সাধারণ বৈচিত্রহীন দৈনন্দিন জীবনের মাঝখানে হঠাৎ যদি বিরাট ভুমিকম্পের মত একটা ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে সেটাকে অসম্ভব এবং একটা অঘটন ছাড়া আর কিছু বলে মনে হয় না। আজ যে গল্পটির কথা বলতে বসেছি, সেই ঘটনাটিও একদিন এইরকম আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতভাবে আমার জীবনে এসে হাজির হয়েছিল। জীবন আর জীবন-কাহিনীতে তফাৎ কোথায়? যারা এই কাহিনীর চরিত্রের মূল নায়ক বা নায়িকা তারা যদি এই গল্পটি লিখত তাহলে সেটা হত জীবন। যেহেতু আমি লিখছি তাই এটা কাহিনী। গল্পটির প্রারম্ভে তাই বলে রাখা ভালো যে এই গল্পটিতে আমার ভুমিকা শুধুই দর্শকের, ঠিক দর্শকেরও নয় শুধুই শ্রোতার, তাই বা বলি কি করে? গল্পটি শুনেছিলাম আমার এক সহযাত্রির কাছে। তবে তাকে কি ঠিক সহযাত্রি বলা যায়? যাই হোক, ঘটনাটি আমার মনের ওপর এমন গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেছে যে শত চেষ্টা করলেও তা আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারব না।
অফিসের কাজে তখন অনেক সময়েই আমাকে এদিক ওদিক যেতে হত। কখনো অনেক দূরে আবার কখনো বাড়ির কাছেই। এক নামকরা ট্র্যাভেল্ কোম্পানির সঙ্গে বন্দোবস্ত করা ছিল আমাদের অফিসের। তারাই আমাদের জন্য আগে থেকে ট্রেনের অথবা প্লেনের টিকিট কেটে রাখত আর একদিনের বেশী হলে কাছাকাছি কোন ভালো হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করে দিত। সব কিছুই ছিল ফার্স্ট্ ক্লাস। ছোটবেলার থেকেই আমার ছিল ঘোরাঘুরির নেশা। তাছাড়া উপরি কিছু পয়সাও আসত। তাই অফিসের অন্য লোকেদের এই ধরনের চাকরি পছন্দ না হলেও আমি খোসমেজাজে এই চাকরি করে যাচ্ছিলাম। তাছাড়া, আমার কোন পিছুটানও ছিল না । তাই এক ঢিলে এরকম দুটো পাখি মারার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম। কোনদিন এই ব্যবস্থা নিয়ে আমার কোনরকম অসুবিধে হয়নি। শুধু ওই যাত্রাটা ছাড়া, আর ওই একটা রাত। একেবারে যাকে বলে নিশুতি রাত। পুরো ঘটনাটা খুলেই বলা যাক।
পূজোর ঠিক দুদিন আগে খবর এল আমাদের অফিসের একজনকে দিল্লী শহরতলীর থেকে একটু দূরে, একটি ছোটো শহরে কয়েকদিনের জন্য একটি বিশেষ কাজে কাউকে পাঠানো হবে। অফিসের সবাই মুখ শুকিয়ে ঘুরছে। পূজোর ছুটিতে অনেক কিছু আগে থেকে প্ল্যান করা থাকে অনেকের। সবাই লুকিয়ে রাখছে নিজেদের, পাছে কোন বড় অফিসারের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। কারোরই যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছে নেই। এই ভাবে পূজোর সময়টা নষ্ট করতে চায় না। আমার ওসবের বালাই ছিল না। আমার বেশ মজাই লাগছিল ওদের দেখে। হালে আর কেউ যখন পানি পাচ্ছিল না, তখন অফিসের বন্ধুরা এসে আমায় ধরল যাতে আমি তাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করি। আমিও এই সুযোগে ওদের সঙ্গে একটা রফা করে নিলাম। কি রফা করেছিলাম সেটা এইক্ষেত্রে অনাবশ্যক বলে তার বিশদ বিবরণ আর দিলাম না।
ভ্রমনের ব্যাপারে আমি একটাই নিয়ম মেনে চলি। অল্প কিছু দরকারি জিনিস ছাড়া আর কিছু নেই না আমার সাথে। জিনিসগুলো সাজানোই থাকে, অপেক্ষায় থাকে কখন তাদের ডাক পড়বে। টুকিটাকি জিনিসগুলো ভরে নিলাম সুটকেস্ আর হোল্ডল এর ভিতরে। সেই সাথে নিলাম আমার অতি প্রিয় মাউথ অরগান্টা। ওটা আমার চিরকালের সঙ্গী। দশ বছরের জন্মদিনে বাবা আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। বাবা গত হয়েছেন অনেক বছর আগে, কিন্তু মাউথ অরগান্টা আজও আমার সঙ্গী। যখনই নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয় ওটা আমার হাতে উঠে আসে। বাড়িয়ে বলবো না তবে যারা শুনেছে তারা বলে আমার হাতে নাকি যাদু আছে।
ট্রেন ছাড়ার একটু আগেই এসে পৌঁছলাম। ফার্স্ট্ ক্লাসে চড়ার এই একটা সুবিধে, অনেক আগে থেকে আসার দরকার নেই। জায়গা ঠিক থাকবে। কতগুলো অসুবিধেও আছে অবশ্য, অন্ততঃ আমার তাই মনে হয়। এমন অনেক সময় আমার হয়েছে যে দূরপাল্লার রাস্তা একা একাই কাটাতে হয়েছে। এ যে আমার পক্ষে কি বিড়ম্বনা আর কি অস্বস্তিকর তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমি লোকজন ভালোবাসি। লোকজনের সঙ্গে ভিড়ে একটু অসুবিধে হলেও আনন্দ পেয়ে থাকি যখন সেকেন্ড বা থার্ড ক্লাসে ট্রাভেল করি। তাই অফিসের কাজ ছাড়া যখন নিজের পয়সায় কোথাও যাই তখন নীচু ক্লাসেই যাতায়াত করি।
কামরায় ঢুকেই আমার মনটা খিঁচড়ে গেল। চারটে সিট। দিনের বেলায় সবাই নীচের সিটে বসবে, রাত্রে দুজন লোক ওপরে উঠে যাবে। আমার সিট পড়েছে ওপরে। আমি সাধারণ বাঙালিদের থেকে একটু লম্বা। ওপরের সিটে উঠলে ছাদে আমার মাথা ঠেকে যায়। ট্রাভেল এজেন্টকে বলাই আছে আমার সিট যেন ওপরে না দেওয়া হয়। আমি এত নিশ্চিত ছিলাম আর আমার হাতে সময় এত কম ছিল যে আমি আর এই নিয়ে মাথা ঘামাই নি। আরো রাগ হল যখন দেখলাম একজন অবাঙালি ভদ্রলোক নীচের সিটের প্রায় দখল নিয়ে বসে আছেন। ভদ্রলোকের বয়েস চল্লিশের কম হবে বলে মনে হল না, একটু কম মোটা হলে হয়ত আরো একটু কম লাগত। পরনে ধুতি পাঞ্জাবি, গলায় সোনার চেন। হাতে দামি ঘড়ি, মাথায় পাগড়ি। আমার ঘড়ির শখ, একনজর দেখেই বুঝলাম ঘড়িটা রোলেক্স। ভদ্রলোক যে পয়সাওয়ালা চেহারা এবং পরিচ্ছদ তার প্রত্যক্ষ প্রমান। বুঝলাম দেশটা আমার নয়, দেশটা এনাদের। বেশী পয়সা দিয়ে হয়ত নীচের সিটের ব্যবস্থা করেছেন। আমি কামরায় ঢুকে আমার সুটকেসটা আর হোল্ডল নিয়ে কি করব ভাবছি, ভদ্রলোক হঠাৎ সিট ছেড়ে উঠে বসে আমাকে বসার জায়গা করে দিলেন। ব্যবহার মার্জিত, মনটা একটু সদয় হল। মালপত্র জায়গায় রেখে ওনার পাশে বসে পড়লাম।
পরিচয় আদান প্রদান করার পরে জানতে পারলাম যে ভদ্রলোকের নাম কান্তিলা প্যাটেল। জায়গা জমি কেনা বেচার ব্যবসা করেন । নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয় এই কারণে। এবারে এসেছিলেন কোলকাতায় ওনার একটা জমি বেচার জন্য। সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়াতে খুশী মনে ফিরছেন। পরের মাসে ওনার একমাত্র মেয়ে দূর্গার বিয়ে। খুব ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দেবেন। আর কেনই বা দেবেন না, ওই মেয়ের জন্যই তো তাঁর সব কিছু। ব্যবসা শুরু করেছিলেন খুব ছোট করে বছর কুড়ি আগে। গোড়ার দিকে ব্যবসা একেবারেই চলছিল না। ভেবেছিলেন ছেড়ে দিয়ে চাকরির চেষ্টা করবেন। কিন্তু অবস্থার আমূল পরিবর্তন হল, যখন ঘর আলো করে একমাত্র মেয়ে দূর্গা এল। ভগবানের কৃপায় ব্যবসা এখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। কোলকাতায় এলে উনি কালিমন্দির, বেলুরমঠ না দেখে কখনো ফেরেন না। বিবেকানন্দ আর রামকৃষ্ণ দেবের অন্ধ ভক্ত। তাঁর মতে বাঙালিরা ভাবুক প্রকৃতির। বাঙালিদের খুব উঁচু চোখে দেখেন। বিবেকানন্দের ওপর লেখা অনেক বই পড়েছেন। প্রথম দেখায় কান্তিলালকে ভুল বুঝেছিলাম। আসলে ভদ্রলোক অল্পকথার মানুষ। সহজ সরল ও ধার্মিক টাইপের। যাইহোক আলাপের পরে একটা ব্যপারের জন্য আমি কান্তিলালের কেনা গোলাম হয়ে গেলাম।
ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে এল। কামরায় চারজনের সিট। আমি আর কান্তিলাল ছাড়া আর দুজনের একজন হলেন অপর্ণা সেন অন্যজনের নাম রাহুল গুহ। কামরায় দরজায় লাগানো একটা কালো স্লেটে খড়ি দিয়ে লেখা নামগুলো পড়ে নিয়ে ছিলাম ঢোকার আগেই। কেমন লোক হবেন এনারা কে জানে। ভদ্রমহিলার কথা জানিনা কিন্তু ভদ্রলোক নিশ্চয়ই হবেন নাকউঁচু। দুনিয়াকে জয় করেছেন আর কি ভাবে করেছেন তাই নিয়ে বড় বড় লেকচার দেবেন। কত মেয়ের সঙ্গে শুয়েছেন আর কত মেয়ের মন ভেঙেছেন, তাই নিয়ে বড়াই করবেন যতক্ষন জেগে থাকবেন। একটু পরেই, ব্যাগ থেকে বেরোবে দামী বিলেতি হুইস্কি আর সোডা। কিছুক্ষনের মধ্যেই সুরাসক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন । এই হল মোটামুটি বড়লোকদের জীবন। ট্রেন ছাড়ার আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি, হুইসেলের আওয়াজে জানতে পারলাম। পাশের কামরায় তখন চলছে কলকাকলি। এক ঠাকুমা বা দিদিমাকে তুলে দিতে এসেছে তাঁর নাতি নাতনি সহ অগুনতি লোকজন। অন্তত জনা পোনের তো হবেই। মনে হল তারা তাদের এই দিদিমা বা ঠাকুমাকে কতটা ভালোবাসে তাই নিয়ে কম্পিটিশানে মেতে উঠেছে। ট্রেনটা একসময়ে ছেড়ে দিল। ঠাকুমাকে যারা তুলে দিতে এসেছিল তারা একে একে সবাই নীচে নেমে এসে হাত নাড়তে লাগল, আর দিদিমা বা ঠাকুমা ছলছল চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে বিদায় জানাতে লাগলেন। আমার এসবের বালাই নেই। আমি একা যাই একাই ফিরে আসি। আমার জন্যে কেউ অপেক্ষা করে না, আমিও কারোর অপেক্ষায় থাকি না। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে এসব লক্ষ্য করছিলাম। মনে মনে ঠিক করলাম ভদ্রমহিলার সঙ্গে পরে একসময়ে আলাপ করতে হবে। আমার কামরার অন্য দুজন যাদের একজনের নাম অপর্ণা সেন আর অন্যজনের নাম রাহুল গুহ তারা কামরায় এলেন না। মনে হয় কোথাও আটকে গেছেন, হয়ত ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে গেছেন, এসে পৌঁছতে পারলেন না। আমার কিন্তু এতটুকু দুঃখ হল না তার জন্য।
কান্তিলাল অনেকক্ষন হল ওপরে উঠে গেছেন। তাঁর নাকডাকার আওয়াজ কানে আসছে, ট্রেনের আওয়াজকে ছাপিয়ে। এই একটা উপকার কান্তিলাল আমায় করে দিয়ে গেছে। যেইমাত্র শুনেছে আমার ওপরে ঘুমতে অসুবিধে হয়, যেচে ওপরে উঠে গেছেন, ওনার আবার ঠিক উল্টো। ওপরে ছাড়া নাকি ঘুম হয় না। ট্রেনটা চলতে শুরু করল ধিক ধিকধিক ধিকধিক করে। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার অন্য দুজন সহযাত্রি কোন কারণে এসে উঠতে পারলেন না। এমনও হতে পারে ওনারা হয়তো একসঙ্গে যাতায়াত করেন, লাগোয়া ডাইনিং কারে বসে আছেন। উঠবেন পরের কোন স্টেশনে। মনে মনে বললাম বদ্সঙ্গের থেকে নিসঃঙ্গ থাকা ভালো। কামরায় আমি একা জেগে আছি, রাত বেশী হয়নি। একবার ভাবলাম পাশের কামরার ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ করে আসি। পরক্ষনেই মনে হল নাতি নাতনিদের সঙ্গে কথা বলে উনি নিশ্চয় ওদের চিন্তাতেই মগ্ন হয়ে আছেন, এখন ওনার সঙ্গে দেখা করাটা উচিৎ হবে না। দীর্ঘ যাত্রায় কোন এক সময়ে আলাপ করে নিলেই হবে। জানলা দিয়ে বাইরে দিকে তাকালাম। সূর্যদেব সবে বিদায় জানিয়ে সরে গেছেন আকাশ থেকে। চন্দ্রদেব তাঁর আলোর চাদর মন্থর গতিতে দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছেন। দূরে ঝোপেঝাড়ে জোনাকিরা তাদের ছোট ছোট আলো জালিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অনেক অনেক দূরে বসে থেকে তারারা এইসব দেখে মিটিমিটি হাসছে। এইসময়টা একইসঙ্গে আমার সবথেকে দুঃখের আবার সবথেকে আনন্দের। আনন্দের এই কারনে যে এই সময়টা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমার গ্রামে। মনে পড়িয়ে দেয় ছেলেবেলার কথা। তখন আমি খোলা আকাশের নীচে শুয়ে শুয়ে তারা দেখতাম আর গুনতাম একটা একটা করে। তারারা হারিয়ে যেত, আমি আবার তাদের খুঁজে নিয়ে গুনতে শুরু করতাম। আমার মা বলতো কোন একটা তারার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে যদি কেউ মনে প্রাণে কিছু চায়, তাহলে সে তা পেতে পারে। তবে জীবনে একবারের বেশী কিন্তু পাবে না। মা আরো বলত তোমার চাওয়ার পরে যদি দেখ দূরে একটা তারা খসে পড়ে গেল, তার মানে হল তোমার প্রার্থনা ওই তারাটা শুনেছে আর তোমার কথা সে রাখবেই রাখবে। আমি কখনো কোন তারার কাছে কিছু চাইনি। তাই মায়ের কথা যাচাই করার সুযোগ কোনদিন পাই নি। আজ অনেক দিন পরে আকাশে তারা দেখে মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার হাতে উঠে এল মাউথঅরগ্যান। আমি নীচু সুরে বাজাতে শুরু করলাম আপন মনে।
আচমকা ঘুম ভেঙে যাওয়াতে কয়েক মুহুর্ত লাগল পারিপার্শিক অবস্থার বুঝে নিতে। আমার ঘুম বরাবরই পাতলা, অল্প শব্দ হলেও ভেঙ্গে যায়। অতএব অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু অবাক হলাম এই কারণে যে কোনও শব্দে আমার ঘুম ভাঙেনি। অথচ ঘুম আমার ভেঙেছে। আর কারণটার কথা মনে হতেই আমার সারা শরীর হিম হয়ে গেল। আমার প্রতিটি রোমকুপের ভিতর দিয়ে শক্ ওয়েভের একটা তরঙ্গ বয়ে গেল। তবে কি আমি স্বপ্ন দেখছিলাম? মাঝে মধ্যে যে ঘুমের মধ্যে ভয়ের স্বপ্ন দেখি না তা নয়। ভয়ের স্বপ্ন দেখে বহুবার ঘুম ভাঙলে নিজের মনেই হেসে উঠি। আবার সাহস ফিরে পাই। এক্ষেত্রে কিন্ত ঠিক তা নয়। স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙেনি। আমার প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে সেকথা বুঝিয়ে দিল। আমি মাউথঅরগ্যান বাজাতে বাজাতে কোন এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমার ঘুম ভেঙে গেছে, কিন্তু দূঃস্বপ্ন দেখে নয়। তবে কিসে ভেঙেছে আমার ঘুম?
