![]() |
||
|---|---|---|
| প্রথম পাতা | নিবন্ধ | |
|
|
অশেষ কুমার দাস ভাঙনের দেশে মিলনের মেলা
আজকের মালদহ জেলার পঞ্চানন্দপুরকে সাধারণ মানুষ ভাঙনের দেশ বলেই জানে। এখানে ভরা বর্ষায় মানুষের সংলাপ পরিণত হয় হাহাকারে। আবার বর্ষা বিদায়ের পরপরই মানুষ মেতে ওঠে প্রেমের উৎসব রাসোৎসবে। শুধুমাত্র পঞ্চানন্দপুরে কতটা স্থলভূমি মা গঙ্গা গ্রাস করেছেন তার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে সমগ্র মালদহ জেলাতে গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া ভূমির পরিমান আঠারো হাজার হেক্টর এবং মোট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে স্থানীয় মানুষেরা বলতে পারেন কোথায় ছিল তাদের বাস্তভিটা বা আবাদের জমি। এখন এসবই যেন স্বপ্ন বলে মনে হয়। এমনতরো গ্রামেই গত পঁয়ষট্টি বছর ধরে জমে উঠছে রাসমেলা। সত্যিই স্বার্থক কবির সেই উক্তি, "এত ভঙ্গ বঙ্গ দেশ তবু রঙ্গে ভরা।" পঞ্চানন্দপুরের রাসমেলা যেন ভাঙনের দেশে মিলনের মেলা। যেখানে প্রকৃতি ভাঙে এবং মানুষ গড়ে। এই ভাঙা-গড়ার মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে ভারত আত্মা। প্রেমই যার মূল কথা। পঞ্চানন্দপুরের মানুষ যেন জেনে গেছে ঈশ্বর বা আল্লা হল উপলক্ষ মাত্র। তবে তাদেরকে সামনে রেখে উৎসবের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা যায় মানুষে মানুষে হৃদয়ের সেতু বন্ধন। কোন সরকারী বা অসরকারী প্রতিষ্ঠান নয়, মাটির মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগে ভাঙন দুর্গত পঞ্চানন্দপুরে হেমন্তের শিশিরকে সাক্ষী রেখে শুরু হয় রাসমেলা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষা নির্বিশেষে মানুষ এ মেলায় অংশ নেয়। মানুষই বাজায় এ মেলার মোহন বাঁশি। যা শুনে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যান গ্রামবাসী। স্বয়ং কৃষ্ণ ঠাকুরও বোধহয় সেই সুর শুনে ঈর্ষান্বিত হন। প্রাচীন গৌড়ভূমিই বর্তমান মালদহ জেলা নামে পরিচিত। খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পতঞ্জলির মহাভাষ্যে, খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয়-চতুর্থ শতকে কৌটিল্যর অর্থশাস্ত্রে, তিনশত খ্রীষ্টাব্দে বাৎসায়নের কাম শাস্ত্রে এবং ছয়শত খ্রীষ্টাব্দে বরাহ মিহিরের বৃহৎ সংহিতায় গৌড়ভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। স্বয়ং চৈতন্যদেব এখানে এসেছিলেন বৃন্দাবন যাবেন বলে। তাঁর আগমনে গৌড়ভূমি ভেসেছিল কৃষ্ণপ্রেমের রস স্রোতে। নবাব হুসেন শাহর দুই কর্মচারী দবীর খাস ও সাকর মল্লিক ভক্তি প্রেমে আপ্লুত হয়ে শ্রীচৈতন্যর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহন করে পরিচিত হন রূপ ও সনাতন নামে। তিনি এসেছিলেন গৌড়ের রামকেলি গ্রামে। তাঁর এই আগমনোপলক্ষ্যে শুরু হয়েছিল রামকেলির মেলা। এছাড়াও অবিভক্ত মালদহ জেলার গর্গরিয়াতে কুরীশমেলা ও কানসাট মেলা, টুর্টা জঙ্গলে