![]() |
||
|---|---|---|
| প্রথম পাতা | গল্প | |
|
|
সুমেরু মুখোপাধ্যায়
বন্দুকের নলই ক্ষমতার প্রকৃত উৎস |
অন্যান্যদের গল্প
|
যা হয়, এইসব খবর "গুজবে কান দিবেন না" তেই থেমে যায়, যেন আওয়াজ দুলতে দুলতে চলে যাচ্ছে দূরে, দোলে দোদুল দুলো না, একটিপ নস্যি হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো - ব্যাস শেষ ৷ কিন্তু আজকাল ভাঁওতা ভন্ডামি ভেলকিরও রমরমা বাজার আছে ৷ এ কাগজ ষ্টোরি না করল তো বয়ে গেল, সেই পিছিয়ে পড়ল। পড়তে হয় না হলে পিছিয়ে পড়তে হয় ৷ হাইটেক যুগেও আছে পিছিয়ে পড়া, ওডেশা ষ্টেপস, রকমারি টার্গেট, প্যারাম্বুলেটারে নেচে নেচে নামা কচি খুকিটির মত; হু হু করে পড়ে যাচ্ছে টি আর পি রেটিং, দোপাটির ঝুরো পাপড়ি আর দোপাটির কান্ডসম ঐশ্বর্য রাইয়ের গা থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে ছাপানো ফুলসাজ পোষাক ৷ কাজেই কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা না দেখা পর্যন্ত নিশ্চিন্তি নেই ৷ আর লোক অবিরত ঢুকে চলেছে গড্ডালিকা প্রবাহে, পাতাল রেল, অফিস টাইম, স্মার্ট কার্ড, পিলপিল ৷ যত নামবে লোকের মাথা, দূর থেকে আলো ডানদিক বা বাঁদিকে হুট করে খুলে যাওয়া দরজা, সীতাহরণ এখন পাতালরেলে ৷ হ্যাঁ, লিফটটায় টেলিফোন নম্বরও দেওয়া আছে ৷ সুমন ঠিক করল অফিসে পৌঁছে একবার ফোন করে দেখবে ৷ যদি ধরে ৷ এইসব কল করার পরে অফিসের লগবুকে অন্যের নাম লিখে দিতে হয় স্মার্টলি, আদারওয়াইজ এনকোয়ারি, লেঙ্গি আর পুলশট ৷ সুমন ততটাই স্মার্ট আর ঢ্যামনা ৷ আবার ততটাও স্মার্ট নয়, টাই আছে, প্রেম নেই, রাম ক্যালাস, গ্র্যাভিটি নেই, না হলে মেট্রোয় ঢোকার মুখে একজন লোক একটা পাতি কাগজ গুঁজে দিল তার হাতে? বেশিরভাগ সময়েই দেয় না মানে টাই ফাই দেখে আর দিতে সাহস পায় না ৷ ঐসব ধর্মপ্রচার, লোকনাথ টোকনাথ, একশ আটটা ছেপে বিলি কর, লোকনাথেরা এত টাই এরও বন্ধু ফাই-এরও বন্ধু নয়, এড়িয়ে যায় বোধ হয় ৷ এসব চোথা ফোতা সুমন নেয়, আবার নেয় ও না ৷ হাত বাড়ালেই বন্ধু কেস নয়, চোথা মানেই চোরা নজরে খুচরো সময় দাও, পড়ো, এখানে অত পার্সেন্ট সেল ৷ অথবা গুপ্তরোগ, যৌনরোগ, ঋতুবন্ধে ডাক্তার কাশেম ৷ হাঁটাপথে ষ্টেশন থেকে পাঁচ মিনিট ৷ নিলেও দুমড়ে ফেলে দেয় সিঁড়ি ভাঙার আগেই ৷ লিফলেটটা বেশ সুদৃশ্য, এতটাই যে প্রত্যাখ্যান করাই শক্ত, স্মার্ট প্রোডাকশন ৷ তেমন মেঘ দেখলেই চোখ আটকে যায় আর এতো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গুঢ় কামনা বাসনার খবর, লালসা, বিলাস, বাসনা ৷ ডানপাশ বরাবর একটা বন্দুকের ছবি ৷ বন্দুকের ছবি মানেই বন্দুক নয়, ভারতবর্ষের মানচিত্র বিক্রি করে দেওয়া মানেই ভারত বিক্রি নয়; তবু বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে ওঠে, সিগারেটের শেষদিক আঙুলে লাগলে যা হয় ৷ চকচকে ঝকঝকে ছাপা ৷ সুমনের মতই স্মার্ট প্রেজেন্টেশন ৷ এক লহমায় দেখতে দেখতে ট্রেনটা বেরিয়ে গেল হুশ করে, নটা বাইশ ৷ ট্রেন বেরিয়ে গেলে ষ্টেশন যেমন ন্যাড়া ন্যাড়া, আরও ন্যাড়া লাগে ষ্টেশনের বড় বড় বিজ্ঞাপনগুলো খুলে নেওয়ায়, যেন শালা ম্যানহোলের ঢাকনা, বাপের সম্পত্তি ৷ এই ফাঁকা জায়গাগুলোয় বিজ্ঞাপন দিলেও কিছুটা ভরে ৷ ভোটের আগে গেঞ্জি ছাতা দিলি এখানেও কিছু দিতে পারতিস, পাতালে তো আর নির্বাচন কমিশন নেই ৷ আজকে অবশ্য এসব ভাবনা আসছে না, বন্দুকের চকচকে গায়ে পুরনো ভাবনারা পিছলে যাওয়ার জন্যে যথেষ্ট ৷ প্ল্যাটফর্মে খুব অস্থির লাগতে লাগল সুমনের, ব্লোয়ার কাজ করছে না ঠিকমত, হাওয়া ঠাউর করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সে ৷ ঘড়ি অবশ্য দশটা ছুঁতে অনেক দেরি তবু অস্থির, ঘাম আর চটুল রবীন্দ্রসংগীতের মত চঞ্চলতা, আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরেরর পিয়াসী ৷ আবার পকেট থেকে লিফলেটটা বার করে সুমন আরেকবার পড়ে ৷ পড়ার আগে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, হাওয়া নেই কোথাও ৷ ভাঁজও পুরোটা খোলে না ৷ অল্প দরজার মত ফাঁক করে সে, যেন গাড়ির দরজা; পড়ে ফেলে আবার পুরো বয়ানটা ৷ এ টু জেড ৷ এদের কথা যদি সত্যি হয় তবে মালটা গ্রেট, কিন্তু সম্ভব! বলে কি! গুলির বদলে যশ, খ্যাতি, শ্রদ্ধা, ভালবাসা ছিটকে ছিটকে বেরোচ্ছে বন্দুক থেকে ৷ লিফলেটে করে এত লোককে বিলাচ্ছে, ভুল হলে তো ক্যাল খাবে ৷ নিশ্চয়ই কাজ হচ্ছে ৷ এই যে রোজ লিফলেট বিলায়, বলে টুয়েন্টি পার্সেন্ট অফ থার্টি পার্সেন্ট অফ, আগে থেকে বাড়িয়ে রাখো, দিতে তো নিশ্চয়ই হয় আদারওয়াইজ কত লোকের বাপ আর খগেন হবে ৷ কিছু তো হবেই ৷ আলাদা আলাদা বন্দুক থেকে আলাদা আলাদা জিনিস ৷ সত্বর যোগাযোগ ৷ ষ্টক সীমিত ৷ সত্বর বলতে কত তাড়াতাড়ি? অফিসে পৌঁছে ফোন করলে কি দেরী হয়ে যাবে? আরেকটু থামের আড়ালে গিয়ে মোবাইল থেকেই ফোনটা করে সুমন, আজকাল পাতাল রেল স্টেশনেও নেটওয়ার্ক আসছে, সব টেকনোলজী। এই তো ভালবাসার বন্দুকও বেরিয়ে গেল, জিও সায়েন্স ৷ পুরো হিন্দি ফিল্মের কায়দায় এমন ভাবে ফিসফিস করে সুমন, আমরা তো কোন ছার সুমনের সবচেয়ে কাছের লোকটা কিছু শুনেছে কি না কে জানে ৷ বাকিটা ঢেকে দেয় ইনকোডা টিভি ৷ আর ঝনঝন ঝনঝন ঝনঝন ঝনঝন এসে পড়া টালিগঞ্জগামী মেট্রোরেল ৷ সুমন বন্দুক কিনে আর অফিস যায় না বাড়িতে চলে আসে, ঢের আগে তার ভালবাসা ৷ মা অনেক প্রশ্ন করেছে তাকে কাটিয়ে দরজা দিতে দিতে সুমনের হার্টবিট সরকারী বাস হয়ে যায়, ঝরঝর করছে, মনে হয় খুলে পড়ে যাবে সব ৷ দরজা বন্ধ করে প্রয়োগবিধি পুস্তিকাটা বারবার ওল্টায়, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, চায়নীজ, ইংরেজী, বাংলা কি ভাষায় নেই, তবে কি ইন্টারন্যাশনাল প্রোডাক্ট ! ভরসাটা আরো একটু বেড়ে যায় ৷ সঙ্গে ডেমো সিডি আছে কিন্তু মালটা আগে পরখ করা দরকার। পুকুরে নামলে বোঝা যাবে কত জল, কত দূর দৌড়ায় বুধিয়া ৷ টেষ্ট না করলে বোঝাও যাচ্ছে না, কেবল বেড়ে যাওয়া টেনশন, হার্টবিট ৷ বাড়িতে বাবা মায়ের উপর পরখ করা সম্ভব নয় আর বোনের উপর এই ভালবাসার বন্দুক চালালে শেষে কি কান্ড ঘটবে জানা নেই ৷ না জেনে এই সব উত্পটাং জিনিস ব্যবহার না করাই ভালো ৷ আর শর্বরীরও এখন কলেজে, বাড়ি ফিরতে ফিরতে নির্ঘাত পাঁচটা ছটা ৷ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় পরিচিত মুখগুলি, মহুয়া, রাণি, সুস্মিতা কিম্বা নতুন কেউ, কালকে যে মেয়েটা গেল হাতে হাত রেখে ! দি আইডিয়া ৷ আবার দু-একটা স্টেশন যাওয়া যেতে পারে পাতাল রেলে, নলবনে চলে যেতে পারে, সিটি সেন্টার ৷ যাওয়া যেতে পারে ছুটকির কলেজে ৷ চলে যাওয়াই যেতে পারে গার্লস কলেজ ৷ একটা ঠিকঠাক দেখে মেয়েকে চালিয়ে দিলেই হল, এটা তো ফাইনাল কিছু না জাস্ট টেস্ট ৷ আরো পাঁচটা গুলি হাতে থাকবে তার ৷ যতক্ষণ না টেষ্ট করতে পারছে, ওফ; মালটা যাহোক কিছুটা বুঝতে হবে ৷ কিছু একটা বুঝতে পারলেই হল, আন্দাজ হবে, কোথায় কতদূর যেতে পারে তার ভালবাসা; বৃষ্টি