপ দাদার নাম ডুবিয়ে ডাকে গাঁজাখোর।" 
 
ঔপনিবেশিক সভ্যতায় কিছু মানুষের হাতে কাঁচা পয়সা এল। জুটে গেল ইয়ার বন্ধুরা, সন্ধ্যায় জলসা আর মজলিস ভরে উঠলো নানা রঙে। প্রতিবাদে গঠন হ্ল 'মদ্য নিবারনী সভা'। সৃষ্টি হ্ল "মদ খাওয়া বড় দায়" এর মত প্রহসন। প্রবাদ প্রবচনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর ভাষাও তৈরী হল –
"একদিন মদের জোরে
সাতদিন মাথা ঘোরে।"
ইংরেজ সভ্যতা অন্য সব কিছুর সাথে লাল জল নিয়ে এল। শ্লেষাত্মক প্রবাদের সংখ্যাও বাড়ল –
"ধন্যরে বোতলবাসী ধন্য লাল জল
ধন্য ধন্য বিলাতের সভ্যতা সকল।" 
 
নেশা একবার ধরলে ছাড়া বড়ই কঠিন। সমাজে নেশাখোরের স্থান কোনকালেই নেই। সেই আত্মধিক্কারের একটি ছবি প্রবাদে –
"মদ খাওয়ার বড় দায়
জাত রাখার কী উপায়।"
লোকজীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে চলছে সংগ্রাম। জীবন ও জীবিকার জন্য প্রতিটি বিরুদ্ধ পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম  করে এগিয়ে চলতে হয়। আদিমকালে এই লড়াই ছিল আরও তীব্র ও প্রবল। প্রতিবাদের, অন্তরের হাহাকার জ্ঞাপনের পদ্ধতিও ছিল ভিন্ন। লোকগানে, ছড়ায়, লোককবিতায় এর নিদর্শন বিলক্ষন পাওয়া যায়।
 
মহিষ চারকদের নদী, মাঠ, কাশবন কিংবা গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে মহিষের পিঠে পিঠে দিন কাটে। উদাস, নিঃসঙ্গ জীবনে এই 'মইয়াল' বা দোতারায় সুর তোলে
 "কি ও বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে
কোন দিন আসিবেন বন্ধু কয়া যাও রে।" 
 
কোন যুবক সবলা গ্রাম্য যুবতিকে ভুল বুঝিয়ে বিয়ে করেছে। কিন্তু স্বামীর ঘরে এসে তার যে অভিজ্ঞতা তা নিতান্তই বেদনাময়, জ্বালাময়। দুঃখে, ক্ষোভে নববধূ গাইছে –
"নাকড়াংবার ব্যাটাটা
চাউকড়াংবার নাতিটা
মোক ভুলালু সতের খুড়ু দিয়া ...।"
 
এও তো সমাজের প্রতি, ব্যক্তির প্রতি প্রতিবাদের পদ্ধতিরই নামান্তর। আবার প্রত্যন্ত গ্রামে, গঞ্জে, হাটে-বাজারে কান পাতলেই শোনা যায় 'হেটো কবিদের' করুণ গাথা। সমাজ জীবনের কত হানাহানি, নিষিদ্ধ প্রেমের কত গুঞ্জন, পণপ্রথার বিরুদ্ধে, সামাজিক বৈষম্যর বিরুদ্ধে কত দীপ্ত জেহাদ, কত হতাশার কথা এঁদের কবিতায় চিত্রিত। গ্রাম্যজীবনের তুচ্ছ বিষয়গুলোর সঙ্গে গভীর সমস্যামূলক ও বৃহত্তর সমাজজীবনের কত না সমস্যা ও অসঙ্গতি এঁদের উপজীব্য। পল্লীজীবনের ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, অভাব কবির মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। চড়া সুরে গেয়ে ওঠেন –
"ভারত সরকার চমৎকার দোষ নাহি তার
অনাহারে গরীবেরা অস্থি-চমর্সার
দেশে দেশে খাদ্যাভাব কেন দেখা দিল
কেরোসিনের দাম কেন এত বাড়িল ...।"
পণপ্রথার নিগড়ে বাঁধা সমাজ আজও মেয়ের বাপ-মার চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। সেদিকেও কবির সজাগ দৃষ্টি –
"কত মেয়ে নিয়ে দায় ঠেকি আছে ঘরে ঘরে
লাখ টাকা পণ না দিলে ছেলে নাই সংসারে
তারপর সাইকেল ঘড়ি আংটি চুড়ি মেয়ের গলার হার
বাসনপত্র এক পরস্থ আরও ট্রেঞ্জিষ্টার।" 
 