তুলসীবিহারী মেলা এবং পান্ডুয়া ও বামনগোলাতে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মেলার কথা লিখেছেন জনৈক ইংরেজ ভাষ্যকার। সে তুলনায় পঞ্চানন্দপুরের রাসমেলা অনেক নবীন। আর একটা কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে কোচবিহার রাসমেলার রাজকীয় ঐশ্বর্যের কাছে পঞ্চানন্দপুর যেন হালে পানি পায়না। হয়ত বা সে কারনেই দেখা যায় যে পঞ্চানন্দপুর রাসমেলা নিয়ে গবেষক, লেখক বা কলমচির দল সেভাবে সক্রিয় হননি। গঙ্গাতীরে অবস্থিত পঞ্চানন্দপুর। মালদহ জেলার কালিয়াচক দুই নম্বর ব্লকের মৌজা নম্বর এগারো। এক সময়, অর্থাৎ স্বাধীনোত্তর কালে এই অঞ্চলটিকে মানুষ জানতো লবন বন্দর রূপে। উত্তরপ্রদেশ থেকে বড় নৌকা করে এখানে লবন আসত। সেই লবন বিপনন হত সমগ্র উত্তরবঙ্গ জুড়ে। ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকেই লবন ব্যবসার গনেশ উলটে যায়। পরন্তু মা গঙ্গা যেন হয়ে ওঠেন মারমুখি। লবন বন্দরে নেমে আসে দুঃস্বপ্নের ছায়া। জীবনকে বাজি রেখে শুরু হয় মানুষের পথ চলা। ভিটেমাটি, আবাদি জমি, ব্যবসা সব গেলেও গৌড় ভূমির ট্রাডিশন্ প্রেম যেন এখানে জাঁকিয়ে বসে থাকে। তারই জীবন্ত প্রয়োগ রাসমেলা। এই মেলা যেন ধ্বংসের মাঝে সৃষ্টির সোপান। ১৯৪২ সালে বিষ্ণুপদ তাঁতি নামে এক গ্রামবাসী এই মেলার প্রথম উদ্যোক্তা। পেশায় তিনি ছিলেন একজন ঝালাইকার। বাস করতেন সাহেবগঞ্জে এবং দামোদরটোলায় ছিল তার কারখানা। সেই কারখানাতে বসেই তিনি প্রথম রাসমেলা সংগঠিত করেন। সেই সময়কার পঞ্চানন্দপুরের গ্রামগুলোর মধ্যে আটটি গ্রাম ছিল হিন্দুপ্রধান। বাদবাকি সব গ্রাম ছিল মুসলিমপ্রধান এবং মিশ্র বসতি। এখানকার মানুষের বিশ্বাস বিষ্ণুবাবু রাসমেলার মধ্য দিয়ে যে প্রেমের উৎসবের সূচনা করেছিলেন, তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ধর্মমত নির্বিশেষে সংহতিবোধকে প্রতিষ্ঠিত করা। মেলার মুখ্য সংগঠক ক্ষীতিশচন্দ্র সরকারের কথায় শুরুতে শুধুমাত্র হিন্দুরা অর্থ দিলেও মাত্র কয়েকবছর পর থেকে মুসলমানরাও সাধ্যমতন দান করেন এই রসের উৎসব রাসোৎসবে। প্রথম মেলা কমিটির সম্পাদক হন স্থানীয় ব্যবসায়ী নবীন মহাজন। নবীনের মৃত্যুর পর তার পুত্র মেলার হাল ধরেন। ১৯৭৬-৭৭ সালে বংশপরম্পরার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষ সোচ্চার হন। যার ফলে মহাজন ঘরানার অবসান ঘটে। নতুন সম্পাদক হন প্রবোধ মন্ডল। রাসোৎসবের শিকড় ততদিনে পঞ্চানন্দপুরে মাটির গভীরে প্রবেশ করেছে। বিংশশতাব্দীর চল্লিশের দশকের শুরুতে মালদহ জেলাতে শুরু হয়েছিল দু'টি আন্দোলন। একটি হল হাটতোলার বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং অপরটি ভারত ছাড়ো আন্দোলন। মহাত্মাগান্ধীর ডাকে ভারতছাড়ো আন্দোলনে সাড়া দিয়ে গ্রেপ্তার হন, হরিশচদ্রপুরের গান্ধীবাদীনেতা সুবোধ কুমার মিশ্র। সাধারন মানুষের বিক্ষোভে সুবোধ কুমারকে ইংরেজ প্রশাসন প্রথমে মুক্তি দিলেও