নামার মন্ত্র পড়লাম, টিপটিপ হোক আর মুষলধারেই হোক, বৃষ্টি যদি না নামে তো মন্ত্র ঢপের ৷ মাল ওয়াপিস, পয়সা রিটার্ন, লেখাই ছিল তো হ্যান্ডবিলে ৷ সুমন যোগাড় করে ছাড়বে । নিয়ম প্রণালীটা বার করে আবার ছুকছুক করে পড়ে ফেলে সুমন ৷ এই তো পরিস্কার লেখা আছে ৷ অরিজিনাল না হলেও চলবে ৷ অরিজিনাল হাতের মুঠোয় পেয়ে গেলে আর বন্দুকের কি আসর ৷ টিভিতে দেখলে ঐশ্বর্য রাইকে, ইচ্ছে হল ভালবাসতে চালিয়ে দাও গুলি ৷ তবেই না বন্দুকের আসল খেল৷ । ছবি, ছবি, ছবি দরকার একখানা, সলিড কিছু ৷ কোথায়? কোথায় পেতে পারে সে, কোথায় লুকিয়ে আছে ৷ তাদের বাংলা কাগজে কি আছে কে জানে! বড় জোর রূপা গাঙ্গুলী বা ইন্দ্রাণী হালদার ৷ বাপটাকে কতদিন ধরে বলেছে টি ও আই নাও, টি ও আই নাও ৷ পেজ থ্রী বলে একটা জিনিস বলে তো আজ অবধি এরা হজম করতে পারলো না, ওল্ড সিটিজেনস ৷ বোনের ঘরে গেলে তাও দু'এক পিস সানন্দা, আনন্দলোক, মল্লিকা শেরাওয়াত, এষা দেওল জুটে যেতে পারে ৷ কিন্তু সেসব পরের ব্যপার ৷ আপাতত ক্যালেন্ডারে উড়ছে, পপত করে, মায়াবন বিহারিনী হরিণী, সোনার দোকানের ক্যালেন্ডারিণী ৷ আগে ভাল করে মেয়েটাকে মাপাই হয়নি ৷ আজকে সুমনের দেখে খারাপ লাগল না, দুলছে, পতপত পতপত ৷ চল একটা টেরাই তো নেওয়া যাক ৷ বন্দুকটা পেটের ভিতরে চেপে ছিল ৷ বার করতেই আবার হার্টবিট দুশো-আড়ইশো, লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে সব কিছু, ইয়ে দিল, দিওয়ানা ৷ শালা এক একটা গুলির দামই নিয়েছে পাঁচশো টাকা ৷ একটা মাল ভরে ফেললো সুমন, খাপে খাপ পঞ্চার বাপ, পুরো মাখন ৷ এখন একদম কুল, হার্টবিট বাড়তে দেওয়া চলবে না, স্লো স্টার্ট উইন দ্য রেস ৷ ভালবাসার জন্যে একদম প্রিপেয়ার্ড, ওন ইয়োর মার্ক, রেডি, ষ্টেডি ৷ গুলি করবার জন্যে বন্দুক তুলল সুমন, ডিসট্যান্স জাষ্ট দু ফিট ৷ মিস বলে কিছু নেই ৷ লাগাতেই হবে ৷ এইটুকু পারবে না সুমন? কোম্পানীর চাপ খেয়ে কত লম্বা লম্বা টার্গেট করে আসছে সে মাসে পর মাস ৷ হার্টবিট বাড়ছে, ঠকাস ঠকাস, মহিন্দর সিং ধোনি ৷ শালা হাত-ফাত কাঁপছে, এ তো ভূমিকম্পের মতো! এই হুস হুস; শালা টিকটিকি আসারও আর সময় পায় না ৷ সুমনের হাসি পেয়ে যায় ৷ যদি গুলিটা টিকটিকির গায়ে গিয়ে লাগত, তাইলে কি সে টিকটিকির সঙ্গে ভালবাসা করতো? বন্দুক কোম্পানীর চোথা মতো একটা গুলি মানে পাঁচমিনিটের ভালবাসা, সিওর শট, চাঁদে মঙ্গলে পাতালে, যেখানেই যাও, নো হরফের ৷ হি হি ৷ তারমানে পরবর্তী ষ্টেশন রবীন্দ্রসদনের মত, শুনতে পাচ্ছি হুস করে বেরিয়ে গেল মেয়েটি ময়দানে, দরজা বন্ধ সুমন দেখতে পাচ্ছে তার চলে যাওয়া শুনতে পাচ্ছে মধুর কন্ঠস্বর, পরবর্তী স্টেশন রবীন্দ্রসদন, দরজা বাঁদিকে, অপেক্ষায় থেকে গেল প্রেম ৷ এখন পরবর্তী পাঁচ মিনিট টিকটিকিটার সঙ্গে? গুচ্ছ হতাশায় রবীন্দ্রসদন থেকে ফিরতি ট্রেন ধরে এসে সুমন দেখল, সে নেই, অথচ জাস্ট পাঁচ মিনিট ৷ মিস ফিস করা যাবে না ৷ দরকার হলে ঠেকিয়ে গুলি চালাও ৷ দি আইডিয়া ৷ বাসে ট্রামের ভিড়ের মধ্যে ঠেকিয়ে গুলি চালিয়ে দিলেই তো হয় ৷ পছন্দ হল, গুলি করলাম, একটু ভালবেসে নিলাম! এত সস্তা হয়ে যাবে ভালবাসা, যাদের এন্তার পয়সা তারা ভালবাসার গুলি ফোটাতে ফোটাতে চলে যাবে উত্তর থেকে দক্ষিণ ৷ সে বড় সুখের সময় নয়, গ্রেট কেলো ৷ ভালবাসা-বাসিটা কি বাস-ট্রামের মধ্যেই হবে নাকি? ওটা ইম্পসিবল ৷ তা হলে ঐ বাসন্তীদেবী কলেজের আইডিয়াটাও বাদ দিতে হয় ৷ ছুটকির ওখানে গিয়ে কিস্যু