হাঁ মনে পড়েছে, আমার ঘাড়ের খুব কাছে, বালিশের একেবারে পাশে, কারোও একটা নিশ্বাস যেন টের পেয়েছি। আর কিছু মনে করতে পারলাম না। মনে করতে না পারার জন্য আরোও ভয় পেলাম। হাত পা যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমার পরিষ্কার মনে হয়েছে কোন কিছুর একটা নিশ্বাস আমার বাঁদিকের ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছিল। নিঃশ্বাসটা গরম না ঠান্ডা মনে করার চেষ্টা করলাম। হাঁ ঠান্ডাই হবে, আর সেই হিমশীতল ঠান্ডাতেই যে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ ছিল না। ছোটবেলার থেকেই আমি সাহসী আর ডানপিটে তাই ক্ষণিকের জন্য একটু ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিতে খুব একটা সময় নিল না। একটু ধাতস্ত হবার পর কে বা কেন আমার ঘাড়ে এই নিঃশ্বাস ফেলল এটা জানার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। কামরায় ঘুট্ঘুটে অন্ধকার। নিজের হাত পর্য্যন্ত ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। মেন বাতির সুইচ কোথায় দেখে নিয়েছিলাম। দাঁড়িয়ে উঠে হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপে দিলাম। যা ভেবেছিলাম তা কিন্ত হল না। বাতি জলল না। নিশ্চয় বিদ্যুতের গন্ডগোল।
আলো আবার কখন আসবে কে জানে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাতড়ে টর্চলাইট খোঁজার চেষ্টা করলাম কিন্তু পেলাম না। অবাক হলাম, হাতের কাছেই রেখেছিলাম অভ্যাসমত। রেডিয়াম দেওয়া হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। বারোটা বাজার জায়গায় কাঁটাদুটো একে ওপরকে আলিঙ্গন করে আছে।
চোর বা বদমাইস কেউ ঢোকেনি তো? যদিও আমি অহিংস তবু একটা অস্ত্র এই সময়ে হাতের কাছে থাকলে ভাল হত বুঝতে পারলাম। কান্তিলাল কি করছে? তার নাক ডাকার আওয়াজ কানে এল। যাক একজন অন্ততঃ আছে কাছাকাছি একবার ভাবলাম কুপের থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাই। পাশের কামরার দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকি। কিন্তু আমার পা দুটো মনে হল আটকে গেছে। একবিন্দুও নড়তে পারলাম না। এই সময়ে যেটা করা সম্ভব সেটাই করলাম। কাৎ হয়ে ধপ করে নিজের সিটে বসে পড়লাম। আর সাথে সাথে সামনের দিকে তাকিয়ে আমার চোখটা স্থির হয়ে গেল। বুকটা ধড়াস্ করে উঠল। এত ভয় আমি জীবনে কখনো পাই নি। আচমকা এই দৃশ্য দেখে আমি বাকশক্তি রোহিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম আমার উল্টো দিকে। আমার সামনের সিটে একেবারে আমার মুখোমুখি সোজাসুজি আমার দিকে তাকিয়ে একজন কেউ বসে আছে। আপাদমস্তক কালো চাদরে ঢাকা। আমি অপলকে সেই দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হল আমাকে কেউ যেন হিপনোটাইজ করেছে। তখনও জানতাম না যে আমার ভয় পাওয়ার আরো অনেক বাকি আছে।
অল্পক্ষন বাদেই দেখি সেই কালো চাদরটা মাথার কাছ থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। প্রথমে কপাল তারপর চোখ ও নাক। চাদর আটকে রইল ঠিক নাকের ফুটো দুটোর নীচে এসে। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে সম্মোহিতের মত তাকিয়ে রইলাম সেই দিকে। অন্ধকারে চোখ দুটো মনে হল ধক্ ধক্ করে জলছে। কী তীক্ষ্ণ আর গভীর সেই চোখের দৃষ্টি। হঠাৎ ভয়ে চিৎকার করলাম মাগো বলে। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরল না। আমার চোখ বন্ধ হয়ে এল।
কতটা সময় কেটে গেছে জানিনা। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম আমার উল্টোদিকের মানুষটি ঠিক একই ভাবে বসে আছে। পুরুষ কি মহিলা বুঝতে পারলাম না। অন্ধকারে আমার চোখ এতক্ষনে সহ্য হয়ে এসেছে। চোখ দুটো যে আমার গতিবিধি লক্ষ্য করছে সহজাত প্রবৃত্তি আমায় বুঝিয়ে দিল। কান পেতে রইলাম যদি শ্বাসপ্রশ্বাসের আওয়াজ কানে আসে। কোন সাড়াশব্দ পেলাম না। এমন কি কান্তিলালের নাক ডাকার আওয়াজও পেলাম না। এত নিস্তব্ধ চারিদিক যে একটা আলপিন পড়লেও বোধহয় শুনতে পেতাম। হঠাৎ কাছেই একটা গলার আওয়াজে চমকে উঠলাম।
‘‘ভয় পেলেন নাকি?’’ একজন পুরুষের গলার আওয়াজ। লোকটার গলার স্বর গম্ভীর। যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়ের ভাবও লক্ষ্য করলাম।
কয়েকটা মুহুর্ত কেটে গেল, আমার গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরল না।
‘না ভয় পাব কেন,’ নিজের গলার আওয়াজ আমি নিজেই চিনতে পারলাম না। আমার গলা যে কাঁপছে বুঝতে পারলাম। যথাসম্ভব চেষ্টা করলাম নিজেকে সহজ করার। যে কোন অবস্থার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলাম। লোকটা যদি একবার বুঝতে পারে যে আমি ভয় পেয়েছি তাহলে হয়তো আমাকে লুটে পুটে নেবে। হাতের কাছে যদি অস্ত্র পাওয়া যেত, ভালো হত। আমার যা কিছু আছে সব সিটের নীচে, নীচু হতে গেলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আক্ষেপ হল কেন আমি একটা অস্ত্র হাতের কাছে রাখিনি। আর কোন উপায় না দেখে অপেক্ষা করতে থাকলাম লোকটার পরবর্তী কার্যকলাপের জন্য।
- আমি আমার আচরনের জন্য মাপ চাইছি। কামরায় ঢুকে দেখলাম আপনি সিটে বসে ঘু্মোচ্ছেন। আপনার মাউথঅরগ্যানের আওয়াজ আমাকে টেনে এনেছে। খুব ভাল বাজান আপনি। আপনার হাতে যাদু আছে। অনেকক্ষন কামরার বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। আপনার বাজানোতে বাধা দিতে চাইছিলাম না। তাছাড়া শুনতেও ভাল লাগছিল। এককালে আমিও বাজাতাম। ওই টানেই হয়তো এসেছি। যাই হোক পরিচয়টা দিয়ে নি, আমার নাম রাহুল গুহ। আপনি ঘু্মোচ্ছেন দেখে আলো আমিই নিভিয়ে দিয়েছি। আপনার যদি ইচ্ছে হয় আলো জালাতে পারেন, আমার অবশ্য আলোর কোন প্রয়োজন নেই।
লোকটার কথা কেমন হেঁয়ালি মনে হল। আমাকে টেনে এনেছে মানে কী হল। ওই টানেই এসেছি, তার মানেই বা কী? এককালে বাজাতাম কথারই বা কী মানে? একটা কথা মানতে বাধ্য হলাম, লোকটা অল্প কথায় পরিস্থিতিকে বর্তমানে নিয়ে এল খুব স্বাভাবিক ভাবে।
মনে মনে ভাবলাম, যদি আলো জ্বালাই তাহলে রাহুল ভাববে আমি ভয় পেয়েছি। তাছাড়া আলো এখনও এসেছে কিনা তাও জানিনা। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। হাত ঘড়ির দিকেও একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। ভোর হতে আর বেশী বাকি নেই। সূর্যদেব আশেপাশেই কোথাও লুকিয়ে আছেন, আবির্ভাবের জন্য ঠিক সময়ের অপেক্ষা করছেন। ভোরের আলোর আর বেশি বাকি নেই। ঠিক করলাম আলো জালানোর দরকার নেই।
আমিও নিজের পরিচয় দিলাম। একথা সেকথার পর হঠাৎ রাহুলের একটি প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে গেলাম।
- আপনি তো লেখক, তাই না?