'হেটো কবিরা' কবিতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন কখনো সাম্রাজ্যবাদী, ধনতান্ত্রিক কায়েমী স্বার্থের পোষকদের বিরুদ্ধে আবার কখনোও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে। মানুষের জন্যই তাঁদের দুঃখ-বেদনার, বিদ্রূপের, বিদ্রোহের, প্রতিবাদের গান বাঁধেন –
"মোদের দুঃখের কথা কাহারে জানাই
বছর ভরা খাট্যা মরলাম পেটের ক্ষুধায় ভাই
শুনরে ও ভাই কৃষক যত হিন্দু-মুসলমান
অন্নদাতা হইয়া আমরা কি পাই প্রতিদান।"
ঘুষখোর, মুনাফালোভী যারা অর্থকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বলে গন্য করেন, তাদের প্রতি দশভূজা দুর্গাকে সামনে রেখে আর একটী 'হেটো' ছড়া"
শোষন যারা করিছে নিত্য গরীবের রক্ত
তারাই হল স্বাধীন ভারতের প্রধান রাজরক্ত
তাদের ইঙ্গিতে চলে শাসন ভারতবর্ষের পরে
তার পরিমান ওঠে হাহাকার গরীবের ঘরে ঘরে
এস মা জননী দুর্গতিনাশিনী পুত্র কন্যা নিয়ে সঙ্গে
দেখে যাও চোখে আগুন লেগেছে তোমার সোনার অঙ্গে
ধ্বংসের বাজনা বাজিয়া উঠেছে মাথায় পড়িছে বাজ
পেটের জ্বালায় তোমার সন্তান হাহাকার করে আজ।"
এই প্রতিবাদধর্মীতা সমাজের সুস্থতা ও সজীবতাকেই প্রমান করে। যেমন 'ঝুমুর'। আদিরসমুখ্য প্রেমের গান, দেহ-সম্পৃক্ত ঝুমুর গানের নায়িকা উক্তিতে, আচরণে, বিশ্বাসে, সংস্কারে গ্রাম-বাংলার প্রকৃত রমণী। সেখানেও প্রতিবাদের সুর শুনতে পাওয়া যায়। একটি গানে দেখতে পাই এক অপরিপূর্ণ নারীরূপটি, প্রণয়-এর বিচিত্র কলাকৌশল যার অনায়ত্ত, প্রণয়-সম্ভোগে অনিচ্ছুক। সেই অনিচ্ছারই প্রবল প্রকাশ –
"ফুলেতে বসো না ভ্রমর ফুলের মধু দিব না
ষোল বছর বয়স নাগর এ কলঙ্ক নিব না
ফুলের কুঁড়ি আমি বঁধু যৌবনে হাত দিও না
তোমার চুম্বন বঁধু আমি সহিতে পারিব না
আধ ফুটা কলি কেন করো কামনা
বড়ো হলে সময় হলে পুরাব তোমার বাসনা।"
নায়কের আচরণের বিরুদ্ধে এই গানে নায়িকার প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। সঙ্গে অবশ্য ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিও।
 
ভাওয়াইয়া গানেও অনুরূপ প্রতিবাদের সুর কানে বাজে। স্বামী তার পরনারীতে আসক্ত। আশাহত নারী মনোবেদনা জানান দেয় এইভাবে –
"মন সজনী কার কাছে কব দুঃখের কথা
কিসের মোর রান্ধন, কিসের মোর বাড়ন
কিসের মোর হলদিয়া বাঁটা
আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায়
মোর এ আঙ্গিনা দিয়া ঘাটা।" 
 