করা যাবে না, ভালবাসা একটা বেশ গোপন ব্যাপার, ভালবাসতে না পারলেও এটুকু বোঝে সুমন ৷ তা'লে দেখা যাচ্ছে মালটা ক্লোজডোর ৷ ক্লোজডোর ছাড়া সম্ভব না, দামি সোনা সীতা ছাড়া কেউ রাস্তা ঘাটে ছড়িয়ে রাখে না, নয় সিন্দুক, নয় লকার ৷ এটা তো লেখেনি বুকলেটে ৷ আবার ভালো করে বুকলেটটা দেখতে বসল সুমন ৷ মোবাইলটা বন্ধ করেনি কেন? ইয়ে দিল দিওয়ানা, বেজে উঠল দুম করে ৷ এই যদি গুলিটা ছিটকে বেরিয়ে যেত? পাঁচশো টাকা ছেটানোর মত দিন এখনও আসেনি, সবে দশমাসের চাকরি ৷ এক্সাইটমেন্ট চেপে রেখে প্রশান্তকে হাই বলা, কিন্তু হার্টবিট সে চাপবে কি করে? সেটা তো ক্রমশ বাড়ছে, ধাপ ধাপ ধাপ, উঠেই চলেছে, যেন রাবনের সিঁড়ি ৷ প্রশান্ত কোনদিনও বেশি ভ্যানতারা করে না ৷ ষ্ট্রেট প্রশ্নে চলে গেল, বন্দুকটা কেমন? কাজের? ইল্লি রে! বন্দুক? হ্যাঁ, আমি একটা কিনবো ভাবছি ৷ ওরাই বললো আই মিন তোর কথা ৷ ওরা বলে দিল? ফালতু মাল। ধরিয়ে দেব, তোদের সব কটাকে, এটুকু সিক্রেসি তোরা দিবি না ৷ ঢপের ৷ কোন কাজ দিচ্ছে না ৷ আমি এক্ষুণি যাচ্ছি, ফেরত দিয়ে পয়সা নিয়ে আসব ৷ এসব বলতে অবশ্য বুক ফেটে যাচ্ছে সুমনের, সত্যি যদি মালটা ঢপের হয় ৷ কোন কাজ না করে ৷ এতগুলো টাকা ৷ হোক না ক্রেডিট কার্ড ৷ তবু কচকচ করে সব কেটে নেবে ৷ ফোন রেখে সুইচ অফ করে দিল সুমন ৷ ওসব ফালতু লাফড়ায় গিয়ে কোন লাভ নেই ৷ লোকের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে সে কি টাকা খসিয়েছে? আপাতত নো বকবক ৷ স্রেফ ভালবাসা, ভালবাসার কাঙাল হয়েই তো এতগুলো বছর ভালবাসার চেষ্টা করে গেছে, একের পর এক, আজ অফিসে না গিয়ে বন্দুক কিনে এনেছে ৷ ভালবাসার বন্দুকটা নিয়ে ক্যালেন্ডারটার একদম গায়ে গিয়ে ঠেকায় ৷ বড় করে একটা ঢোক গেলে, নো টেনশন, হাওয়া, বুড়বুড়ি সব মিলিয়ে গেল পুকুরে ৷ মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখ ঘোলা ৷ বন্দুকের থেকে আবার আওয়াজ হবে না তো? বাবা-মা দুজনেই তো পাশের ঘরে, দোতলায় বাড়িওয়ালা! আঁট-ঘাট বেঁধে নামা ভাল,আবার ফিরে যায় সুমন বুকলেটটার কাছে ৷ ওদিকে বন্দুকের স্পর্শ পেতেই মেয়েটা একটু নড়ে চড়ে উঠেছে, আরো বেশী বেশী করে দুলছে হাওয়ায়, রোজ কি দোলে? অপেক্ষা করে তার জন্যে? দূর থেকে দেখা ফাঁকা কমনরুমে একা একা বসে আছে শর্মিলি ৷ অলঙ্কার সুন্দরী দুলছে, হাত দুটো কাঁধের উপর ভাঁজ করে আড়মোড়া ভাঙছে ৷ সুমন বুঝতে পারে তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। আজ রাত্রের মধ্যেই সুমনকে পালাতে হবে ৷ বন্দুকটা ফেলে দেওয়া যেত কিন্তু ওতে নিশ্চয়ই লেগে আছে সুমনের দগদগে হাতের ছাপ ৷ কুত্তায় শুঁকলে ঠিক চিনে নেবে ৷ তারপর যাবজ্জীবন নয় ফাঁসি ৷ কি কুক্ষণেই যে সুমনের মাথায় ভালবাসা-বাসির আইডিয়াটা এসেছিলো ৷ এখন নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে তো ভালোবাসার পরিণাম ৷ কচুবনের মধ্যে ঢুকে বসে আছে পাক্কা দেড়ঘন্টা ৷ যা মশা কামড়েছে ভালোবেসে, যেন ওদেরকেই গুলি করেছে সুমন, অকাতরে ৷ কচুপাতা ছোট কচুপাতা বড়, লম্বা লম্বা ডাঁটার পরে কচুপাতাগুলো যেন ছোটবেলার বেনারসকে ফিরিয়ে দেয় ৷ চারপাশে ছাতার মত দৃশ্যসজ্জা, হরেক পাঁকগন্ধ, তলপেটে পিস্তলের ঠান্ডা শিরশিরানি ৷ ক্লাস সিক্সের বেনারস, বছর কুড়ি আগের বেনারস, বয়স বাড়ার সাথে সাথে চারদিকে এখন বিরক্তিকর কচুপাতা, চলকে ওঠা ৷ কচুপাতায় জল যেন, কচুর জঙ্গলে আটকে পড়ে থাকা সুমনের এক স্মৃতি চলকিয়ে