![]() |
||
|---|---|---|
| প্রথম পাতা | গল্প | |
|
অমিত গুপ্ত
দ্বিতীয় হামিদা বাই অথবা রুণী |
অন্যান্যদের গল্প
|
সঞ্জয় বলল – দ্বিতীয় হামিদা বাই-এর জীবনে সেই বাঁক এসেছিল উনিশ’শ একানব্বই- এর পয়লা মে। তখন ও পঞ্চদশী। দুহাজার এক সালে ওর বয়স ছাব্বিশ। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সোনা তিন রূপা সাত এবং ব্রোঞ্জ নয়। পঞ্চাশ ইঞ্চি চওড়া বুকে বাবা লোকনাথের লকেট। দুর্বল ও অসহায়কে মহাপুরূষরা রক্ষা করেন। মা ছোটবেলায় পড়িয়ে দিয়েছে। এখন অবশ্য দ্বিতীয় হামিদা বাইয়ের মত সবলা ভারতে নেই। কিন্তু বালিকা বয়সে ওর নাম ছিল রুদন্তী। খুব কাঁদতো দেখে জ্যাঠামশাই ওটা রেখেছিলেন। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যাভবনের প্রধান শিক্ষক। স্কুলের খাতায় যাই থাক সংক্ষেপে সবাই রুণী বলে ডাকতো। কালো লিকলিকে চেহায়া। দুই গালে চোখ থেকে চিবুক পর্যন্ত বেলে দাগ। চোত-বোশেখের শুকনো নদী খাতের মত। তা ক্লাস এইটে পড়া ছেলে-মেয়েরা কি রকম রহস্যময়। সমান-বয়সী খেলুরেরা হঠাৎ নারী ও পুরুষ এই দুটো দলে ভাগ হয়ে প্রকাশ্যে রেষারেষি ও তলে তলে মেশামেশি করে। কেউ কেউ ভীষন একা হয়ে যায়। যেমন রুণী। সেই পয়লা মে-র দুপুরে ও ধোবী তালাওয়ের গাছের ছায়ায় বসেছিল, এটা ওর প্রিয় জায়গা। রুণীর গায়ের রঙের মত কালচে জলে শালুক ফুটেছে। কি অবাক কান্ড! আগে তো ছিলনা। মেঘ না থাকায় আকাশ বড্ড উদোম দেখাচ্ছে। তাকালে চোখ ঝিমঝিম করে। মন উদাস করা নির্জনতা। তবে খুব পিঁপড়ে। জামার ভেতর পিঁপড়ে ঢুকে শুড়শুড়ি লাগায়, হাত ঢুকিয়ে চুলকে নেয়। এমন সময় সেই যুগান্তকারী জামের বিচি ছুটে এল ঠিক কোলের ওপর। আঘাত না লাগলেও জামায় নীল ছোপ ফেলেছে। প্রথমে ভাবলো পাখির কান্ড। কিন্তু মানুষের খিকখিক হাসি শুনে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে বিজন নামে সেই ছেলেটা যে পাড়ার অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ করে কিন্তু ওর দিকে কেউ ফিরেও চায় না। চেহারার কারণে রুণী সকলের অবহেলা সয়ে গেছে। সেই কারণে নিজের মধ্যে গুটিয়ে একলা থাকে। কথা বলে কম। আজ মুখ তুলে বিজনের দিকে লালচে চোখে তাকালো। ছেলেটা জাম চুষতে চুষতে নির্বিকার ভাবে শাপলা ফুল দেখছে। রুণী এমনিতে খুব শান্ত। কথা বলে খুব আস্তে। আজ উলটো পালটা কি ঘটে গেল ওর ভেতর। টান টান উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল – অসভ্য ইতর। বিজন মুখ ঘুরিয়ে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসলো – তুই যে ওখানে আছিস দেখতে পাইনি। ভাবলাম জলের ধারে লম্বা ঠ্যাং বক। রুণী ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল। তারপর চোখে চোখে চেয়ে চটাস করে একটা চড় মেরে বসল। বিজন প্রথমে হকচকিয়ে গেল। ভাবতেই পারেনি রুণীর মত দুবলা ভীরু মেয়ে এমন কান্ড করবে। কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে স্থির হয়ে কেমন অদ্ভুৎ চোখে দেখল ওকে। ফিরে এসে আলগোছে রুণীকে দু’হাতে জাপটে ধরে তুলে মুখের ওপর গরম নিশ্বাস ফেলে জলের কিনারায় নামিয়ে দিয়ে বলল – নে জামের দাগ ধুয়ে চান করে ওঠ। মেয়েটা জলে কাদায় অনেকক্ষন বসে থেকে থেকে সেই ভীষন প্রতিজ্ঞা করে ফেলল – ছেলেটাকে এই ডোবায় ঠেসে ধরে ঘোলা জল খাওয়াবে। নইলে, নইলে কি? ভেবে দেখল নইলে বিজনের স্পর্শের জ্বালা মিটবেনা। এই প্রথম রুণী কান্নাকাটি কিছু করল না। পণ করার পর বুক