অবাক হবারই কথা। অন্তর্যামী নাকি? একটু আধটু যে লেখালিখি করি না তা নয়, নামকরা কয়েকটা ম্যগাজিনে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। একটি ভ্রমন কাহিনি বই হিসেবে ছাপার অক্ষরে সদ্য প্রকাশিতও হয়েছে, তাই বলে আবছা অন্ধকারে আমাকে দেখে লেখক বলে চেনার মত এতবড় সাহিত্যিক যে আমি এখনও হইনি এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। অবাক হয়ে রাহুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম জবাব না দিয়ে।
- এই জন্য জিজ্ঞেস করছি যে, আপনার পাশে যে বইটি পড়ে আছে তাতে লেখকের নাম বড় করে ছাপা আছে। কামরায় ঢুকেই নজরে পড়েছিল। তারপর আপনি যখন আপনার পরিচয় দিলেন তখন দুই আর দুইয়ে চার করলাম, এই আর কি।
- একটু আধটু লেখার চেষ্টা করি এইমাত্র, তেমন কিছু নয়। এই বইটাই আমার একমাত্র বই। বাজারে নতুন বেরিয়েছে, ভলো করে দেখার সময় পাইনি। তাই সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম উল্টেপাল্টে দেখব বলে। আপনি বই পড়েন নাকি? প্রশ্ন না করে পারলাম না।
- না আমি বই পড়ি না। কম বয়সে অনেকে মত আমিও শরৎবাবু, বঙ্কিমবাবু আর রবিঠাকুরের একটা দুটো বই পড়েছিলাম, ওই পর্য্যন্তই। অবশ্য দোষ আমার, বলতে পারেন স্বেচ্ছায় নিজেকে ওই জগৎ থেকে নির্বাসিত করে রেখেছি। ওই তিনজন ছাড়া একসঙ্গে বোধহয় আর অন্য কোন লেখকেরও নাম করতে পারব না।
কথার মধ্যে কোন দম্ভের আভাস পেলাম না। সত্যি তো আজকাল দিনের মানুষের অত সময় কোথায় বই পড়ার। একটু খটকা অবশ্যই লাগল। ভদ্রলোক বললেন বটে যে উনি বই পড়েন না, কিন্তু অস্তমিত চাঁদের নরম আলো জানলা দিয়ে এসে সিটের যে জায়গাটায় পড়েছে তার কাছেই দেখলাম একটা মোটা বই পড়ে আছে। ইংরেজি। ক্রিস্টিয়্যান ক্যাডারের লেখা ‘অরগুমেন্ট ফর দা একজিস্টেনস ওব গড।‘ যদিও আমার ভগবানে তেমন বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কিছুই তবুও বইটি আমিও একসময়ে পড়েছি, তাই মলাট দেখে চিনতে অসুবিধে হল না।
ভদ্রলোক নিশ্চই ধর্মতত্ত্ব নিয়ে চর্চা করেন। রাহুল গুহর বয়স আন্দাজ করতে চেষ্টা করলাম। আবছা অন্ধকারে তিরিশের বেশী নয় বলেই মনে হল। এই বয়সে ধর্ম নিয়ে পড়াশুনা? বেশ কৌতুহল-জনক। আমার অনু-সন্ধিৎসু লেখক মন আরো মনযোগী হয়ে উঠল।
ঠিক এই সময়ে কামরার আলো ফিরে এল। কয়েক মিনিট জ্বলে থেকে আবার নিভে গেল। আবার ঘন অন্ধকারে কামরাটা ভরে গেল। আমি ভদ্রলোকের দিকে ভালো করে তাকিয়েছিলাম। শক্তসমর্থ ও আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা। পরনে সাদা প্যান্ট আর সবুজ রংয়ের বুশ সার্ট। চওড়া কব্জিতে ঝকঝক করছে দামি হাতঘড়ি। শৌখিন, সুঠাম ও সুপুরুষ। একটা ব্যাপারে কিন্তু অবাক না হয়ে পারলাম না। সেটা হল রাহুল গুহর মুখের দিকে তাকিয়ে। রাহুল গুহর সারা মুখে একটা ক্লান্তির ছাপ। চোখের চারপাশে কালি। দীর্ঘদিনের অনিদ্রা আর অনিয়মের ফলে যা হয় অনেকটা সেইধরনের। লোকটা ঘুমায় না কেন? আর কেনই বা সে ধর্মের বই পড়ে?
- আমি পড়েছি, যে বইটা পড়ছেন কেমন লাগছে? প্রশ্ন করি।
হেসে জবাব দিলেন, ‘কি জানি, পড়তে ভালো লাগছে। আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি।’
- কোন প্রশ্নের? আমি কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না। হয়ত মেয়েঘটিত কিছু।
আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রাহুল গুহ পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ভগবানে বিশ্বাস করেন?’
- ভগবানের ব্যাপার আমার কাছে খুব একটা সহজবোধ্য নয়। হাঁ বা না কোন উত্তরই আমি দিতে পারব না। জীবনে এখনও আমার আরোও অনেক কিছু জানার ও শেখার বাকি আছে। তাই ওই সব আপাততঃ স্থগিত রেখেছি, আমি পাশ কাটিয়ে জবাব দিলাম।
কিছুক্ষন সব চুপচাপ, জবাবটা এল একটু পরে।
- আমি ভগবানে কোনদিনই বিশ্বাস করতাম না। এখন বিশ্বাস করি।
আমি লক্ষ্য করছি তাকে। যেটুকু দেখেছি তাতে বোঝা যায় সুখের ঘরে লালিত পালিত শৌখিন পুরুষ। টাকা পয়সার জোর থাকলে আর প্রবৃত্তি থাকলে এই ধরনের পুরুষেরাই একছেড়ে অনায়াসেই বহুবল্লভ হতে পারে। নির্ঘাৎ মেয়ে ঘটিত, এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্ত কে সেই নারী যে রাহুল গুহর মত একটি পুরুষের মন চুরি করে তাকে এই ধরনের বিপরীত আচরণ করতে বাধ্য করেছে? সমস্ত ব্যাপারটা আমার কাছে কৌতুহলোদ্দীপক মনে হল।
এবারে একটু বাস্তব আলাপের দিকে এগোবার চেষ্টা করলাম।
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি বেড়াতে বেরিয়েছেন? একা?’
মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ দুটো প্রশ্নের উত্তরই হাঁ।
আবার প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার কর্মস্থল কোথায়?’
- কর্মস্থল নেই। আমার বয়স পঁয়তিরিশ, যাকে বলে পার্মানেন্ট বেকার। বাবার অঢেল টাকা পয়সা ছিল। অসুবিধে হয় না, চলে যায়।
- কোথায় থাকেন? কোলকাতায়?
- কোনো ঠিক নেই। একবছর ধরে তো তীর্থে তীর্থে ঘুরে ঘুরেই কাটিয়ে দিলাম, আজ এখানে কাল সেখানে। সিটের পাশ থেকে বইটা তুলে তার ওপর আঙ্গুলের টকটক শব্দ করতে লাগলেন।
- তার আগে কোথায় থাকতেন?
টকটক শব্দটা থেমে গেল। আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর হাসিহাসি মুখটা আমার দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে গেল।
- তার আগের টানা বারোটা বছর জেলে কেটেছে। এতটুকু ইতস্তত না করে উত্তর দিলেন।
আমি থতমতো খেয়ে গেলাম। এই রকম উত্তর শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু চোখটা উঠিয়ে ওনার দিকে তাকাতে ভরসা হল না। না তাকালেও বুঝতে পারলাম ওনার চোখে আর মুখে হাসি লেগে আছে, উনি আমার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছেন। মনে মনে দ্রুত হিসেব করে ফেললাম। ভদ্রলোক এক বছর আর বারো বছর - মোট তেরবছরের হিসেব দিলেন। এখন বয়স পঁয়তিরিশ। তার মানে বাইশ থেকে চৌতিরিশ বছর বয়স অবধি তিনি জেলে পার করেছেন।
দ্বিধাদন্দ্ব কাটিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রাজনৈতিক নিশ্চয়?’
তিনি বোধহয় আমার প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
বললেন, ‘না, হোমিসাইড।’
আমার চমকানোর পালা যেটুকু বাকি ছিল এবারে সেটা পূর্ণ হল। বিশ্বাস করব কি করব না বুঝে উঠতে পারলাম না। হোমিসাইড অর্থাৎ নরহত্যা। তারমানে নিজেকে খুনের দায়ের আসামী বলছেন। একবার ভাবলাম বলি, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? কিন্তু ওনার চোখমুখ দেখে সেকথা মনে হল না।
বাইরে যান্ত্রিক গর্জন করে ট্রেন ছুটে চলেছে শোঁ শোঁ করে। ভিতরে নির্বাক হয়ে আবছা অন্ধকারে আমি বসে রইলাম। এই প্রথম কান্তিলালের কথা আমার মনে পড়ল। এই সময়ে তার আমার পাশে থাকার একটা তাগিদ অনুভব করলাম। সেইসাথে অনুভব করলাম আলোর অভাব। কোনো কথা মুখ দিয়ে বেরল না। যদিও তা নিজের কাছে বিসদৃশ লাগল।
অবশেষে একটা স্টেশনে এসে ট্রেনটা থামল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাইরে ছোটাছুটি হাঁকাহাঁকি। ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম। তাঁর দৃষ্টি তখন জানলা দিয়ে বাইরের দিকে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে প্যাসেঞ্জারদের ব্যস্তসমস্ত আনাগোনা, ফেরিওয়ালাদের ডাকাডাকি, যাত্রিদের চায়ের তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টা, খাবার দাবারের খোঁজ। আমার মনে হল ভদ্রলোক এসবের কিছুই দেখছেন না। তাঁর দৃষ্টি যেন বহুদূরে নিবদ্ধ। এত সুন্দর সৌম্য মুখ! এই মুখে পাপের খোঁজ করতে গিয়ে নিজের কাছে নিজেই লজ্জা পেলাম।
ট্রেনটা নড়ে উঠল। ছাড়ার সময় হয়েছে। আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্ম ছাড়িয়ে গেল। ধীরে ধীরে গতি বাড়তে লাগল। আবার আবছা অন্ধকার। হয়ত গাড়ির ঝাকুনিতে ভদ্রলোকটি চেতনায় ফিরে এলেন। আমি তখনও ওনার দিকে তাকিয়ে আছি। চোখাচখি হতে একটু হেসে বললেন, ‘ঘাবড়ে গেছেন? বিশ্বাস হচ্ছে না?’
আমার জবাবও তৈরি ছিল। তৎক্ষণাৎ বললাম, ‘না, আপনি এত সহজে যখন কথাটা বলতে পারলেন, আমার ঘাবড়াবার প্রশ্ন আসে কি করে?’
- আপনি জিজ্ঞেস করলেন, তাই সত্যি কথাটাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। আজ এক বছর ধরে ঘুরছি কেউ আমাকে এই প্রশ্ন করেনি, আমাকেও উত্তর দিতে হয়নি।
- একটা প্রশ্ন করব?
- কি গল্পের খোঁজ করছেন নাকি?
আমি চুপ করে রইলাম।
- আপনাকে বলব বলেই তো এসেছি। দেখুন যদি আপনার কাজে আসে। তবে নাম ধাম গুলো আপনাকে বানিয়ে নিতে হবে।
উত্তর দেওয়ার পর অনেকক্ষন চুপ করে রইলেন ভদ্রলোক। হাসিভরা চোখদুটো আবার জানলার বাইরের দিকে চলে গেল। বুঝলাম মানুষটির নিজের মনের মধ্যে বোঝাপড়া চলছে। খুনীর চেহারা এত সুন্দর হয় কি করে? তার হাসি কি করে হয় এত সুন্দর? আর চোখ দুটোই বা এত সুন্দর হবে কেন?
না, এই মানুষ খুনী হতেই পারে না। এনার ভিতর দিয়ে হয়ত আমার হাতে আজ আসবে একটা ছবি আঁকার সরঞ্জাম। কিন্তু সেই ছবি সুন্দর হবে না ভয়ংকরের রূপ নেবে সেই কৌতুহলে আমার মনটা ছটফট করতে লাগল। অধীর আগ্রহে আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ভদ্রলোকের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল একটু বাদে। বইটা তাঁর কোলের ওপরে তুলে নিয়ে, দুটো হাত দিয়ে সেটাকে ধরে তিনি শুরু করলেন।
বেশীর ভাগ লোকেই বলবে ভবিতব্য আর লালসার মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই। হয়তো আছে, কিংবা হয়তো নেই। এব্যাপারে নানামুনির নানা মত। কিন্তু ম্যান প্রপোজেস এন্ড গড ডিসপোজেস এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। আমার ক্ষেত্রে দুটোই সত্যি। একটা দিনের একটা ঘটনা এমন ভাবে মানুষের জীবনকে পালটে দিতে পারে কখনো ভাবতে পারিনি। সবে কলেজের ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়েছি। হাতে অফুরন্ত সময়। চলে গেলাম বেড়াতে এক হিল স্টেশনে। সেখানেই প্রথম দেখেছিলাম মেয়েটিকে। কোন মেয়ের যৌবনের প্রসাদ যদি হয় অফুরন্ত, তার আঁটসাঁট কিন্তু পরিচ্ছন্ন বেশবাসের ভাঁজে ভাঁজে বক্ররেখার লীলা হঠাৎ দেখা দিয়ে আবার লুকিয়ে পড়ে এবং লুকিয়ে থেকে যদি তার আবেদন দূর থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, আর যদি সে হয় শিক্ষিতা এবং বুদ্ধিমতি, তার রুচি আর শালীনতাবোধ যদি হয় আত্মস্থ অথচ প্রখর, এবং তার চলনে বলনে হাসিতে খুশিতে এমন এক রমণীয় ও লোভনীয় সত্তাবোধ থাকে যা পুরুষের দুচোখে শুধু মাধুর্যই ছড়ায় না চম্বুকের মত আকর্ষণও করে - তারই নাম হবে অপর্ণা সেন। একটা হোটেলে খেতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল। আলাপটা হয়েছিল অদ্ভুত ভাবে। খাওয়া দাওয়ার পর বেয়ারা এসে যখন বিলটা দিল, তখন পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি মানি-ব্যাগটা নেই। আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। বিদেশ বিভুঁইয়ে এরকম হবে ভাবিনি, কি করব ভাবছি। এমন সময়ে আমায় অপমানের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল অপর্ণা। উঠে এসে আমায় উদ্ধার করেছিল, নিজের পার্স থেকে পয়সা বের করে বিলের পয়সা মিটিয়ে দিয়ে। আমি পয়সা ফিরিয়ে দেব জোর করার জন্য আর আমি একা বেড়াতে এসেছি শুনে আমাকে ওর বাড়িতে একদিন আসার নিমন্ত্রণ জানাল। বলাবাহুল্য, অপর্ণার বাড়িতে একদিন উপস্থিত হলাম। জানতে পারলাম অপর্ণা বিবাহিতা, স্বামীর নাম সমীরন সেন। এক মস্ত কম্পানির চিফ ইগজেকিউটিভ অফিসার। রাসভারী, অল্পভাষী ও শৌখিন। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে। অপর্ণার সঙ্গে সমীরন সেনের বয়সের পার্থক্যটা নজরে পড়ার মত।