পরে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। আর দ্বিতীয়, হাটতোলা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জনমানসে ভীষন বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কারন জোৎদার বা জমিদারের প্রতিনিধিরা হাট কিংবা মেলাতে বিক্রীত পণ্যের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতো। এই অর্থকে বলা হত তোলা। এমনকি দেশীয় রাজ্য কোচবিহারেও এর ব্যতিক্রম ছিলনা। সুতরাং ধারণা করা যেতে পারে যে বিষ্ণুপদ তাঁতি প্রান্তিয় মানুষ জনকে সাথে নিয়ে পঞ্চানন্দপুর রাস মেলার সূচনা করে মেলা বা হাট তোলার বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তেমনই এই মেলা হয়ে উঠেছিল প্রান্তবাসীদের একান্ত নিজস্ব উৎসব। যা তরান্বিত করেছিল সংহতিবোধকে। তাই এই রাসমেলা যেন নতুন কিছু করার আন্দোলন। ইংরেজদের ও কিছু করার ছিল না। এই মেলায় আজো যে সমস্ত দোকানীরা আসেন, তারা কোন নির্দিষ্ট অর্থ নয়, সাধ্যমতন দান দিয়ে যান। সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে পঞ্চানন্দপুরের রাসমেলা এক সৃষ্টিশীল সামাজিক আন্দোলন। গ্রামবাংলা এর পথ প্রদর্শক। ১৯৪২-২০০৬ সাল পর্যন্ত রাসমেলা নিয়মিত হয়ে আসছে পঞ্চানন্দপুরে। ১৯৯১ সালে ছিল সুবর্ণ জয়ন্তীবর্ষ। ঐ অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তারা কিছুটা সাহস করে কীর্তন গাওয়ার জন্য নিয়ে আসেন কীর্তনীয়া পরভীন সুলতানাকে। এমন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে মৌলবাদীরা যেমন সক্রিয় হয়েছিল, তেমনই প্রস্তুত ছিল সংগঠকরা। হিন্দুমৌলবাদীদের বক্তব্য ছিল হিন্দুর অনুষ্ঠান মঞ্চে কেন মুসলমান গায়িকা। আর মুসলিম মৌলবাদীরা বললো মুসলিম গায়িকা কেন হিন্দু মঞ্চে গান গাইবে। কিন্তু সংগঠকদের দৃঢ়তা এবং সাধারণ মানুষের শিল্পবোধের কাছে মাথা নত হয়ে যায় উভয় ধর্মের মৌলবাদীদের। পরের বছর দাবী ওঠে পারভিন সুলতানাকে আবার চাই। রসের মেলা এবং পরভীন সুলতানা ততদিনে পঞ্চানন্দপুরে সমার্থক শব্দে পরিণত। এরপর সংগঠকরা নিয়ে আসেন ঢাকা বেতার কেন্দ্রের লোকসংগীত শিল্পী হাফিজুর রহমানকে। হিন্দুধর্মীয় নামাঙ্কিত রাসমঞ্চ পরিনত হয় যথার্থ প্রেমের মঞ্চে। রাত জেগে মানুষ উপভোগ করেন ভাওয়াইয়া, ভাটীয়ালি, কীর্তন, বাউল, আধুনিক এমন কি বাংলা ব্যান্ডের গান। বিগ্রহ নয়, বিনোদন এবং বিপননই এই মেলার শেষ কথা। যার মধ্য দিয়ে ঘটে যায় হৃদয়ে হৃদয়ে সেতু বন্ধন। প্রকৃত অর্থেই যেন ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষ। বস্ত্র বিতরণ, পংক্তি ভোজন এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। দরিদ্র মানুষের মধ্যে কম্বল,ধুতি ও শাড়ি বিতরণ হয়। প্রাপকদের তালিকা প্রস্তুত করে গ্রাম পঞ্চায়েত। সাতদিনব্যাপী এই মেলার দু'দিন ধরে চলে পংক্তি ভোজন। সন্ধ্যা সাতটা থেকে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত ভোজনোৎসব চলতে থাকে। বিনোদনের বাহারী আয়োজনকে