নায়ক-নায়িকার প্রেমের প্রথম দিনগুলিতে নায়ক প্রদত্ত আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে। হয়েছে স্বপ্নভঙ্গ। বেদনায় ব্যথিত নায়িকা। নীচে বর্ণিত 'ঝুমুর' গানের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে সমগ্র পুরুষ কূলের প্রতি তার বিরূপতা –
"প্রথম পিরিতি কালে আকাশের চাঁদ হাতে দিলে
পিরিতি শিখায়ে এখন কাঁদালে বড় প্রাণে দাগা দিলে
উঠায়ে তরুর ডালে ছেদন করিলে মূলে
বল বঁধু আগে কী বলেছিলে।
পুরুষ ভমরা জাতি   বড়রে কুটিলা মতি
অগম দড়িয়ায় বধুঁ ভাসালে।"
সোমত্ত মেয়ে চালচলনে চপলতার ছাপ। ব্যবহার ও আচরণ মোটেই ভাল নয় বলে কেউই বিয়ে করতে চায় না। এই দেখেই শ্লেষাত্মক সুরে গীত হয় ভাওয়াইয়া গান -
"মাই গে মাই, তোর চলন দেখিয়া
ভাব দেখিয়া কাহই না করে বিয়া
মাই গে মাই তোর যেমন দেহা কালো
ওই রকম কৃষ্ণ কালো দুইদিন যাইয়া
বৃন্দাবনে যাইয়া
তোর মাই জোড়া ভুরু, ঐ মাই মোর কমর সরু
মুখের আগত দি গেল ফান্দাবার না পারলো
 মাই গে মাই তোর চলন ...।" 
(মাই – মেয়ে, কমর – কোমর)
সামন্ত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও জোরদার প্রতিবাদের ভাষা দেখা যায় ভাওইয়ার গানে। জমিদার  বা তার পোষা লোক চাষীদের সেচের জল দেয় না। নানা টালবাহানা দেখায় কখনও দাদন, কখনোওবা সুদের বকেয়া মেটানোর ছলে, তখন প্রতিবাদী রাগী কৃষক এ অন্যায় সহ্য করতে না পেরে অন্যায়ের প্রতিকার চায় –
"ধর্‌ ধর্‌ দিস না ছাইড়া
নিয়া চল সঙ্গে কইর‌্যা ঐ বুড়াটা বড়ই পাজি
ধান বুনিলে দেয় না পানি ঐ বুড়াটা বড়ই কানি
ধর্‌ ধর্‌ দিস না ছাইড়া ...।"
আবার কোনো কোনো সময় নগ্ন বাস্তবকেও উন্মোচিত করে এই ভাওয়াইয়া গান বঞ্চনার প্রতিবাদে – 
"ও মোর গাঁওয়ালিয়া রে
চতুর্দিকে জ্বলে সুরুজবাতি
তোমরা ক্যানে বল আন্ধার রাতি রে।"
কালোবাজারী, মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধেও 'চটকা' গান ব্যবহৃত হয়েছে বহূবার। এমনকি রাজনৈতিক ভাগাভাগির ফলে বেরুবাড়ি অঞ্চল ভাগ করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে 'চটকায়' ধ্বনিত হয়েছে এক প্রতিবাদী সুর। বাস্তব অবস্থাকে জনগনের কাছে তুলে ধরার জন্য সোচ্চার হয়েছিলেন উত্তরবঙ্গের লোককবি নিবারন চক্রবর্তী – 
"আসরেতে খাড়া হয়্যা বন্দিস এ লোক কাক
দ্যাশের হালত দেখ্যা হইচুঁড়ে অবাক
মরি হাসরে কলিকাল
বেরুবাড়ি দিবার নাগি ন্যাগাচে ক্যাচাল।"
একইভাবে চটকায় ধ্বনিত হয়েছে জমিদারী প্রথা বিলোপ সাধনে জনমত যাচাইয়ের প্রশ্নে –
"চল্‌ চল্‌ চল্‌ চলরে কিষান ভাই
জমিদারী উটিবার তনে ভোট দিবার যাই।"
ধনীদের বাড়ি তৈরীর সময়, ছাদ পেটাবার সময় কর্মী বা মিস্ত্রিরা এক ধরন-এর গান গায়, তাকে সাধারনতঃ 'ছাদ পেটানোর গান' বলে, যা গ্রাম্য কমর্সংগীতেরই এক ধারা। শ্রম লাঘবের জন্য গীত হলেও, কর্মীদের পারিশ্রমিক বা চাহিদা পূরণ না হলে, রাগে, অভিমানে মালিকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এই গানেরই মাধ্যমে –
"দালান দিলি মহল দিলি বাড়ির নীচে পুস্করিণী
একখানা পানসি দিতে পারনি,
বাঁধাজল কাঁচাপানি শুন হে মিস্ত্রী
একটু লবন দিতে পারনি
চাল পেলাম ডাল পেলাম, না পেলাম জ্বালানী
তরকারী সবই পেলাম পাইনি সুক্তানী
ভাত হলো ডাল হলো খেলাম না আমানি
দিঘীর ধারে বাগান হল, না হলো মালিনী
বড় বড় বাবু আছে দুনিয়া ভিতর
এমন মালিক চক্ষেতে দেখিনি।"
এমনই হাজারো প্রতিবাদের প্রতিরোধের ভাষা যেমন তৈরী হয়েছে বিভিন্ন লোকগানে, তেমনি বিভিন্ন সময়ে লোককাব্যের মাধ্যমেও তা বিধৃত হয়েছে। নেপালি কবি ভানুভক্ত কারাবাসকালে প্রশাসনিক উদাসীনতা ও কয়েদিদের দুদর্শার কথা শ্লেষের সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন –
"নিত্যদিনই দেখছি প্রভু দুঃখ নেইকো মোটে
বিনি পয়সায় এমন নাচন কারই বা ভাগ্যে জোটে
মসক, মাছি আর ছারপোকা, এরাই আমার জিগরী দোস্ত
মসক মশাই গলা সাধেন, ডাঁশবাবাজি নাচেন চোস্ত।"
নেপালি ব্রাহ্মনরা সাধারণতঃ ভূমিচাষ করে না। কিন্তু অর্থনীতির বুনিয়াদই হল এই ভূমি। সম্পদ, শক্তি, সম্মান এই ভূমির ওপর নির্ভরশীল, পুরোহিত সম্প্রদায় ধীরে ধীরে নানা কৌশলে এই ভূমি দখল করে ভূস্বামী এবং ধনী কৃষক সম্প্রদায়ে পরিণত হতে লাগল। সেই সময় বন্যাউরের ভজনে জ্ঞানদিন লিখলেন –