অপর্ণার বাড়িতে যাতায়াত আমার ক্রমশঃ বাড়তে লাগল। সন্ধ্যে হলেই জমে উঠত আমাদের আসর। আলাপটা জমে ছিল গানের মাধ্যমে। গানের শখ ছিল আমার ছোটবেলা থেকে। কলেজের ফাংশানে আমি ছিলাম নিয়মিত গায়ক। অপর্ণাও ছিল রীতিমত সুকণ্ঠী। আমি কখনো গান ধরতাম আবার কখনো বা মাউথঅরগ্যান বাজাতাম। কখনো অপর্ণা বাজাতো পিয়ানো। অপর্ণা গলা ছেড়ে গান গাইতো পিয়ানোর সাথে সাথে। সমীরন সেন কিছুক্ষন আমাদের সঙ্গে কাটিয়ে উঠে যেতেন বাড়ির ভিতরে তাঁর অফিস ঘরে। আমাদের আসরের কোন বাধা পড়ত না তার জন্য। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম অপর্ণার গান। না শুধু যে শুনতাম তা নয়, আমি অপর্ণাকে দেখতাম। এত সুন্দরী কেন হল অপর্ণা? কেন পেল সমীরন সেনের মত এত বয়স্ক লোক অপর্ণার মত মেয়েকে? কি দিতে পারবে সমীরন সেন অপর্ণাকে? এই এতগুলো কেন ক্রমশঃ আমাকে বিচলিত করতে শুরু করলো। ইংরিজিতে একটা কথা আছে ফেট্যাল অ্যাট্রাকশন অর্থাৎ মারাত্মক আকর্ষণ। আমার তাই হয়েছিল অপর্ণাকে দেখে। আমি ভুলে গেলাম অপর্ণা বিবাহিতা। ভুলে গেলাম আমার ভুত আমার ভবিষ্যৎ। অপর্ণাকে ছাড়া দুনিয়াটা আমার কাছে বৃথা মনে হতে লাগল, অপর্ণাকে পেতে হবে যে করেই হোক। আমি সম্মোহিত হয়ে এক দুর্নিবার আকর্ষণে ও প্রবল উন্মত্ততায় একটা মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম। আজ মনে হয় সেই সুযোগটা যদি আমার জীবনে কোনদিন না আসতো তাহলে আমার জীবনও এইভাবে ওলোট পালোট হয়ে যেত না।
কিন্তু সুযোগ এসে গেল। বেশীদিন অপেক্ষা করার দরকার হল না। জানতে পারলাম সমীরন সেন কিছুদিনের জন্য বাইরে যাচ্ছেন অফিসের কাজে। কবে কখন উনি যাচ্ছেন, সবকিছু আগে থেকে জেনে নিলাম। অপর্ণাদের কাজের লোক দুজন, বনমালি আর সরস্বতী। আমি জানতাম কাজ না থাকলে অপর্ণা তার কাজের লোকেদের ছুটি দিয়ে দেয়। অপর্ণা আমাকে আসার জন্য বলেনি কিন্তু মানাও করেনি। জানতাম সমীরন সেন দুপুরের ট্রেন ধরবার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন অফিসের গাড়িতে। অপর্ণা দরজা অবধি এসেছিল বিদায় জানানোর জন্য, দাঁড়িয়ে ছিল যতক্ষণ গাড়িটা দেখা যায় তার পর ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে সবার চোখের আড়ালে থেকে সব লক্ষ্য করেছিলাম। অপর্ণার মুখ দেখে মনে হল না যে সে দুঃখে ভেঙ্গে পড়েছে। খুশীতে আমার মন ভরে গেল। আজ রাত্রেই অপর্ণার সঙ্গে আমার বোঝাপড়া হবে। আমার মনের সব কথা ওকে বলব। আজ অপর্ণা আমার হবে, শুধু একা আমার। আমরা দুজনে কোথাও পালিয়ে যাব কেউ জানতে পারবে না। কেউ আর আমাদের খুঁজে পাবে না। শুধু অপর্ণা আর আমি। শুধু আমরা দুজনে আর কেউ থাকবে না আমাদের কাছাকাছি।
আপনমনে ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যেবেলা কখন যে অপর্ণাদের বাড়িতে পৌঁছে ওদের বাড়ির বেলটা টিপে দিয়েছি নিজেরই খেয়াল নেই। দরজা খুলে দিল অপর্ণা। তার মানে কাজের লোকেদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে, একটু নিশ্চিন্ত হলাম। মনে হোল একটু অবাক হয়েছে অপর্ণা আমাকে দেখে। অল্পসময়ের জন্য চিন্তা করেই অবশ্য সরে দাঁড়িয়ে আমাকে ভিতরে আসার আহ্বান জানাল হাসিমুখে। ভাবতে অবাক লাগে ওই হাসিটাই ছিল অপর্ণার শেষ হাসি। তারপর আর কোনদিন অপর্ণার মুখের হাসি দেখিনি। আমি অনেক চেষ্টা করলাম গান আর বাজনা দিয়ে আসর জমানোর কিন্তু কেন কে জানে অপর্ণার আজ কিছু হয়েছে। সে দেখলাম দুটো উলের কাঁটা দিয়ে একটা সোয়েটার বোনায় ব্যস্ত। আরো লক্ষ্য করলাম সে অন্যমনস্ক, কিছু ভাবছে। কি ভাবছে অপর্ণা? কেন ভাবছে? আমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবার কি আছে? কার জন্য সোয়েটার বানাচ্ছে অপর্ণা? আমার জন্য নয় নিশ্চই, কারণ উলের রং লাল। আমার লাল রং পছন্দ নয় অপর্ণা ভালো করেই জানে। কই আমি তো অপর্ণাকে ছাড়া আর কিছু ভাবিনা, তবে কেন কেন আজ আমি এত কাছে থাকা সত্ত্বেও আমাকে উপেক্ষা করছে অপর্ণা? এদিকে আমি মনে মনে নিজেকে তৈরী করছিলাম আমার মনের কথা কেমন করে প্রকাশ করব অপর্ণার কাছে। আর দেরী করা ঠিক হবে না ভেবে আমি অবশেষে বলেই ফেললাম আমার ভালোবাসার কথা, আমার ভালোলাগার কথা। তারপর যা হল তার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। হঠাৎ মনে হল আমি আমার জ্ঞান হারাতে বসেছি। মনে হল আমার মাথার মধ্যে একটা হাজার বাতির লাইট বালব দপ্ করে জলে উঠেই নিভে গেল। আর আমি গভীর কালো জমাট বাঁধা ঘন একটা অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে ডুবতে শুরু করলাম। তারপর আর কিছু আমার মনে নেই। কি করে বা কেমন করে ঘটনাটা ঘটল তার কোন হিসেব আজ পর্য্যন্ত আমি অনেক চেষ্টা করেও মেলাতে পারিনি।