বাদ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবকের দল হাতা ও বালতি হাতে হয়ে যায় রোবটের মতন। এছাড়া কালিয়াচক ব্লকের মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করা প্রথম দশ জনকে পুরস্কার দেওয়া হয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হল মেলায় অংশগ্রহনকারী সর্ব্বোচ্চ বয়ঃজৈষ্ঠ তিনজন শ্রোতাকে দেওয়া হয় সংবর্ধনা। এই ধরনের অভিনব আয়োজনে মেলার আকর্ষণ বছরের পর বছর বাড়তে থাকে। এই প্রেম বুকে নিয়েই পঞ্চানন্দপুর এগিয়ে চলে এক সংহতি এক সামঞ্জস্যর দিকে। এখানে আছে তাপসিক মন্দির। বিগ্রহের আসনে সেই চিরায়িত ভঙ্গিমায় রাধাকৃষ্ণ। আর আছে কেলি কদম্ব। এ যেন শুধুমাত্র থাকতে হয় তাই। পঞ্চানন্দপুরে অভিশপ্ত গঙ্গার জলে তাপসিক মন্দির ধূয়ে সূচনা হয় রাস উৎসবের, এর পর পূজা ও প্রসাদ বিতরণ। শেষদিন অনুষ্ঠিত হয় কুঞ্জভঙ্গ ও ধূলোট। গ্রামের মানুষের দল উৎসাহের সাথে সব কিছুতে অংশ নিলেও বিনোদনই যেন তাদের কাছে প্রাধান্য পায়। ধূলোটের ধূলায় গড়াগড়ি যায় ক্ষেতমজুর, সাধারন চাষি, ভিটেহারানো গ্রামবাসী। এই তো কবিগুরুর ভারততীর্থ – যেখানে গত পয়ষট্টি বছর ধরে একদেহে লীন হয়ে যায় মানুষ। কোন হাতি ঘোড়ার শোভাযাত্রা নয়, রাজকীয় স্বর্ণমুদ্রার ঝন্ঝনানি নয়, মাটির মানুষ মহীরূহের মতন মাটি থেকে মাথা তুলে উৎসবকে রূপ দেয় মহোৎসবের। ধনীর ঔদ্ধত্য কিংবা দীনের দৈন্যতা নয়, প্রেমই এখানে যেন একচেটিয়া প্রতিপক্ষ। মানুষ বাজিয়ে চলে মোহনবাঁশি। তার সুরে পাগল হয়ে মানুষও ধেয়ে আসে মেলা মঞ্চের দিকে। রাত জেগে উপভোগ করে অনুষ্ঠান, শিশিরে স্নান করে তারা বাড়ি ফিরে যায়। বাংলার মেলাতে যা কিছু বিপণন হয়, পঞ্চানন্দপুরও তার ব্যতিক্রম নয়। পাপড়ভাজা, জিলিপি, তেলেভাজা, বাসনপত্র, পুতুলনাচ, সার্কাস, লটারী সবই আছে এই মেলাতে। কিন্তু সবথেকে বেশি আছে প্রেম। সাতদিনের মেলা শেষে পঞ্চানন্দপুর পুনরায় প্রবেশ করে তার সনাতন জীবনে। প্রেমলীলা শেষে আবার সংসারের জীবন, গঙ্গাভাঙন সহ আরো কত কী। কিন্তু সবার মনে একটাই কথা - আগামীবছর থাকবেতো দামোদরটোলার মেলা ময়দায়। কিংবা রাসোৎসব কমিটি দ্বারা পরিচালিত জ্ঞানভারতী বিদ্যালয়। মা গঙ্গা যেন এখানে বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ করছেন। আসলে এ সবই হল অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ও নিশ্চিত প্রশ্ন। মেলার পরদিন থেকেই দুরুদুরু বক্ষে ক্ষীতিশচন্দ্র সরকার সহ অন্যান্য সংগঠকরা আর একটা নতুন রাসমেলার প্রস্তুতি শুরু করে দেন। জলের বুনো আক্রমনে পঞ্চানন্দপুরে প্রতিটি বুকই কাঁপতে থাকে। মোহনবাঁশির সুরে সেই কাঁপন প্রেমের মাতনে পরিনত হয়। শুরু হয় ভাঙনের দেশে মিলনের মেলা - পঞ্চানন্দপুর রাসমেলা। কৃতজ্ঞতাঃ ১। পশ্চিমবঙ্গ মেলা ও মহোৎসব – সুধীর চক্রবর্তী প্রবন্ধ সমূহঃ মেলা সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্যঃ
|
অন্যান্যদের নিবন্ধ
|
|
||