"কলির বামুন দেন সত্যে জলাঞ্জলি

বেদ পাঠ ছেড়ে তাঁরা লাঙল নেন তুলি
নিজের কাজ রইল পড়ে লয়ে লাঙল গরু
ভাবেন তারা আছেন আজও সকল লোকের গুরু।
উপরোক্ত গানে তীব্র বিদ্বেষের সুরই ভেসে বেড়ায় ইথারে।
 
লোকনাট্য লোকজীবনের কাহিনীর ওপরই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভরশীল, সামাজিক প্রয়োজনেই লোকনাট্যের উদ্ভব। লোকশিক্ষার এক বড় মাধ্যম হল এই লোকনাট্য। লোকসংস্কৃতির অন্যান্য দিকগুলির মতো লোকনাট্যের ওপরেও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। নাট্যরস পরিবেশন ও দর্শক মনোরঞ্জন তার মূল উদ্দেশ্য হলেও সামাজিক ন্যায়-নীতির আদর্শটিও লোকনাট্যে রক্ষিত হয়। অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার-উৎপীড়ন, শোষন ও অসাম্যের বিরুদ্ধে লোকনাট্য প্রতিবাদীর ভূমিকা নেয়। সমাজকে সচেতন করতে কৌতুক ও ব্যঙ্গ লোকনাট্যে প্রতিবাদের প্রধান আশ্রয়। কৌতুকের অবলম্বন অসংগতি, সমাজের নানাবিধ অসংগতি ঘিরে কৌতুকের বিস্তার ঘটে। আর ব্যঙ্গের মধ্যে রয়েছে আঘাত-আক্রমণ।
 
