name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

 

অলোক গোস্বামী 
বসুধৈব 

অন্যান্যদের গল্প

অমিত গুপ্ত

অলোক গোস্বামী

মু. নূরুল হাসান

সুব্রত মজুমদার

 

প্রতিদিনের মত আজও জানালায় এসে দাঁড়িয়েছেন বনানী। চারটে বাজলেই কেন যে দক্ষিণের এই জানালায় এসে দাঁড়ান নিজেও জানেন না। রিমির স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার বাসরূট এদিকে নয়। যদি বা হোত তবু কি চারতলার এই জানালা দিয়ে বাসের ভেতর দেখা যেত! তবু দাঁড়ান বনানী। প্রিয়জনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যেস কি আর দশ বছরে পালটানো যায়! বিমির বাস এদিক দিয়ে না গেলেও ওদের স্কুলের কিছু মেয়ের বাড়ি এদিকেই। ওদের মধ্য দিয়ে বিমিকে দেখার একটা তৃপ্তি পাওয়া যায়।

প্রাত্যহিক এই বাতিক যথারীতি নজর এড়াতে পারেনি সহকর্মীদের। বনানী মিত্র না হয়ে অন্য কেউ হলে ভাবা হতো এ হোল অফিস কাটার ওয়ার্ম আপ। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই ভাবনা আসেনি। কেননা স্বামীর মৃত্যু বাবদে চাকরি পেলেও কোনও সুযোগ নেওয়া যার ধাতে নেই তাকে নিয়ে এধরণের মিথ্যে ভাবনা চলেনা। তবে রসিকতা চলে। কেউ বলে বৌদির হাওয়া খাওয়ার সময় হলো। কেউ জানতে চায়, বিকেল চারটের বাতাসে বিশুদ্ধতা বেশী থাকে কি না! কেউ কেউ আবার উপদেশ দেয়, ছাদে চলে যান বৌদি চারদিকের খাঁটি অক্সিজেন পাবেন। বনানী কোন উত্তর দেননা, শুধু হাসেন। উত্তর দেওয়ার মত যুক্তি তো নিজের কাছেও নেই। ব্যাপারটা যে হাস্যকর তা নিজের চেয়ে ভালো আর কে জানে!

আজও এসে দাঁড়িয়েছেন সেই একই জায়গায়। কিন্তু কেন জানি আজ রাস্তার বদলে চোখ চলে গিয়েছিল আকাশে! গ্রীলে বাঁধা ছোট্ট জানালা দিয়ে আকাশই বা কতটুকু ধরা পড়ে, তবু যেটুকু পড়েছিল তাতেই রীতিমত বিমোহিত দশা। যদিও এই দশার কারণ নিছকই আকাশ নয়। এসময় আকাশ এমনই থাকে। সমসময় মুখ ভার। রোদ্দুরের মুখ প্রায়দিনই দেখা যায় না। বনানীর ছোটবেলাতে এসময় রাতদিন বৃষ্টি পড়তো। হয়তো দশদিন পেরিয়ে গেছে তবু জল ঝরার বিরাম নেই। এমন শীত শীত লাগতো যে রাতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে হতো। জল জমার কারণে বন্ধ থাকতো স্কুল। ব্যস আর পায় কে! খাতার পাতা ছিঁড়ে ভাই বোনেদের নৌকো ভাসানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। কার নৌকো কতদূর যায়। বনানীর নৌকোগুলো কেন যেন বেশী দূর যেত না! খানিক এগিয়েই টালমাটাল শুরু হয়ে যেত। আর অবধারিত ছিল সেগুলোর ডুবে যাওয়া সেইসাথে ভাই বোনেদের কাছে অপদস্থ হওয়া। মন খারাপ নিয়ে উঠে যেত বনানী। ঘর বারান্দাময় মেলে দেওয়া জামাকাপড় গুলোর ভেতর দিয়ে এমনভাবে ঘুড়ে বেড়াতেন যেন মেঘের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। ভেজা জামা কাপড়ের সোঁদা গন্ধ বুক ভরে টেনে নিতে ভালো লাগতো খুউব। আবহাওয়ার চরিত্র ইদানিং বেশ পাল্টে গেছে, পরপর কদিন বৃষ্টির পর এমন টানা রোদ চলে, মনেই হয়না বর্ষাকাল চলছে। গরমে রীতিমত শরীরে ঘামাচি গজিয়ে ওঠে। তবে বহু বছর বাদে এবারই অঝোর বৃষ্টি ফিরে এসেছে এবং ধরণও বেশ অদ্ভুৎ! সকালের দিকে ঝকঝক করছে রোদ। তারপরই আচমকা ঘোলাটে হয়ে পড়ছে আকাশ। যত বেলা বাড়ছে তত কালো হয়ে আসছে চারপাশ। একেক সময় তো মনে হচ্ছে এই নেমে পড়লো বলে। অথচ সারা দিন ধরে চলছে মেঘেদের জল জমানোর প্রস্তুতি। নামছে ঠিক সন্ধ্যের মুখে। সন্ধ্যে থেকে শুরু হয়ে চলছে রাতভর। এখন আকাশ রীতিমত মস্ত শ্লেট। কিন্তু বনানীর চমক সে কারণে নয়। সেই শ্লেটের গায়ে কয়েকটা চিলকে ডানা স্থির রেখে পাক খেতে দেখে আর তারপরই জীবনান্দের কবিতার লাইন কয়েক মনে পড়ে যাওয়ায় এই বিমোহিত দশা।