বোধশক্তি যখন ফিরে এল তখন যা দেখলাম তাতে আমার বুকটা ধক্ করে উঠল। আবার জ্ঞান হারানোর কথা আমার। কিন্তু আমি জ্ঞান হারালাম না। দেখলাম অপর্ণার দেহটা আধশোয়া অবস্থায় কাৎ হয়ে সোফায় পড়ে আছে। মাথাটা হেলে আছে, চোখ দুটোতে কোন প্রাণ নেই। তবুও সেই প্রাণহীন চোখ দুটোতে লেগে আছে একটা অবাক বিস্ময় এবং সবথেকে আশ্চর্য্যের কথা চোখ দুটোর দৃষ্টি সর্বক্ষন আমার দিকেই প্রতিফলিত আমি যেদিকেই যাই না কেন তারা আমায় অনুসরণ করছে। আরো লক্ষ্য করলাম ডান দিকের গলার ঠিক মাঝখানে একটা উলের কাঁটা অর্ধেক ঢুকে আছে আর সেই জায়গাটা দিয়ে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। একসময়ে যে ওই জায়গাটা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়েছিল তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। চার পাশে সব লালে লাল হয়ে গেছে। আমার জামা আর প্যান্টেও লাল রংয়ের ছিটে এসে লেগেছে। লাল রং আমার কোনোদিন ভালো লাগে না। ছোটবেলায় আমার চোখের সামনে একটা লোক বাসের নিচে চাপা পড়ে। তখন লাল রক্ত দেখে ভয় পেয়েছিলাম। সেই থেকে লাল রং আমার অপছন্দ। অপর্ণার শরীরে এত রক্ত ছিল জানতাম না। তার সারা শরীর রক্তে মাখা, চাপ চাপ রক্তে ভরে গেছে চারিদিক। নাকের কাছে হাতটা নিয়ে গেলাম, না অপর্ণা বেঁচে নেই। কিন্তু কেন এরকম হল? কে করল এমন কাজ? একবার সন্দেহ হল নিজের ওপর। আমি ছাড়া আর তো কেউ ছিল না এখানে। তবে কি? না আমি কেন করব এমন কাজ। আমি তো অপর্ণাকে ভালোবাসি। কিন্তু অপর্ণা কি আমায় ভালোবাসে? তবে কেন অপর্ণা হেসে উঠেছিল হো হো করে যখন আমি আমার ভালোবাসার কথা আমাদের পালিয়ে যাওয়ার কথা ওকে জানিয়েছিলাম। অপর্ণার হাসি থামছিল না, হেসে কুটিপাটি হচ্ছিল সে। কেন অপর্ণা আমাকে বলেছিল যে আমার সব ধারণা ভুল, কেন বলেছিল ওর বয়স উনচল্লিশ বছর, কেন বলেছিল সময়মত বয়সে বিয়ে হলে আমার মত বয়সের একটা ছেলে থাকতে পারতো তার। কেন, কেন এইভাবে আমাকে উপহাস করেছিল অপর্ণা? কি দরকার ছিল অপর্ণার আমার এই স্বপ্নকে, আমার প্রথম প্রেমকে এইভাবে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেবার? অপর্ণাকে আমি ভালোবাসি, তার কোন দোষ আমি দেখি না। যে বা যারা আমার অপর্ণাকে মেরেছে তাদের আমি শাস্তি দেব, তারা রেহাই পাবে না আমার হাত থেকে। আমি দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম।
আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎ আমাকে সজাগ আর সাবধান করে দিল। আমার কানে কানে কেউ বলল তোমার সমুখে আসন্ন বিপদ তুমি যত শীঘ্র পারো পালাও এখান থেকে। আমি এখানে এসেছি কেউ জানেনা। কেউ দেখেনি। আর এখান থেকে বেরোনোর সময় যদি কেউ আমাকে দেখতে না পায় তাহলে আমাকে কেউ সন্দেহ করবে না। অতএব আমার ধরা পড়া অসম্ভব। ধীর স্থীর ভাবে জায়গাটা ভালভাবে পরিদর্শন করলাম। আমার এখানে আসার কোন চিহ্ন ফেলে যাচ্ছি কিনা একবার দেখে নিলাম। আমি সিগারেট খাই, আজও এখানে আসার পর খেয়েছি গোটা কয়েক, টেবিলের ওপরেই ছিল অ্যাস্ট্রে, কিন্তু তন্নতন্ন করে খূঁজেও কোথাও পেলাম না। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে বুঝতে পারলাম। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে এলাম।
অপর্ণার বাড়ি থেকে পালিয়ে এলাম বটে, কিন্ত পুলিশের আওতা থেকে পালাতে পারলাম না। সন্দেহ যাতে আমার ওপর না পড়ে তাই ঠিক করেছিলাম আরো দুটোদিন এখানে কাটিয়ে তারপর নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়াব। কিন্তু পুলিশ এসে হাজির হল আমার হোটেলে পরের দিনই। জেরা চলল কয়েকদিন ধরে। অকাট্য সব প্রমান খাড়া করা হল আমার বিপক্ষে। আমি যখন অপর্ণাদের বাড়ি থেকে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বেরিয়ে আসছিলাম, তখন বনমালি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমায় পরিষ্কার দেখেছে। আমার পরনে নাকি ছিল সাদা প্যান্ট আর সবুজ রংয়ের বুশ্ সার্ট। অপর্ণা নাকি তাকে ছুটি না দিয়ে বলেছিল নীচের শহর থেকে কিছু কেনাকাটি করে নিয়ে আসার জন্য। সেইসব করে ফিরতে ফিরতে ওর রাত হয়ে গিয়েছিল। তার থেকেও যেটা বড় প্রমান, সেটা পাওয়া গেল মৃত অপর্ণার কাছ থেকে। যে অ্যাস্ট্রে আমি সেইদিন তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাইনি সেই অ্যাস্ট্রে অপর্ণা লুকিয়ে রেখে ছিল তার শরীরের নীচে। কখন যে অপর্ণা তুলে নিয়েছিল সেটা আমি মনে করতে পারলাম না। আমার জেল হল। জেলে গেলে অন্য লোকেদের কি হয় আমি বলতে পারব না তবে আমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে এইটুকু বলতে পারি। প্রথম প্রথম অপর্নার কথা মনে হত। ধীরে ধীরে অপর্নার কথা ভুলে গেলাম। তার বদলে একটা আত্মগ্লানি আমাকে পেয়ে বসল। দীর্ঘ বারোটা বছর আমার জেলে কেটে গেল। অথচ জেলে থাকাকালিন আমি ঠিক সময়ে ঘুমিয়েছি, খাওয়া দাওয়া করেছি। সময় আমার কেটে গেছে, কোন অসুবিধে হয়নি।
অসুবিধে শুরু হল জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর। আজ আমি ঘুমোতে পারি না, খাওয়া দাওয়ার স্পৃহা আমার চলে গেছে। আমার মত ঘোর নাস্তিক আজ ভগবানে বিশ্বাস করে, পরজন্মের কথায় বিশ্বাস করে। যত কিছু খারাপ হবার হোক তার জন্য এতটুকু দুঃখ নেই। শুধু ভগবানের কাছে আমি এই প্রার্থনা করি যে আমি মারা গেলে যেন আমার আত্মার শান্তি হয়। যৎসামান্য অর্থ আমার জন্য রেখে বাকি যা কিছু ছিল সব আমি দিয়ে দিয়েছি বিভিন্ন বিতরণ কেন্দ্রে। এত কিছু করেও আমি জানি এজন্মে আমি আর শান্তি পাব না। কেন জানেন? তার কারণ অপর্না। অপর্না আমায় শান্তি পেতে দেবে না। যতদিন আমি জেলে ছিলাম আমায় কিছু করেনি। একবারের জন্য দেখাও করতে আসেনি। অথচ যেদিন জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি সেইদিন থেকে ও আমার পিছু নিয়েছে। আমাকে রোজ দেখা দেয়, যখন তখন। তার সেই প্রাণহীন চোখদুটো দিয়ে সে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে, আমি অবজ্ঞা করলেও বুঝতে পারি যে চোখদুটো আমারই ওপর নিবদ্ধ। এ যে কি আসহ্য যন্ত্রণা বোঝানো যাবে না। একমাত্র মৃত্যুই আমাকে শান্তি দেবে। একবার একটা চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝঁপিয়ে পড়তে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহুর্তে সরে এসেছিলাম, সাহসে কুললো না। একদিন হয়ত আমার সাহস হবে আমি হয়ত পারব নিজের মৃত্যকে বরণ করে নিতে। সেইদিনের জন্য শুধু অপেক্ষা করছি।
রাহুল গুহ কথা শেষ করে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন, বইটা তখনও তাঁর হাতে ধরা। মনে হল তাঁর দৃষ্টি স্থান কাল পেরিয়ে অনেক অনেক দূরে কোথায় গিয়ে আটকে গেছে। আমি ওনাকে ঘাঁটাতে সাহস পেলাম না। এতক্ষন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে রাহুল গুহর গল্প শুনছিলাম। অস্বীকার করব না, এই কয়ে ঘন্টার মধ্যে যাত্রার রংই পালটে গেছে আমার কাছে। কিছু কিছু লোক আছে যারা কাছাকাছি থাকলে এক ধরনের জীবনের তাপ অনুভব করা যা। এই ভদ্রলোকটিকে আমার সেই ধরনের লোক বলেই মনে হল। একটা কথা বুঝতে পারলাম যে আমার জানার আর বোঝার এখনও অনেক কিছু বাকি আছে। হঠাৎ ভদ্রলোকের পরের প্রশ্ন শুনে অবাক হয়ে গেলাম।
- আপনি ভুতে বিশ্বাস করেন?