ধর্ম নিয়ে বিভেদ-বিদ্বেষ হানাহানি-সংঘাত এসবের বিরুদ্ধে লোকনাট্য। লোকসমাজ সাধারণতঃ ধর্মসহিষ্ণু। ধর্মকে স্বাথর্সিদ্ধির হাতিয়ার করেছে কিছু সংখ্যক ধান্দাবাজ রাজনৈতিক নেতা এবং কপট ধর্মগুরু। তারাই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির প্রশয়দাতা। সুদীর্ঘ সংগ্রামের পর ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু জনগণের স্বপ্ন সফল হয়নি। শোষন-পীড়ন, অত্যাচার-অবিচার অব্যাহত, শান্তি বিপন্ন, দেশ জুড়ে নানা বিশৃঙ্খলা, বিদ্বেষ আর হানাহানি। গণতন্ত্রের মর্যাদা ধূলায় লুন্ঠিত, জনগণের প্রত্যাশা অপূর্ণ। স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রে তাই তাদের আস্থা নেই। পরিবর্তে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও জ্বালা। গম্ভীরা গানে তার প্রতিবাদের স্বরূপ লক্ষ্য করা যায় – 
"ছিনু পরাধীন, সুখে গেছে দিন
এখন স্বাধীনতার ফল বিষময়।
গণতন্ত্রের আসল রূপটা, বেশ উঠেছে ফুটে
মারামারি কাটাকাটি নারীর ধর্ম লুটে
ঘুষ, ঘেরাও, গুন্ডাবাজী, হরতাল, ইলেকট্রিক, পুলিশ লাঠি
গ্যাস গুলি আর বোমা, এসব রাম রাজত্বে গয়না
দেশে ধ্বংসলীলা চলছে খোলা পথে লাগছে ভয়।"
গম্ভীরা সংলাপ ঠিক চাবুকের মতো শোষিতের পিঠে পড়ে। সে কেবল ভাবায় না ভাবতে সাহায্য করে 'ভোলা নানা' অর্থাৎ শিবকে উপলক্ষ করে প্রতিবাদ করেছে ও প্রতিকারের জন্য করেছে আবেদন –
"ভোলা হে ভোলা, একি কোর‌্যাছ মোদের দশা
ভাঙ ধুতরা খ্যায়া শুধু বোম হয়্যা আছ বস্যা,
প্যাটেতে আজ ভাত নাই, পরণেতে ত্যানা
হাল বলদে সব বেচ্যা দিতে হ'ল খাজনা।
এখন কি করি হে ভোলা নানা,
তার উপরে রোগের জ্বালা, হারিয়্যা ফেল্যাছি দিস্যা।"
 
একটি 'আলকাপ' পালায় প্রায় একই ধরনের আক্ষেপ চিত্রিত হয় –
"বাংলা মা, তুই কাঁদবি কতকাল
তোর সোনার অঙ্গ করলো এরা
রক্তধারায় লালে লাল
মনে করি, হলাম স্বাধীন
আমরা মাগো চির পরাধীন
হয়ে এখন বিশের অধীন
অন্ন বিনে নাজেহাল।"
অধিকাংশ নেতারা লোভী, স্বার্থপর, কপট ও মিথ্যাবাদী। তাদের আচরণ লজ্জাজনক ও ক্ষতিকর। গদিবিলাসী নেতাদের প্রতি জনগণের মনে রয়েছে অপরিসীম ঘৃণা। 'গম্ভীরায়' এই সকল নেতাদের প্রতি জনগণের ধিক্কারই প্রকাশিত হয়েছে –
"ব্যস্ত সবাই গদির লাগি, কাজের বেলায় মান্দা
গরু মেরে জুতো করে দান, গদিওয়ালারা এমনই শয়তান 
ওরা মুখে যেটা বলে, কাজে উল্টা ঠিক তার চলে
তাই আজ হিংসার আগুন, জ্বলছে দ্বিগুন ছড়িয়ে দেশময়।"
 
যৌতুকপ্রথা আমাদের সমাজে এক অভিশাপ। প্রথাটির বিরুদ্ধে লোকসমাজে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রতিবাদে মূর্ত হয়ে উঠেছে। 'বোলান গানের রঙপাঁচালিতে' কন্যার অসহায় পিতার আক্ষেপোক্তিতে তারই পরিচয় – 
পাত্রপক্ষের দাবি পূরণের সামর্থ্য নেই কন্যার পিতার। ব্যঙ্গমিশ্রিত প্রতিবাদ তাই এখানে তার কন্ঠে -
 