যদিও এই দশা খুব সামান্য ক্ষণের জন্যেই। কেননা এরপরই নিজেকে ধমক দিয়েছেন বনানী, কাব্যি চর্চা করছো! চিল যদি কেঁদে কেঁদে ওড়ে, উড়ুক। তাতে তোমার কি হে? তোমার নিজের চোখের দশা জানো না ওদিকে অন্যের চোখ বেত ফলের মত কি না ভাবতে বসলে! হে বনানী দেব্যা, রাতারাতি এত স্মৃতভ্রংশ হলে যে হৃদয়ে বেদনা জাগানোর জন্য খোঁড়াখুড়ির প্রয়োজন হলো?

এই ধিক্কারেও নিজেকে সামলানো যাচ্ছেনা দেখে জানালা থেকেই সরে এলেন বনানী। কিন্তু অফিসের কেউ লক্ষ করেনিতো এই কবি কবি ভাব! আড়চোখে অন্য টেবিলগুলোর দিকে তাকাতে বনানীর চোখে পড়ে গেল দৃশ্যটা। আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠলো, আবার কী হলো! কোন একটা টেবিল ঘিরে এরকম জমায়েত তো শুধু দেখে আসছেন গত দশ বছর ধরে শোক সংবাদের ক্ষেত্রেই। পরিচিত কারো কোন ক্ষতি হলো নাতো!

জমায়েত যেহেতু বাদল দাসের টেবিল ঘিরে তাই সরাসরি তাঁকেই জিজ্ঞেস করলেন বনানী, কী হয়েছে?
- সীতেশ রায় মারা গেছেন ... আজ ভোরে ... খবরের কাগজে আসেনি ... এই মাত্রা জানা গেল ... সকাল বেলা স্ত্রী চায়ের কাপ নিয়ে ডাকতে গিয়ে ...।

বাদলের শোকগ্রস্ত মুখ, খাপছাড়া কথা বলার ঢঙে সব কেমন গুলিয়ে যায় বনানীর। মনে করতে পারেন না কে সীতেশ রায়! আশপাশের ব্রাঞ্চের কোন কর্মচারী, না কি জোনাল অফিসের কেউ! ইউনিয়ানের কোন পান্ডা নয়তো? এত সব চিন্তার কোন থই না পেয়ে অগত্যা চুপ করে থাকাই শ্রেয় মনে হয়।

যে কোন বিষয়ে সিরিয়াস বাদল খেয়াল করেনা বনানীর বিভ্রান্ত মুখ। একই রকম ভাবে বলে যায়, শহরের কৃত ... সরকারিভাবে নিশ্চয় কিছু একটা অনুষ্টান ... তবু আমাদের দায়িত্ব ... একবার আমাদের কালাচারাল ফাংশানে সভাপতি ... নাটকের শেষ অব্ধি দেখে তারপর ... ।
- তাই না কি, সীতেশ রায় এসেছিলেন আমাদের অফিস ফাংশানে! দারুণ ব্যাপার! আগে তো শুনিনি। কবে, কোন ইয়ারে! ঢপ নয়তো! উত্তেজনায় ছটপটিয়ে উঠে সুচরিতা মাঝপথেই থামিয়ে দেয় বাদলকে।

এ ধরণের ছ্যাবলামোকে অপছন্দ করা বাদল কিন্তু প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতেই তাকান সুচরিতার দিকে। হেসে বলেন, ঢপ মনে হচ্ছে? অবশ্য হওয়ারই কথা। নিজে না দেখলে হয়তো আমিও অমন কিছু ভাবতাম। তবে সেই ঘটনা ঘটেছিল। ঘটেছিল রামকানাইদার জন্য। দুজনে খুব বন্ধু ছিলেন। সীতেশ রায় এলে রামকানাইদার বাড়িতে যেতেনই। তাই না বউদি?

সুচরিতা জাপ্টে ধরে বনানীকে, তোমার ফ্রেন্ড ছিলেন সীতেশ রায়, এতদিন বলোনি! এত বড় একটা খবর চেপে গিয়েছিলে। তুমি কেমন মানুষ গো বউদি?

নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বনানী বললেন, আমার নয়, তোমাদের দাদার বন্ধু ছিলেন। যদিও আমার মনে নেই ও কে। কম তো বন্ধু বান্ধব আসেনি বাড়িতে, কত জনকে মনে রাখবো!
- বলো কি, অমন একজন সেলিব্রিটিকে গুলিয়ে ফেলছো অন্যদের সাথে? কবিতার কথা ছেড়েও যদি দাও, অমন নায়কের মত চেহারা খুব কমই চোখে পড়ে, কি করে পারলে ভুলে যেতে! জয়েন করার পর থেকে রামকানাইদা সম্পর্কে যা শুনেছি তাতে, স্যরি টু সে, তুমি বড্ড বেরসিক।

এতক্ষণে বনানী বুঝতে পারেন কবি সিতেশ রায়ের কথা হচ্চে। কী আশ্চর্য, একটু আগেই আকাশে চিলের ওড়া দেখতে দেখতে জীবনান্দের কবিতা মনে পড়ায় নিজের ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন, আর এখনই একজন কবির সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তাকেই সাক্ষী মানা হচ্ছে। কবেকার কথা সে সব। সব কি ছাই মনেও আছে ঠিকঠাক! বিয়ের পর থেকে স্বামীর অনেক পাগলামোর সাক্ষী যে তার পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা মনে রাখা সম্ভব?