অন্য স্মৃতিতে, ঝুটা মুক্তো গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে ৷ সেই বাবা নিয়ে গেল হাত ধরে দ্বিজেনবাবুর আঁকার স্কুলে ৷ চৌকো লাইন, গোল্লার পর এসে গেল কচুপাতা আর সঙ্গীতার সাথে সুযোগমত কাটাকুটি খেলা ৷ হ্যাঁ কচু পাতাটা মনে আছে সঙ্গীতার মুখ ফেড; কপি করো, হোমওয়ার্ক আরও কুড়িটি ৷ আপেল, পাখি পাকা পেঁপে খায় এই সব ছুৎমার্গ কপি করতে করতে যেমন বয়েস বাড়ে, কচুপাতায় চারদিক ছেয়ে যায় সুমনের মাসান্তেও আপেল, পাখি, পেঁপে আর কচুপাতা ৷ কচুবনে বসে আছে পাক্কা তিনঘন্টা , তলপেটে টের পাওয়া ঠান্ডা পিস্তল নিয়ে ৷ পুলিশ এলো; এতক্ষণে হয়ত আবার এসেছে, সুমনের কাছে যে আছে সেই আজব পিস্তল; এতক্ষণে হয়ত রাষ্ট্র হয়ে গেছে সারা বিশ্বে ৷ খবর এখন খুব দ্রুত ছোটে, ধকধক করে বেড়ে ওঠা কচুগাছের মত, কয়দিন আগেও তো ডোবাটা ছিল খটখটে শুকনো ৷ প্রথম ঘন্টায় তাও আলো ছিল, ক্রমশ অন্ধকারে সব একাকী হয়ে পড়ে ৷ মাঝে মাঝে চোখ রাখা নিজের বাড়িতে, ঠক করে জ্বলে উঠল আলো, ছুটকি ফিরলো বোধহয়; বা আবার পুলিশ, তার মানে বিশ্বাস করেনি সুমনের মায়ের কথা, পাকা ইনফরমেশন আছে তাদের কাছে; হয়ত তল্লাশি চলছে, জোর ৷ ইস, কেন যে ফেলে এলো বুকলেটটা খাটের উপর, ক্যালাস, সুমনটা পুরো ক্যালাস; ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল মহুয়ার সাথে, সমস্ত চিঠি ফেরত দিয়ে এল সুমন, আর নিজের গুলো? ফেলে এল ওদের বাড়িতে ৷ বাবাকে কি ওরা নিয়ে যাবে থানায়? খুব বিশ্রী ব্যপার হবে সেটা, সারা পাড়া জেনে গেছে এমনিতেই; অথচ কচুবন ছেড়ে ওঠার উপায় নেই সুমনের, ক্রমশ সে নেমে যাচ্ছে একটু একটু করে পাঁকের ভিতর ৷ তলপেটে ধাতব অনুভুতি, মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে সারা শরীর ৷ মানুষ কেন ভালবাসা চায়? এ কথাটা আরও একবার ভাবার চেষ্টা করতে থাকে সুমন ৷ মাঝে মাঝেই ভাবে সে; বাথরুমের আয়নায়, সেলুনে ঘাড় গুঁজে আর মেট্রোরেলের অপেক্ষায় ৷ দূর থেকে রেল আসে, তার আওয়াজে, হাওয়ার পরিবর্তনে টের পাওয়া ৷ জেরক্স মেশিনের মত ভাঙা ভাঙা আলোয় এগিয়ে আসে পাতালরেল, ভাবনা এক একটি দিন ৷ আসলে সবই বোধ হয় এক একটি ভালোবাসা ৷ সুমন কি ছুটকিকে ভালোবাসে না,তার ছোটবোন শর্বরী, যতই ঝামেলা করুক রোজ? তার মাকে? তাহলে আলাদা কি খুঁজছিল সুমন? শরীর? অথচ দেবশ্রী তো কত সহজে অন্ধকার করে দেয় ঘর ৷ কাকু-কাকিমা বাড়িতে নেই মানেই টেলিফোনে ফিসফিস, একই ভাবে একই রকম, একঘেয়ে ৷ ভালবাসার কাতরতা নেই, যন্ত্রের মত চলে যাওয়া। জেরক্স মেশিন, ক্রমাগত বেরিয়ে আসছে কপি, নেতাজী ভবন, যতিনদাস পার্ক, কালীঘাট ৷ সেদিনগুলোতে ভালো লাগা নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু পর পর যে সব একঘেয়ে, কমা দাড়ি সেমিকোলন, অন্য কোন টার্ম নেই তোর? ফিসফিস ফিসফিস, টেলিফোন, কাকু-কাকিমা, বাড়ি খালি ৷ ভালবাসা খুঁজে পাওয়া হল না, পর্দাটানা তিনতলার ঘরে যতিচিহ্নের অন্ধকারে ভালবাসা টের পেল না সুমন, বা সমার্থক অন্য কোন পিস ৷ পালাল, আসলে একসময় পালাতেই হয় ৷ আজকেও পুলিশ আসার পরে, মায়ের বলা মিথ্যে কথাগুলো সব তো সে শুনেছে ঘরে বসে ৷ মা'ই বললো, পালা সুমন, পালা ৷ আরও একবার মায়ের ভালবাসাটা টের পায় সুমন ৷ অথচ সে অন্য ভালবাসা? কিন্তু অন্য রকম ভালবাসা, এ দিল দিওয়ানা; অন্য অন্য অন্যরকম ভালবাসা? স্কুল কলেজ টিউশান অফিস রাস্তাঘাট, দোকান বাজার, মেট্রোরেল কোন জায়গাটায় সে ভালবাসা খোঁজার