হালকা হলে ও দু’মাইল হেঁটে ছোট মাসির বাড়িতে উঠল। মেসো স্কুলের ব্যায়াম শিক্ষক। স্বাস্থ্য ভাল। ঠিক কিছু যে স্থির করে ভোরে গৃহত্যাগ করেছে তা নয়। আসলে এটাই ওর ভবিতব্য। খবর পেয়ে বাবা ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। কিন্তু রুণীর সাফ কথা – আমি এখানেই থাকব। ছোটমাসি যদি না চায় তো বলুক অন্য কোথাও চলে যাই। কিন্তু যতদিন ... যতদিন কি? ও জবাব দেয়নি। প্রতিজ্ঞা মনে মনে আছে - বিজন, বিজন, আমি তোমাকে পাঁজাকোলা করে শূন্যে ঘুরিয়ে জলে ঠেসে ধরব। মেসো চিন্ময় রায়ের হাত ধরে রুণি কায়া-সাধনা শুরু করল। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। কত অপমান, বাধা এবং কষ্ট স্বীকারের মধ্যে দিয়ে ওকে ধাপে ধাপে উঠতে হ’ল। প্রথমে জেলার ব্যায়াম সমিতি, নন্দ ঘোষের আখড়া, কোলকাতার নীলমনি দাসের দেহ গড়ার কারখানা। অবশেষে দিল্লীর বিখ্যাত আর্যশক্তি পিঠে তালিম নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক লড়াই জিতে দ্বিতীয় হামিদা বাই নামে পরিচিত হয়েছে। বাধাটা প্রথম ছোট মাসির কাছ থেকে এসেছিল। কুস্তি একা একা মহড়া দেওয়া যায় না। আর একজন লাগে। মেসো ওকে সে ব্যাপারে সাহায্য করে। নতুন শেখা চাইনিজ ক্র্যাব নামে একটা প্যাঁচের তালিম চলছিল - এমনভাবে জাপ্টে ধরা যা ছাড়ানো খুব শক্ত। মাসি ঘরে ঢুকে ওদের এ অবস্থায় দেখে রক্ত চোখে দুম দুম করে রান্নাঘরে চলে গেল। রাতে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার আওয়াজে রুণী খুব বিব্রত বোধ করল। ব্যাপার এত দূর গড়ালো যে পরদিন মা এসে হাজির। মেয়েকে আড়ালে নিয়ে বলল – তুই কি আমার বোনের সংসারে অশান্তি বাধাবার জন্য এসেছিস। রুণি হাসতে হাসতে বলল – মিছেমিছি আমার জন্য চিন্তা করছ মা। বিয়ে মানে তো সেই হাড়ি ঠেলা ঘর ঝাঁট দেওয়া বাচ্চার কাঁথা ধোয়া ওসব আমার দ্বারা হবে না। সমস্যা অবশ্য হয়েছিল, অন্যরকম। ডাক্তার-নার্স, শিক্ষক-ছাত্রী, বস-স্টেনোতে যে রকম চিরাচরিত জট পাকে। যে হাত ধরে তোলে তাকে ছুঁতে দিতে হয়। এই সব নিন্দা-মন্দ বাধা-বিপত্তি ওকে আটকে রাখতে পারল না। যত তাগড়া হচ্ছে তত জেদ বাড়ছে। প্রত্যেক রাতে শুয়ে শুয়ে বিজন নামে সেই ছেলেটার অপমানের কথা ভাবে আর সকালে উঠে আদা-ছোলার সঙ্গে ওর মুন্ডু চিবায়। এভাবেই চলছে। বলতে কি এটাই ওর চালিকা শক্তি। একটা একটা করে মেডেল গলায় ঝোলায় আর ও ভাবে শেষ সোনাটা বুকে দুলিয়ে বিজনের কাছে যাবে। খপ করে ধরবে। আকাশে ছুঁড়ে দিয়ে লোফালুফি করবে। শেষ মানে তো অলিম্পিক। তার অনেক আগেই ঘটনা ঘটে গেল। দিল্লী থেকে দিন সাতেকের জন্য কলকাতায় এসেছে। যুবভারতী থেকে হোটেলে ফেরার পথে আকাশ আঁধার করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। হাত দেখিয়ে ট্যাকসি থামিয়ে হুড়মুড় করে উঠে পড়ল। এবং কি আশ্চর্য, ওর চিরশত্রু বিজনকে দেখলো ড্রাইভারের আসনে। চমকে ওঠা বিদ্যুতের আলোয় মুখ একেকবার ঝলচে উঠে অন্ধকার হয়ে যায়। শহরের সমস্ত শব্দ ছাপিয়ে মেঘের কড়কড়াৎ। এই সেই যুবক যার কথা ও প্রতিদিন ভাবে। একটু পরে গাড়ি থামাতে বলে রুণী নেমে এসে পার্স খুলে টাকা দেওয়ার সময় ইচ্ছে করে আঙুলের ডগায় একটু ছুঁয়ে দেখল। সেই সেদিনের মতই শক খেল। মনে মনে বলল – বিজন, আমি সেই রুণী। আজ আবার পাঁজাকোলা করে তুলে ধরার চেষ্টা করে দেখবে নাকি? না। বিজন ওকে চিনতে পারেনি। হুশ করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
|
||