সুচরিতার সার্টিফিকেটে রাগ করতেও পারলেন না বনানী। সত্যিই মেয়েটা এখনো ছেলেমানুষ রয়ে গেছে। হেসে বললেন, কী জানি বাবা, তোমাদের দাদার কোন নায়ক বন্ধুর কথা তো মনে পড়ে না।
- আমি একবার গিয়েছিলাম সীতেশ রায়ের সাথে দেখা করতে। নিছকই কিউরিসিটি। দেখা করে তো রীতিমত থ। বাপের বয়সী না হলে হয়তো প্রপোজ করেই বসতাম। ও রকম হাসি, কথা বলার ধরণ, বিশেষ করে অমন ইন্টেলিজেন্ট অথচ বিষন্ন চোখ আমি কোন পুরুষের দেখিনি। প্রনাম করতে গেলাম, বাধা দিলেন। হাত ধরে বললেন, আমি সুন্দরীদের প্রনাম নিই না। তাতে জীবন থেকে সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। একঘর লোকের সামনে আমার সে কী লজ্জা! তবু সত্যি বলতে আমার খারাপ লাগেনি। একেই তো পুরুষালী গলা, তার ওপর কথা বলার স্টাইলও এমন ছিল যে আমার শরীর থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছিল।

এবার বিরক্ত হলেন বনানী। মেয়েটি সত্যিই বাচাল। অফিসে ওর নামে যে নানা কথা চলে তাতে অন্যায় কিছু নেই। গায়ের রঙ কটা বলেই নিজেকে বিশ্বসুন্দরী মনে করে। যেন ওকে ফেরাতে পারে পৃথিবীতে তেমন কোন পুরুষই নেই। একেবারে বোকার হদ্দ। সবাই যে ওর বেহায়পনায় মজা পাচ্ছে সেদিকে খেয়ালই নেই। মুখ চোখের এমন ভঙ্গী যেন রাজ্য জয় করার কাহিনী শোনাচ্ছে। কে জানে এরপর কী বলে বসে! রামকানাই মিত্রের স্ত্রী হিসেবে অফিসে সবাই সম্মান করে। আজ বুঝি সেও ঘুচে যায়!

ঘড়ি দেখলেন বনানী। পাঁচটা বেজে পনেরো। রিক্সা পেয়ে বাড়ি যেতে যেতে ছ’টা পেরিয়ে যাবে। এরমধ্যে আচমকা বৃষ্টি নেমে গেলে অবস্থা আরও সাংঘাতিক হবে। তাই জটলা ছেড়ে টেবিলের দিকে এগোলেন।

- বাড়ি চললেন বৌদি? আমি আপনার সঙ্গে যাবো।
শ্যামলীর এহেন অনুরোধে রীতিমত বিরক্তই হলেন বনানী। এই মেয়েটাও আরেক চীজ। সুচরিতার একেবারে বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। এই বয়সের মেয়ে কী করে যে এত নিরাসক্ত থাকতে পারে বুঝে উঠে পারেন না বনানী। পাশের টেবিলে কাজ করে অথচ গল্প তো দূরস্থান দিনের পর দিন একটা কথাও হয় না। কাজের কথা ছাড়া কোনো বাড়তি কথা নেই। কেউ রসিকতা করলে বড়জোর একটু হাসি, তাও অতিকষ্টে, যেন তাতেও ক্ষতি হওয়ার ভয়। অফিসে ওর নামই হয়ে গিয়েছে মিস নিকষা। বনানীর অবশ্য এই নামকরণ রুচিহীন মনে হয়েছে। সারাদিন পরচর্চা কিংবা নায়ক নায়িকাদের কেচ্ছা নিয়ে কথা বলতে কারও ভালো না-ই লাগতে পারে। এতে অন্যায়ের কী আছে? শ্যামলী সুযোগ পেলেই বই পড়ে। স্বভাববিরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বনানী গায়ে পড়ে দেখেছেন সেই সব বইয়ের নাম। নিছকই চটুল গল্প উপন্যাস নয় সেসব। কবিতা তো বটেই প্রবন্ধের বইও পড়ে।

এতদিন শ্যামলীর পাঠতালিকার প্রতি শ্রদ্ধা রাখলেও ক্রমে বনানী স্পষ্ট বুঝতে পেরেছেন এসবই লোকদেখান। অন্যকে হেয় প্রতিপন্নের চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতক্ষণ সীতেশ রায়কে নিয়ে সারা অফিসে শোকের ঝড় বয়ে গেল, অথচ শ্যামলী একবারের জন্য ওঠেনি চেয়ার ছেড়ে। এমন ভঙ্গীতে টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে কাজ করছিল যেন অফিসে একমাত্র কাজের লোক সে, বাদবাকি সব ফাঁকিবাজ। সীতেশ রায় নামে কোনো এক এলেবেলে লোকের মৃত্যুর ছুতোয় সবাই যেখানে আড্ডা দিচ্ছে তখন তাকেই সব কাজ উঠিয়ে দিয়ে যেতে হবে। বই যার এত প্রিয় সে লেখকের মৃত্যু সংবাদে নিস্পৃহ থাকে কীভাবে!