চেষ্টা করেনি, সেই অন্য ভালবাসা? এমনকি সিনেমাহলে টিভিতে দেখা সাবানের বিজ্ঞাপনে, বোনের সোনালি-পম্পা-এক্সচেঞ্জের গুচ্ছের গসিপ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদপটে মাঝে মাঝেই আটকে, কেঁপে গেছে তার বুক ৷ আসলে দিন যত বাড়ে সবকিছুই গুলিয়ে যেতে থাকে মানুষের ৷ কত কিছু ভুলে যায় মানুষ ৷ মহুয়া, শর্মিলি, ফাঁকা ক্লাসঘরে চুমু ৷ পি কে দত্তর ইনঅর্গ্যানিক বই ভরে লিখে দেওয়া গোলাপী কালির কথা, মনের কথা, গোপন কথাটি রবে না গোপনে ৷ আচ্ছা এগুলো কি তার মনে পড়েছে এই পাঁচ ছ বছরে ? অবশ্য এগুলোর ভেতর ভালোবাসা ছিল কি না জানে না সুমন ৷ আসলে তার মত একজন অসার্থকের জীবনে কনফিউশন ছাড়া অন্য কোন কচুরিপানা ভেসে নেই এখন, কিছুতেই ডোবে না সে ৷ তার মত বোকা-গাধা মালকে টুপি পরাতে কোন মেয়েরই বেশিদিন লাগে না ৷ দিন গড়ায়, স্কুল কলেজ দোকান বাজার অফিস কোন জায়গাতেই থেমে থাকা নেই ৷ টাই আর বুটের ফিতে বেঁধে সুমন এখন ব্যর্থ প্রেমিক-এক্সিকিউটিভ ৷ কিছু যদি এক্সিকিউটই না করতে পারে জীবনে, তবে তো হতাশা আসাই স্বাভাবিক, নুয়ে পড়া সূর্যমূখী ফুল, দিনের শেষে ফাঁস আলগা টাই ৷ অথচ ভালবাসার ক্ষমতাও এসে গেল সুমনের হাতে, বন্দুকের চকচকে নল থেকে চার ইঞ্চি দূরে সোনার দোকানের ক্যালেন্ডারখানা তখন দাপাদাপি থামিয়ে দিয়েছে, একটু আগেও পাখার বাতাসে ফসফস করে ক্রমাগত ডানা ঝাপটাচ্ছিল, কেবল একটা গুলির অপেক্ষা ৷ আঙুলে চাপ দিলেই ভালোবাসার এসে জড়িয়ে ধরার কথা, সুমনকে ৷ পালাবার সময় বলে আলাদা করে কিছু নেই ৷ যেমন মন বলেও আলাদা কিছু নেই, শরীরের ভিতর ঘাপটি মেরে বসে আছে সে, ও মন জানো না তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা, চারপাশে সব কচুবন ৷ হাওয়া দিলে দুলে ওঠে, কেমন একটা ভয়; এই ধরা পড়ে গেল বুঝি ৷ পেট থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া ঠান্ডা ক্রমশ নিস্তেজ করে দেয় সুমনকে ৷ না তাকে পালাতে হবে ৷ ধরা পড়লে চলবে না ৷ সেই যে গেছিল পিস্তল কিনতে এটা যখন পুলিশ জেনে ফেলেছে, তখন তাকে খুঁজে বার করতে পুলিশের বেশি সময় লাগবে না ৷ পালাতে হবে, খুব শিগগির পালাতে হবে ৷ মন ফিসফিস করে ওঠে ৷ কিসের জন্যে সে পালাবে তার বাবা মা বোনকে ছেড়ে? তাহলে কি সে এদের কাওকে ভালবাসে না, শুধু নিজেকেই ভালবাসে? সব সম্পর্ককে অস্বীকার করা যায়? উপড়িয়ে নিতে পারে নিজেকে সব কিছু থেকে? ঘচাঘচ দুটো ছোট কচুগাছ ওপড়ায় সুমন, কত সহজ, কত নরম শিকড় এদের, ইশ ৷ ইনিয়ে বিনিয়ে মহুয়ার সঙ্গে সাড়ে তিনবছর শিকড় ছড়িয়ে টিকে ছিল তো প্রেমটা, না কি ওর মধ্যে কোন প্রেম ছিল না? বাসষ্টপে অপেক্ষার বুক টনটন আর যে সেই দেখা না পেয়ে সাতদিনের জ্বর! এগুলো কি কেবল নখরা, তারই তো হয়েছে? কে জানে! প্রেম মালটা কেমন ঘোরালো, মডার্ণ আর্টের মত মনে হয়, চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের জীবনে আর কোন নারী নেই ৷ এখন আর সুমন কিচ্ছু জানে না, কিচ্ছু বোঝে না, সব গুলিয়ে গেছে ৷ তার কাছে টিভির পর্দা, বিজ্ঞাপণ, পাতালরেলে তার হাতের উপর হাত চেপে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা সকালের লিফলেট, ঘরে ফেলে আসা বুকলেট আর ধাতব অস্থিরতায় তলপেট; অনেক বেশি ক্লিয়ার সুমনের, এবং এটাও ক্লিয়ার তার ভালবাসার ক্ষমতা লুকিয়ে আছে ঐ ধাতব যন্ত্রটার মধ্যেই, ওটা সে কিছুতেই হারাতে পারবে না ৷ হ্যাঁ আর যা যা ভালবেসে এসেছে সুমন এতদিন, মনে