- না ঠিক বিশ্বাস করিনা, তবে একেবারে যে ...
- ভুত দেখবেন?
তারপর যা হল তা অভাবনীয়। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমার চোখের সামনে ভদ্রলোকের মাথাটা ঘুরতে শুরু করল অনেকটা লাট্টুর মত। প্রথমে আস্তে আস্তে তারপর বন্বন্ করে। আমার মাথাও ঘুরতে শুরু করল। একসময়ে হঠাৎ ঘোরা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল যেমনভাবে শুরু হয়েছিল। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য। কারণ মুন্ডুটা থামার পরেই দেখলাম আমার ঠিক মুখোমুখি আমারই দিকে তাকিয়ে আছে একটা কঙ্কাল, চোখদুটো কোটরের মধ্যে ঢোকা। আমি চিৎকার করে ‘মাগো’ বলে ডাক দিয়ে চেতনা হারালাম।
মুখেচোখে জলের ছিটে পড়াতে জ্ঞান যখন ফিরে এল, দেখলাম মাথায় পাগড়ি পরা এক ভদ্রলোক আমার দিকে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছেন। আমায় নড়াচড়া করতে দেখে আশ্বস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবুজি আপনি ঠিক আছেন তো?’
উঠে বসলাম। একটু লজ্জা পেলাম কিন্তু কান্তিলালকে দেখে ভরসাও পেলাম। আমার উল্টোদিকেই বসে আছে কান্তিলাল, যেখানে এতক্ষন বসে ছিল রাহুল গুহ নামের এক ভদ্রলোক। আমাকে উঠে বসতে দেখে কান্তিলাল আরো অশ্বস্ত হল।
- খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছেন বাবুজি। আপনি ঘুমের মধ্যে কোথা বলিয়েছেন। ইটা খুব খারাপ রোগ আছে। আপনি তাড়াতাড়ি একটা ডাক্তার দিখায়েন। আমার ভাইটার এইরকম ছিল, সে মরে গিল। আপনি ডাক্তার দিখায়েন বাবুজি। খুব খারাপ রোগ আছে। কান্তিলাল তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় আমাকে মদত করার চেষ্টা করল।
আমি দেখলাম ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কোন স্টেশনে নয়, মাঠের মাঝখানে। লোকালয়ের থেকে অনেক দূরে বলেই মনে হল। সন্ধ্যে হব হব করছে। অনেক লোক নীচে নেমে ছোটাছুটি করছে। তাদের মধ্যে অনেককে ট্রেনের কর্মচারী বলেই মনে হল। হন্তদন্ত হয়ে এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে গম্ভীর মুখে। আমি কান্তিলালকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি ব্যাপার?’
- ও কুছু নয়। এ তো হরদম হয়। মনে হয় কোন জন্তু জানোয়ার গাড়ির সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। লাইন পরিস্কার হলেই ট্রেন আবার ছাড়বে। চা খাবেন? আসুন আমার ফ্লাস্কে গরম চা আছে।
আমি না করতে পারলাম না। চা নয় মনে হল অমৃত পান করছি।
কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরে দেখলাম এক কর্মচারী আমাদের কামরার খুব কাছ দিয়ে যাচ্ছেন। আমি ডেকে ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা জানার জন্য। উনি যা বললেন তাতে আবার অবাক হলাম। একটা মানুষ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে। জন্তু বা জানোয়ার হলে লাইন থেকে সরিয়ে দিয়ে আগের বা পরের স্টেশনে খবর দিলেই মাল খালাস অর্থাৎ ট্রেন চলতে পারে। কিন্তু মানুষ হলে অন্য ব্যাপার। পুলিশ আসবে, তদন্ত হবে অনেক সময় লাগবে। কান্তিলালের মুখ দেখে মনে হল না সে খুব খুশী হয়েছে কর্মচারীর কথা শুনে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল মানুষটার পরনে কি ধরনের পোশাক ছিল। জিজ্ঞেস করলাম। প্রশ্নটা ভদ্রলোকের পচ্ছন্দ হয়নি উত্তর শুনে বুঝতে অসুবিধে হল না। ‘এই সময়ে এই ধরনের প্রশ্ন করা উচিৎ নয়,’ আমায় সোজা জানিয়ে দিলেন। তারপর অবশ্য ভদ্রভাবেই বললেন যে এমন ভাবে দেহটা নষ্ট হয়ে গেছে যে মানুষ না জানোয়ার বোঝা যাচ্ছে না, পোশাক তো দূরের কথা। শুধু একটা দামী হাতঘড়ি পাওয়া গেছে নষ্ট হওয়া দেহটার কাছাকাছি। তাই ওটা যে কোনো মানুষের দেহ এ ব্যাপারে কোনরকম সন্দেহ নেই। কর্মচারী আর অপেক্ষা না করে হন্তদন্ত হয়ে চলে গেলেন।
রাহুল গুহর কথা মনে পড়ে গেল, অপর্নার কথাও মনে এল। এরা কি সত্যিকারের মানুষ? না আমার কল্পনা? যে লোকটা আজ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়েছে সে কি রাহুল গুহ না অন্য কেউ? এসব প্রশ্নের উত্তর আমি কোনদিন পাব না, কিন্তু ওই দুজনের কথা ভেবে আমার মনটা দুঃখে ভরে এল।। আমার গলা দিয়ে স্বর ফুটছিল না। কীসের যেন ডেলা আটকে গেছে গলায়। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম। দেখলাম চাঁদ উঠেছে, খুব বড় চাঁদ, আজ নিশ্চয়ই পূর্ণিমা। আকাশে কোন মেঘ নেই তাই এত তারা একসঙ্গে দেখতে পেলাম। ছোটবেলায় খোলা মাঠে শুয়ে আকাশে তারা দেখার কথা মনে পড়ে গেল। আমি আমার চোখটাকে স্থির করলাম একটা তারার দিকে তাকিয়ে। মনে মনে বললাম রাহুল গুহ আর অপর্নাকে আমি চিনিনা। আমি তাদের জানিনা কিন্তু আজ তারা আমার আপনজন। কোথায় তাদের বাসা আমার জানা নেই, জীবনকে ওরা ভালোবেসেছিল, কিন্তু জীবনের কাছ থেকে ওরা কিছু পায়নি। ওরা যেখানে থাকুক ভালো থাকুক। ওদের আত্মারা যেন শান্তি পায়। তোমরা ওদের দেখো।
অনেক দূরে দেখলাম একটা তারা খসে পড়ল, আমার মন অনেক হালকা মনে হল।
|