কৌতুহল আজ কেন যেন চেপে রাখতে পারলেন না বনানী। রিক্সায় উঠতে উঠতে বলেই বসলেন, শুনেছো, কবি সীতেশ রায় মারা গেছেন?

উত্তর দিল না শ্যামলী। পরিবর্তে সেই বহুকষ্টের হাসি। বিরক্তিতে গা গুলিয়ে উঠলো বনানীর। নিজেকে কি মনে করে মেয়েটা, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইন্টেলেকচুয়াল? যেন কোন বিষয়ে নিরাসক্ত থাকায় ব্যক্তিত্বের প্রকাশ মনে করে। এভাবে শ্রদ্ধা আদায় করা যায়! বনানী সবার সাথে মিলেমিশে চলেন, কই কেউ তো তাকে অশ্রদ্ধা করার সাহস পায় না।

বনানীকে আচমকা গম্ভীর হয়ে যেতে কে জানে কি বুঝলো শ্যামলী। হাসি মেশানো গলায় বললো, কবি সীতেশ রায় মারা যায়নি বৌদি, যেতে পারেন না।

অবাক চোখে তাকালেন বনানী। শ্যামলী কি ব্যঙ্গ করছে? তার মুখে কবির কথা শুনে ভাবছে, ভূতের মুখে রাম নাম! বনানী মিত্র সম্পর্কে কতটুকু জানে এই মিস নিকষা? যদি না জানে তবু অফিসে বাদলের কথাগুলো নিশ্চয় শুনেছে। ওরা তো উচ্চস্বরেই কথা বলছিল। এই মেয়েটা কানে শোনেনা না কি!

- কবিতার মধ্য দিয়ে কবি বেঁচে থাকেন হাজার বছর কিংবা তার চেয়েও বেশী। তাই ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে, কবির নয়। কবিকে নিছক ব্যক্তি হিসেবে না দেখাই ভালো বৌদি, তাতে দুঃখ পেতে হয়। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কবিকে খুঁজোনা তার জীবনচরিতে।

শ্যামলীর গুরুঠাকুর মার্কা কথায় বিরক্ত হলেন বনানী। বোকা ঠাউরে জ্ঞান দিচ্ছে মিস নিকষা। কবিরা মানুষ নয়। তাদের মা, বোন, প্রেমিকা থাকবেনা। সামাজিক না হলে সেই কবি কীভাবে সমাজকে ভালোবাসার রসদ যোগাবে!

কথা বললে পাছে রূঢ় হয়ে পড়েন, শ্যামলী যদি ভাবে রিক্সায় নিয়ে যাবার সুযোগে খারাপ ব্যবহার করছেন তাহলে খুব খারাপ হবে, তাই সারা পথ কোনো কথাই বললেন না বনানী। কে জানে তাতেও শ্যামলীর খারাপ লাগলো কি না। নাহলে নেমে ভাড়া দিতে চাইবে কেন? বনানীকে তো আরও দূর যেতে হবে। তাছাড়া রিক্সা তারই ভাড়া নেওয়া।

খুব বেশি চাপাচাপি করলো না শ্যামলী। বনানীর আপত্তি মেনে নিলো। আর এটা যে নিছকই সুযোগ নেওয়া নয় যেন সেটা প্রমান করার জন্য যাবার সময় ফাঁস করে গেল একটা গোপন তথ্য, আমি কিন্তু ব্যক্তি সীতেশ রায়কেও চিনতাম। একটা কবিতার বইও আমাকে উনি উৎসর্গ করেছিলেন। কথাটা বলিনি কাউকে কোনদিন, শুধু আপনাকে বলবো বলেই আজ একসঙ্গে এলাম।

হেসে ফেললেন বনানী। বহুকষ্টে নিজেকে চেপে রেখেছিলেন। সত্যিই মেয়েটার নিজের সম্পর্কে খুব ভুল ধারণা। সীতেশ রায় মারা গেছে শুনে নিজের দর বাড়াচ্ছে। লাভ হবে না। এই শুকনো কাঠের দিকে কোনো পুরুষ মানুষই ফিরে তাকাবে কি না সন্দেহ, সেখানে সীতেশ রায়ের মত সুপুরুষ, সেলিব্রিটি, সৌন্দর্যের পূজারী একে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল? শুধু মুগ্ধতা নয়, বইও উৎসর্গ করেছিল! ভাবা যায়?

বাদল বলেছিল আজ সকালেই মারা গেছে সীতেশ রায়। ওরকম কোন ব্যক্তিত্বকে নিশ্চয়ই সাত তাড়াতাড়ি পুড়িয়ে ফেলা হয়নি, সবাইকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ মানুষটার আত্মার তো দূরস্থান, এখনো মৃতদেহেরই সদ্গতি হয়নি, অথচ তার আগেই শুরু হয়ে গেল গুজব রটানো!

বিষাদ মাখা চোখে শ্যামলী জিজ্ঞেস করলো, বিশ্বাস হচ্ছেনা তাই না?