হয়েছে এটা না হলেই নয়? এগুলো তো প্রেম হতে পারে, সুমন ঐশ্বর্য রাইকে ভালবাসে, ফিল্টার উইলস ভালবাসে, ন'টা চৌত্রিশের ট্রেনটাকে ভালবাসে, কিন্তু এই সব ভালবাসাগুলো কেবল দুজনের ভালবাসা নয়, মাঝে একজন ঢুকবেই; কচুপাতার চারধার দিয়ে আঙুল বোলাতে বোলাতে অনুভব করে তার ত্রিকোন আকার, কোন ভালবাসাই এত মসৃন নয় ৷ ঠিক যখন সে ক্যালেন্ডারে গুলি করতে যাবে, তখনই দরজা ঠকঠক ৷ মা ঠিক বুদ্ধি করে ম্যানেজ করে দিয়েছে ৷ মা'কে সে ভীষন ভীষন ভীষন ভালবাসে ৷ মায়ের হাতের রান্না, বকুনি, জলপট্টি সব ৷ ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক সে এত ভালবাসে অথচ এই চারঘন্টায় কচুবনের মধ্যে বসে একবারও তার মনে পড়েনি, কি অদ্ভুত! আসলে ভালবাসার কথা সুমনের সবসময় মনে পড়ে না, ডিস্ক্রিট, স্টেপ ফাংশন ৷ পারমিতাদির সঙ্গে শেষদিন কি কথা হয়েছিল এগজ্যাক্ট সেটাও কিছু মনে নেই, আমি আর পারছি না, চাই না, ব্যস, হবে কিছু একটা ৷ সুমনের মনে হয় ভালবাসা কেবল হারিয়ে হারিয়ে যাওয়ার জিনিস ৷ টেলিফোনের কথা, ময়দানে নেমে যাওয়া মেয়েটা, মহুয়ার চিঠিগুলো ৷ কি ভালই না লিখত মেয়েটা ৷ চিঠি লম্বা হতে হতে সব গল্প হয়ে যেত ৷ সকালে চিঠি, বিকেলে চিঠি, অথচ সুমন দু লাইন, তিন লাইন ৷ তার মানে মহুয়া ভালবাসলেও সুমন ভালবেসে উঠতে পারেনি, গোনাগুন্তির মধ্যে আটকে ছিল সে ৷ ভালবাসার মধ্যে ভাসিয়ে দেওয়ার একটা ব্যাপার থাকবে ৷ ঝাঁকে ঝাঁকে চিঠি, ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মাছ, ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি; চরম একটা ব্যপার ৷ অথচ দ্যাখো যন্ত্র কিভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে, বন্দুকের এই যে ছোট্ট নলটা বারবার দুয়ো দুয়ো করে খোঁচা দিচ্ছে তার পুরুষাঙ্গে, তার কত ক্ষমতা, হ্যাবক ব্যাপার ৷ একটা মাত্র গুলি তাতেই নাকি ভালবেসে ফেলবে সুমন ৷ একঝাঁক কথা মনে পড়ে যায় । চারঘন্টা কুড়ি মিনিট বসে সে কচুবনের মধ্যে, ঘড়িটাও আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ৷ ঝাঁকে ঝাঁকে মশা তার মাথার উপর উড়ছে, মাথা সরালে তারাও সরে চলে আসছে অথচ সুমনের কোন ভালবাসা নেই তাদের প্রতি ৷ দূরপাল্লার ট্রেনে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে কোনদিনই উঠেছে কি না সুমনের মনে নেই ৷ বাবার এলটিসিতে এসি থ্রী আর তার অফিস এসি টু করে মুম্বাই হয়ে গোয়া গেল এই সেদিন, প্রতিটা যাত্রাই মনে আছে তার, পারমিতাদির সাথে আলাপ হল হায়দ্রাবাদ বেড়াতে গিয়ে, তার পর আরো কত কথা, কথার ভিড়, তুবড়ি, ফুলঝুরি, রং মশাল ৷ তবু এখন সুমনের ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকা দরকার ৷ এই কম্পার্টমেন্টের নিশ্চয়ই কেউ জানে না তার প্যান্টের ভিতর বন্দুক রাখা আছে ৷ আচ্ছা বোঝা কি যায়? না কি সে হয়ে উঠেছে দুঁদে অপরাধীর মতন আত্মগোপনকারী, তার মত ছেলেরাই তো আজ উগ্রপন্থী, কেউ জনযুদ্ধ করছে, ইচ্ছেমত ফুটিয়ে দিচ্ছে লোকজনদের ৷ আচ্ছা তার যে ভাবনাগুলো সেটা কি তার মুখে ফুটে উঠছে না? যতটা সম্ভব অন্ধকারে টেনে নিয়েছে সে নিজেকে, মুখ তার ঘোরানো রাত্রির ছুটন্ত জানালায় ৷ এমনিতেই আদ্ধেক বাল্ব কাটা, মিনমিনে আলো ৷ গুঁতোগুতির দখলের জায়গায় সকলেই যে যার মত ঢুলছে, ষ্টেশন এলেই হ্যাঁচকা খেয়ে সবাই জেগে ওঠে ৷ তার রোজকার পাতাল জগতের সাথে কত তফাত; কর্মব্যস্ত আর কর্মক্লান্ত ৷ এখানে মনে হয় কেউই সাতে পাঁচে নেই, তার