আমি এত গয়না কোথায় পাব?
মাটির নয় যে গড়িয়ে দেব।"
সমাজে ধনী-দরিদ্রের বিরোধ-বৈষম্য প্রতিবাদের একটি উৎস। জলপাইগুড়ি জেলার 'ধামগান'–এর 'ভেস্তেশ্বরী' পালায় জনগণ ধনী জমিদার জোতদারদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষনা করেছে। সরকারি নিয়মে নির্দিষ্ট পরিমান জমির অতিরিক্ত জমি কারোর থাকলে সরকার তা 'খাস' করে নেন। জমির মালিক হন সরকার। একে বলে 'ভেস্ট' করা। কিন্তু জমিদার-জোতদারের দল সরকারি আইনকে ফাঁকি দিয়ে অতিরিক্ত জমি বেনামী করে রাখে। গর্ভস্থ শিশু এমন কি গৃহপালিত জন্তুর নামেও মালিকানা দেখানো হয়। ভূমিহীন মানুষেরা এতে ক্ষুব্ধ হয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তারা সেই চোরাই জমি উদ্ধার করতে চায়। একদিকে জমিদার-জোতদারের দল, অন্যদিকে ভূমিহীন মানুষেরা। একদল অধিকার বজায় রাখতে চায় নানা কৌশলে, অন্যদল বাধা দেয়। পারস্পরিক সংঘাতে লোকনাট্যের আসরটি দ্বন্দময় হয়ে ওঠে। পঞ্চাশের দশকে যখন আইন করে জমিদারী প্রথার বিলোপ ঘটানো হয় সেই সময়ে 'ভেস্তেশ্বরী' পালাটি এই পটভূমিকায় রচিত হয়। অন্যদিকে "তাই লড়াই চলবে" পালায় আবার এই প্রতিবাদ লড়াইয়ে পর্যবসিত হয় – 
"এ  ... লড়াই চলবে 
লড়াই চলছে আবার চলবে
রে-ভাই গরীব-ধনীতে লড়াই চিরস্থায়ী।"
প্রতিবাদ শেষপর্যন্ত এ পালায় শ্রেনী সংগ্রামের রূপ নেয়, প্রতিবাদ এখানে ধনীর বিরুদ্ধে দরিদ্রের।
লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন দিক যেমন প্রবাদ-প্রবচন, ছড়া, লোক কবিতা, লোকগান বা লোকনাট্য প্রভৃতি সকলের মনোরঞ্জনের দায়িত্ব পালন করেছে তেমনি তার ভূমিকা কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। তা কখনো কখনো প্রতিবাদের, প্রতিরোধের বা সংগ্রামের মুখ্য হাতিয়ারও হয়ে উঠেছে। জনগণের দুঃখ-সুখ, আশা-আকাঙ্খা, ক্ষোভে ও ঘৃণাকে প্রকাশ করেছে কখনো কৌতুকের মাধ্যমে, কখনো বিদ্রূপে, কখনো ধিক্কারে, কখনো বা ব্যঙ্গের মাধ্যমে অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার-উৎপীড়ন, অসংগতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এই প্রতিবাদ প্রবণতা লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন ধারার উপভোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে। তাতে শ্রোতা বা দশর্ককূল শুধু তৃপ্তই হয়নি, উদ্দীপ্তও হয়েছে। শুধু তাই নয়, লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলিকে যদি বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকে সঠিক মূল্যায়ন করা যায়, তবে জাত-পাতের লড়াই, ভাষার হানাহানি বা অন্যান্য অনেক সামাজিক জটিলতা অনেকাংশেই দূর করা সম্ভব। সামাজিক জীবনে লোকসংস্কৃতি তখন ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠি নির্মোক না হয়ে সামাজিক কাজের ছন্দে সমাজ ও শিল্পীর মধ্যে এক অনাস্বাদিত হৃদয় সংবেদনা গড়ে তুলবে। সেদিন হয়তো গ্রামীন সংস্কৃতি আর নগর সংস্কৃতির মধ্যে কোনো ভেদরেখা থাকবে না।
 
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ
আশুতোষ ভট্টাচার্য, শিবপদ ভৌমিক, দিগ্বজয় দে সরকার, দুলাল চৌধুরী, মানস মজুমদার, বরুনকুমার চক্রবর্তী, বীরেশ্বর বন্দোপাধ্যায়, রোহিনীনাথ মঙ্গল, বিমল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত পাল, বেনু দত্ত রায়, যোগেশ রঞ্জন পাঠক, কুমার প্রধান, পরেশ বর্মন, সুশীল কুমার ভট্টাচার্য ও সুরথ সিংহ। 

 


 

 

 

 

অন্যান্যদের নিবন্ধ

অশেষ দাস

গৌতম রায়

দীপায়ন ভট্টাচার্য