এমন আজগুবি কথা কোন পাগলেই বা বিশ্বাস করবে? যদি বা করেও কেউ সেই তালিকায় বনানী মিত্রের নাম অন্তঃত রাখবে না। আর সেটা পরিস্কার বুঝিয়ে দিতেই অভদ্রতা হচ্ছে জেনেও শ্যামলীর দিকে ব্যঙ্গের হাসি ছুঁড়ে দিতে দ্বিধা দেখালেন না।

- কাল টিফিনে একটু ছাদে আসবেন, বইটা দেখাবো।

পেছন থেকে শ্যামলীর করুণ আবেদন ভেসে আসা সত্ত্বেও ঘাড় ঘোরানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না বনানী।



- এত দেরী করলে মা! শীগগীর এসো।

গেট খোলার আগেই বিমিকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে ঘাবড়ে গেলেন বনানী। স্কুলে কিছু হয়নিতো? কিংবা বাসে! কো-এড স্কুল, ছেলে মেয়েরা একসঙ্গেই যাতায়াত করে। এই বয়সে নানা রকম দুষ্টু বুদ্ধি মাথা চাড়া দেয়। যদিও মেয়েকে সব কিছু খোলাখুলি বুঝিয়েছেন, তবু আজকাল যে সব ঘটনার কথা কানে আসে তাতে নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। কিছু একটা অঘটন যদি ঘটে যায় সবাই বলবে বাপ মরা মেয়ের দিকে মা খেয়াল রাখেনি। রামকানাইয়ের অসুস্থতার সময় আত্মীয় স্বজনদের যে ভূমিকা দেখেছিলেন তাতে আর যোগাযোগ রাখার স্পৃহা হয়নি বনানীর। তারা মুখিয়েই আছে প্রকৃত সুযোগের অপেক্ষায়। সুযোগ পেলে একবারের জন্যও ভাববেনা অফিস, সংসারের ঝুট-ঝামেলা মিটিয়ে পঁয়ত্রিশের বিধবা কীভাবে পাঁচ বছরের মেয়েকে পনেরো অবধি টেনে নিয়ে এলো, আর নিজেও কীভাবে পৌঁছে গেল পঁয়তাল্লিশের কোঠায়! আত্মীয়দের কথা বাদ দিলেও, নিজেকে কি বলবেন বনানী? রামকানাই যখন বুঝে গিয়েছিলেন অসুখ সারবার নয় তখন একেবারে শান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। শত যন্ত্রনাতেও মুখে টুঁ শব্দটুকুও ছিল না। শুধু একরাতে বনানীর হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, যদি প্রয়োজন হয় বিয়ে করতে পারো। আমার আপত্তি নেই। শুধু নিজের সুখের পাশাপাশি মেয়ের শান্তিও দেখো। অত দুঃখেও হেসে ফেলেছিলেন বনানী। বলেছিলেন, নাটক নভেল পড়ে পড়ে মাথা গেছে তোমার। সুস্থ হয়ে উঠলে পাগলের ডাক্তার দেখিয়ে আনতে হবে।

হাত ছেড়ে দিয়েছিলেন রামকানাই। বিড়বিড় করে বলেছিলেন, কোনো অসম্মানজনক সম্পর্কে নিজেকে কখনো জড়িওনা। তাহলে আমার আত্মার শান্তি হবে না। সে রাতে বিকার ভেবে ঐ কথাকে উড়িয়ে দিলেও পরবর্তিতে অনেক ভেবেছেন বনানী। কেন বলেছিলেন রামকানাই অমন কথা? কোন সম্পর্ককে অসম্মানজনক ভেবেছিলেন!

ছুটে এসে গেট খুলে দিতে দিতে বিমি বললো, সীতেশ কাকু মারা গেছেন মা।
যাক, তেমন কিছু ঘটেনি। তবুও স্বস্তির পরিবর্তে বিরক্ত হলেন বনানী। আবার সীতেশ রায়। অফিসে, রিক্সায় এনিয়ে অনেক ফালতু কথা শুনতে হয়েছে, এখন বাড়িতেও!

- তুই জানলি কি করে?
- বারে, খবর পাওয়া মাত্র স্কুল ছুটি হয়ে গেল। এমন কী সীতেশ কাকুর জন্য প্রেয়ার হলে ওয়ান মিনিট সাইলেন্স পর্যন্ত হয়েছে।

স্কুলের ভন্ডামোতে শরীর রী রী করে উঠলো বনানীর। ইংরেজী মিডিয়ামের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে গুচ্ছের টাকা নিলে কী হবে, মানসিকতা সেই বাংলা মিডিয়ামের মতই। ছুতোনাতায় খালি ফাঁকি দেওয়ার ধান্দা।

- তোদের স্কুলের ছেলেমেয়েরা জানে সীতেশ রায়ের নাম? পড়েছে কোনো লেখা?
- পড়েছে কি না বলতে পারবো না, তবে নামতো শুনেইছে। আমার নাম সীতেশ কাকু রেখেছিলেন শুন হোল স্কুল তো বটেই, ইভন টিচাররাও আমাকে অবাক হয়ে দেখছিলো। আমার হেভি গর্ব হচ্ছিলো মা। মিস মিত্রা আমাকে যখন জিজ্ঞেস করলেন সীতেশ আমাদের বাড়িতে আসতেন কি না, আমি ডাটসে বলে দিলাম, অফকোর্স। ইদানিং কাজের চাপে আসতে পারতেন না, তবে রেগুলার ফোনে খোঁজখবর নিতেন।

আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না বনানী। সপাটে চড় কষালেন মেয়ের গালে। আচমকা আক্রমণে হতভম্ভ হয়ে গেল বিমি। সেটাই স্বাভাবিক। শেষ কবে মায়ের কাছে মার খেয়েছে মনে নেই। তার ওপর চড়ে বিষ খুব একটা কম ছিল না। তবু একটা কথাও না বলে পড়ার ঘরে চলে গেল।

কোনোদিনই কারও গায়ে হাত তোলার মানসিকতা নেই বনানীর। আর মেয়েকে মারার তো প্রশ্নই ওঠেনা। কিন্তু আজ সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে বিমি। এই বয়সে এত ওপর চালাকি শিখে গেছে। মর্যাদা বোধটুকু পর্যন্ত খুইয়ে বসেছে? বাপের মৃত্যুর সময় না হয় ছোট ছিল, কিন্তু আজ তো যথেষ্ঠ বড় হয়েছে। এখন তো বুঝতে পারা উচিত কীভাবে লড়াই করে প্রতিনিয়ত চলতে হয় বনানীকে। সেই লড়াইয়ের জন্য গর্ব বোধ করার বদলে অন্যের জনপ্রিয়তা ভাঙিয়ে নিজেকে তুলে ধরতে চায়? তাও আবার এক স্বার্থপরের নাম জড়িয়ে!

প্রথম যখন বন্ধুর অসুস্থতার কথা জেনেছিল, বাপরে সে কী অভিনয়! কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, তুমি ঘাবড়ে যেওনা বনী। আমি আছি তোমার পাশে। যে কোন প্রয়োজনে আমাকে ডাকতে দ্বিধা কোরনা। ছলনা সেদিন সত্যিই ধরতে পারেননি বনানী। জোর করে নিজেকে দৃঢ় দেখানোর মুখোস সামান্য সহানুভূতির আলতো টোকায় খসে গিয়েছিল। চোখের জলে ভেসে যেতে যেতে বলেছিলেন, তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো। তুমিই তো আমার ভরসা। তোমাকে পাশে না পেলে আমিও মরে যাবো।

পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছিল সেই ভন্ড। ভেজা গলায় বলেছিল, এমন কথা আর কোনোদিন বোলোনা। আমি সইতে পারি না।
কিছুদিন খোঁজখবর নিয়েছিল বটে, তবে তা ছিল নিতান্তই দায়সারা। তাতে বন্ধুর অসুস্থতা নিয়ে কোনো কথাই থাকতো না। রামকানাই অস্থির হতেন বন্ধুর সাথে কথা বলার জন্য। স্ত্রীর ওপর ভরসা রাখতে পারতেন না। ভাবতেন, ভুল চিকিৎসা চলছে হয়তো সেজন্যই সুস্থ হতে এত দেরী হচ্ছে। সীতেশ তো এখন ওপরতলার লোক, নামী ডাক্তারদের সাথে ওঠাবসা। ওদের সাথে করুক না পরামর্শ।

মরণাপন্ন সেই মানুষের এহেন বাঁচার আকুলতাকে অক্লেশে এড়িয়ে যেত ঐ স্বার্থপর। বলতো, আমি তো শুধু তোমার গলা শোনার জন্য ফোন করি বনী। ফোনের ভেতর দিয়ে ভেসে আসা তোমার কন্ঠস্বর আমার কাছে দৈববানীর মতো মনে হয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অজস্র কবিতা লাইন। সেগুলো আমাকে ঘিরে নাচতে থাকে। ওদের ভেতর তোমার শরীর স্পষ্ট দেখতে পাই। এরপর পাতার পর পাতা লিখে ফেলতে কষ্ট হয় না। তার বদলে যদি রোগের ফিরিস্তি, যন্ত্রণা আর ওষুধের কথা শুনতে হয়, তাহলে যে আমিও পাগল হয়ে যাব বনী।

রামকানাইকে নিয়ে যখন কোলকাতা যেতে হোল সব ব্যবস্থা সীতেশ রায়ই করে দিয়েছিল বটে তবে একদিনও দেখা করতে আসেনি। এদিকে সীতেশ ছাড়া অন্য কারও সাথে কথা বলার মতো মর্জি নেই রামকানাইয়ের। সীতেশকে কেন ফোন করা হচ্ছেনা, তা নিয়ে বনানীর সঙ্গে ঝগড়া করে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন।

বাধ্য হয়ে ফোন করেছিলেন বনানী। বেশীক্ষণ কথা হয়নি। সীতেশ রায় তখন বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। স্টেট্‌সে কবিতা পাঠের আমন্ত্রণ ছিল। বড় দুর্লভ সম্মান, এর আগে কোনো বাঙালী কবি পায়নি। বনানী শুধু শুভেচ্ছাটুকুই জানাতে পেরেছিলেন।

এরপরের বছরগুলোতে তো শুধু ঝোড়ো হাওয়ার তান্ডব। সেই হাওয়ার মুখে বেসামাল বনানীর অসুস্থ স্বামী আর মেয়ের হাত ধরে মুম্বাই, চেন্নাই, বাঙ্গালোরে ছিটকে পড়া। তখন খবরের কাগজ পড়ার বিলাসিতারও সময় নেই। তাই জানা হয়নি কোন কোন শহরে গিয়েছিলেন কবি সীতেশ রায়, সেখানে কেমন সম্মান পেয়েছিলেন, দেশেই বা ফিরে এসেছিলেন কবে।