ফেলে আসা কচুবনটির মত, যে যার সে তার মত দাঁড়িয়ে হিসহিস করে দুলছে হাওয়ায়, এতক্ষণে ভুলে গেছে সুমন তাদের সাথেই কাটিয়েছে এর আগের বেশ কিছুটা সময় ৷ ষ্টেশন এলেই ভয় করে, ওঠা নামা, হকার, চেকার, পুলিশ ৷ পুলিশকে কি এর আগে ভয় পেয়েছে সে? ঠাট্টা মস্করাই করেছে সারা জীবন, ট্রাক থেকে ছুড়ে ফেলা পয়সা রাস্তায় বসে কুড়ানো গঙ্গারাম টাইপের পুলিশদের ৷ সে তো বন্দুকটা কিনেছিল ভালবাসার জন্যে, কোন বদমতলবে নয় ৷ ভালবাসা ভীষণ অপরাধ মনে হয় তার; নইলে পুলিশ কেন তার খোঁজে আসবে বাড়িতে, কচুবনে লুকিয়ে থাকা আর রাতের মানুষঠাসা গাড়িতে পালিয়ে যাওয়া ৷ ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছে সে ৷ ভালবাসতে চেয়েছে, পারেনি, সহ্য হয়নি ৷ লুকিয়ে থেকেছে, তারপর পালিয়েছে ৷ একের পর এক ষ্টেশন, গাড়ি আবার চলতে শুরু করলে আবার স্বস্তির নি:শ্বাস ৷ মহুয়া, দেবশ্রী, পারমিতাদি, শর্মিলি, ময়দান ছাড়িয়ে রবীন্দ্রসদনে পালিয়ে গেছে সুমন ৷ গত বারো ঘন্টা যাবত ভালবাসার বন্দুক তার করায়ত্ত তবু ভালবেসে উঠতে পারেনি সুমন ৷ আচ্ছা, তাকে যদি বারোটা দিন, বারোটা মাস বারোটা বছর দেওয়া হয় তাহলেও কি সে পারবে, টিকটিকি আসবে, ফোন বাজবে, দরজা ঠকঠকাবে? লাক্সের বাথটবে ডুবে যেতে যেতে ঐশ্বর্য কতদিন ডাক পাঠিয়েছে তার কাছে, গত চারমাস ধরে তার ঘরে দুলছে অলঙ্কার সুন্দরী, হাতে হাত ছুঁয়ে মেয়েটি নেমে গিয়েছে ময়দান ষ্টেশনে ৷ এই দুনিয়ায় আর কোন জিনিসটা খাঁটি; দুধে জল, ঘিয়ে চর্বি, চালে কাঁকর ৷ সাচ্চা প্রেমটাই বা কেন জরুরী হয়ে উঠল সুমনের কাছে? কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে ৷ মহুয়ার চিঠিগুলো ও নেই, রিটার্ণ, গায়েব, ভ্যানিশ ৷ শর্মিলির মেল আইডি থেকে বাউন্স ব্যাক করে তার ভালবাসা মাখানো চিঠিটা, সবকিছু, শর্মিলি হারিয়ে গেল জীবনের মত ৷ আচ্ছা প্রেমই বললাম তাকে, বা ভেজাল প্রেম, সেসব থেকে কি কোন শিক্ষা পেয়ে ওঠেনি সুমন? কিংবা এটাও হতে পারে তারই ফলশ্রুতি এই বন্দুক ৷ যদিও সুমনের মত আমাদেরও জানা নেই এই বন্দুকটির সঠিক প্রয়োগক্ষমতা ৷ এর মধ্যে আমাদের সামনে সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি, মানে ঐ ভালবাসার ব্যাপার স্যাপার ৷ আমরা কিছুই দেখিনি, শুধু শুনেছি কিছু কিছু কথা ৷ যেমন সুমন ঘরের মধ্যে আটকা থেকেও জেনে ফেলেছে আধবেলার মধ্যে সারা দেশে বিক্রি হয়ে হয়ে গেছে এগারো লাখ বন্দুক, মাকে বলছিল পুলিশ ৷ অস্বাভাবিক কিছু নয় ৷ মানুষের চাহিদা অনেক ৷ এখন ক্রয়ক্ষমতাও অনেক বেশি ৷ সুমন কেবল এটুকুই জানে আজ সে একা নয় ৷ তার মত অতৃপ্ত মানুষের সংখ্যা এগারো লক্ষ কিম্বা আরো বেশী,কত লোকের ক্রয় ক্ষমতাই নেই, ইচ্ছে আছে; সেই জন্যেই এত সব লিফলেট, ইন্স্টলমেন্ট উইথ জিরো ইন্টারেস্ট, ক্রেডিট কার্ড, পার্সোনাল লোন ৷ অবশ্য এর মধ্যে সবাই যে ভালবাসার কাঙাল তা নয় ৷ কেউ চেয়েছে যশ, কেউ খ্যাতি, কেউ শ্রদ্ধা ৷ বন্ধ ঘরের মধ্যে বসে আলো নিভিয়ে উত্কন্ঠায় সে আরও শুনেছে, এসবের বেশিরভাগই ভেজাল ৷ বেশিরভাগ কেন, কার্যকরী হয়েছে এরকম কথা তো সে শোনেনি বরং উল্টোটাই বলে গেছে পুলিশে ৷ এইরকমই কোন এক বন্দুকের গুলিতে মারা গিয়েছেন প্রমোদ মহাজন ৷ তার নিজের ভাই শ্রদ্ধা জানাতে এসে গুলি করেছে তাকে ৷ ভেজাল ছিল বন্দুকে, জাল বন্দুকের গুলি ৷ শ্রদ্ধার বদলে ঘনিয়ে এলো মৃত্যু ৷ পুলিশ এখন তন্ন তন্ন করে খুঁজছে, পেতে চাইছে সবকটি বন্দুকের হদি | ||