স্নান সেরে চায়ের জল চাপালেন বনানী। একটানা বৃষ্টির দরুণ গরম তো নেই বরং বাতাসে ঠান্ডা ভাব আছে। সন্ধ্যের মুখে স্নান করায় শরীরও বেশ ম্যাজম্যাজ করছে। তবু স্নান জরুরী ছিল। কিছুতেই নিজেকে ঠান্ডা করা যাচ্ছিল না। এই প্রক্রিয়ায় শরীর খারাপ হলেও কাজ দিয়েছে বেশ। ঠান্ডা জলের ধারা মাথায় ঢালতে ঢালতে বিমির জন্য কষ্টই পেয়েছেন। ওইটুকু মেয়ের কী দোষ। সীতেশ রায়ের মতো কেউ মেয়ের নাম রাখছে দেখে বনানীই কি সেদিন কম খুশী হয়েছিলেন। সীতেশ বলেছিলেন, এমন একটা লোকের পাল্লায় পড়ে তোমার নিজের জীবন নষ্ট হয়ে গেল। তোমার মেয়ের বেলায় তা হতে দেবনা। সব সাফল্য এসে ওর পদচুম্বন করবে। সেই সাফল্যে যেহেতু তোমারও ভাগ আছে তাই ওর নাম দিলাম বিম্বিতা। তোমাকেই বিম্বিত করবে ও।

লজ্জামাখা গলায় সেদিন বনানী যতই বলুন, আহা কী এমন গুণ আছে আমার। কবিদের সবকিছু বাড়িয়ে বলা স্বভাব। তবু রামকানাইকে চাপ দিয়ে বার্থ সার্টিফিকেটে নাম পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিলেন। আর রামকানাইও নামকরণের তাৎপর্য না জানতে চেয়ে নিজের রাখা হাস্নুহানা নাম অক্লেশে বাতিল করে দিয়েছিলেন।

চায়ের কাপ হাত ফের বসার ঘরে এসে বনানী দেখলেন বিমি টিভি চালিয়ে দেখছে। যাকে কোনোদিন পড়াশোনা নিয়ে চাপাচাপি করতে হয়নি তার আজ এহেন আচরণে অবাক হলেও রেগে উঠলেন না বনানী। আলতো করে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। চমকে উঠলো বিমি। ফ্যাকাসে মুখে বললো, খবর শুনেই বন্ধ করে দেব মা। আবার অবাক হলেন বিমি। টিভি খুলেই যে মেয়ে কার্টুন দেখে তার মুখে খবরের কথা শুনলে অবাক হওয়ারই কথা। কী আছে আজকের খবরে। কথা না বাড়িয়ে মৃদু হেসে মেয়ের পাশে বসলেন।

রাজনীতি সংক্রান্ত দু-একটা খবরের পরই জানানো হলো সীতেশ রায়ের মৃত্যু সংবাদ। এতক্ষণে বনানী বুঝলেন মেয়ের খবর দেখার কারণ। আড়চোখে তাকালেন। বিমি নিবিষ্ট মনে দেখে চলেছে। কী দেখছে। এত আগ্রহ কেন সীতেশ রায়কে নিয়ে! বোধবুদ্ধি হওয়ার পর যাকে চোখে দেখেনি তার বাঁচা মরায় কী আসে যায় ওর? এই প্রজন্ম তো ক্রিকেটার আর ফিল্ম স্টার ছাড়া আর কাউকে নিয়ে তেমন মাতামাতি করে না!

সীতেশ রায়ের স্ত্রীকে টিভির পর্দায় দেখে মেয়ের চোখ থেকে চোখ সরালেন বনানী। কোনোদিন দেখা হয়নি ভদ্রমহিলাকে। এমন কী ওর বিষয়ে কথা উঠলে গম্ভীর হয়ে যেতেন সীতেশ। বনানী তবু বলেছিলেন, এক বার নিলে এলে পারেন বৌদিকে।

সীতেশ বলেছিলেন, আমি তো সাহিত্য অনুষ্ঠানে আসি। তোমার বৌদি এসব পছন্দ করেন না। কবির স্ত্রী হিসেবে যিনি সকলের ঈর্ষার পাত্রী, তিনি সাহিত্য অনুষ্ঠান পছন্দ করেন না! এরপর কথা বাড়ানো যেহেতু রুচিহীনতার পরিচয় তাই কথা বাড়াননি বনানী। আজ কৌতুহল নিয়ে দেখতে থাকলেন সীতেশ রায়ের স্ত্রীকে। মাঝারি দৈর্ঘ্য। তবে ফিগার সুন্দর। লাবণ্যমাখা মুখ। ববকাট চুলের দরুণ বয়স বেশ কম দেখাচ্ছে। কথা বলার ভঙ্গীও বেশ আদুরে। এমন মমতা ভরে সীতেশের কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, দেখে যে কারও মনে হবে, আহা কী পতিব্রতা মহিলা। অভিনেতা মানুষের অভিনেত্রি বৌ। এরপরের দৃশ্যগুলো আরও বিরক্ত করলো বনানীকে। একের পর এক মানুষ মৃতদেহে ফুল দিতে এসে এমন ঢঙে কান্নাকাটি করছে যেন পুরুষগুলোর বাপ মরেছে আর মহিলাগুলোর স্বামী। পাছে রাগ আবার চেপে বসে তাই উঠে গেলেন। রান্নাঘরে কাজ করতে করতে শুনলেন শোকার্ত মানুষগুলোর বিলাপ। সবার বক্তব্যই মোটামুটি এক। খুব বড় মাপের মানুষ ছিলেন সীতেশ রায়। সবাইকে ভীষন ভালোবাসতেন। শ্যামলী আর সুচরিতার মুখ মনে পড়ায় একা একাই হাসলেন বনানী।

আচমকা সীতেশ রায়ের গলা শুনে কৌতুহল চাপতে পারলেন না বনানী। রান্নাঘর ছেড়ে ফের এসে দাঁড়ালেন টিভির সামনে। ফাইল শট দেখাচ্ছে। কবে রেকর্ড করা কে জানে। বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবীতে দারুণ দেখাচ্ছে সীতেশকে। হাসিমুখে উত্তর দিচ্ছেন। বনানী খেয়াল করলেন সীতেশের গালের টোল এই বয়সেও চমৎকার ছিল। যে মেয়েটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিল সে একেবারে বিশ্বনেকি। প্রশ্নের বদলে সীতেশ রায়ের গায়ে ঢলে পড়তেই যেন বেশি আগ্রহ। ন্যাকা গলায় জিজ্ঞেস করলো, আপনার নারী ভাগ্য তো ঈর্ষনীয়। এনিয়ে ঝামেলায় পড়েননি কখনও?

দুষ্টু হাসি দিয়ে সীতেশ বললেন, নারী ভাগ্য ঈর্ষনীয় কিনা জানিনা, তবে ভালো তা স্বীকার করছি। আমার স্ত্রীর তুলনা হয়না।

সাক্ষাৎকারিণী এমন দুলে উঠলো যেন ভেঙে পড়বে, না না আপনি কথা এড়াবেন না। নারী বলতে আমি স্ত্রীর কথা বলিনি। আবার সীতেশের মুখে সেই দুষ্টু হাসি, ওহ স্ত্রী নারী নয়! ঐ যে কার কবিতায় আছে যেন, এই পৃথিবীর সবখানে আমার কবর পাওয়া যাবে। যেখানে যত সুন্দরী দেখেছি সেখানেই মরেছি। কিন্তু ভাই আমার তো তেমন কেস নেই। আমার কবর আমার বাড়িতেই। স্যরি, তোমাকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে স্ত্রীকে অসম্মান করতে পারছিনা।
- তাহলে আপনার পাঠকের চেয়ে পাঠিকার সংখ্যা বেশি কেন?
- পাঠক না পাঠিকা বেশী তা বলতে পারবো না। তবে এটুকু বলি, কবিতা মূলতঃ হৃদয়ের নিজস্ব জিনিষ। কবির হৃদয় যদি পাষাণ হয় তবে কবিতা লিখবেন কীভাবে! তাই নিজের ভেতর প্রেমিক সত্ত্বা বাঁচিয়ে রাখতেই হয়। নিজের হৃদয় দিয়ে ছুঁয়ে যেতে হয় অনেকের হৃদয়। সেসব পড়ে অনেকে ভাবেন বুঝি তার কথা ভেবেই কবিতা লেখা হয়েছে। এই কবি তার নিজস্ব সম্পত্তি। কিন্তু এই ভাবনা ভুল। সবই যেহেতু সৃষ্টির স্বার্থ, তাই সুখ-দুঃখে আঁকড়ে ধরা উচিৎ কবিতাকে। কবিকে নয়। নাহলে দুঃখ পেতে হবে। কেননা কবিকে কোথাও বেঁধে যায়না। সত্যিকারের কবি কোথাও বাঁধা পড়েন না।


রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিও শুরু হলো। আগামীকাল বিমির স্কুল ছুটি। আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে। এখন পড়াশোনার তেমন চাপ না থাকায় বনানীও আপত্তি করেননি।
- মা একটা কথা বলবো, রাগ করবেনা তো?

মেয়ের কথায় বুক কেঁপে উঠলো বনানীর। কী জিজ্ঞেস করতে চায় বিমি! সেই জন্যই কি আজ তাড়াতাড়ি শুতে এসেছে?
- আমি কিন্তু তখন মিথ্যে কথা বলিনি মা। সীতেশ কাকু সত্যিই একদিন ফোন করেছিলেন।
ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন বনানী, কবে! বলিসনি কেন?
ফের চড় খেতে হবে ভেবে ভয়ার্ত গলায় বিমি বললো, বেশ কদিন আগে। উনি বলতে নিষেধ করেছিলেন। রীতিমত প্রমিস করিয়ে নিয়েছিলেন। অতবড় একজন লোকের কথা ফেলতে পারিনি মা।
- কী বললো?
বনানীর কন্ঠস্বরে বিমি বোধহয় বুঝলো তেমন ভয়ের কিছু নেই, তাই নিজেও উঠে বসে বললো, খুব ফানি লোক। আমায় বলে কিনা সীতেশ বলে ডাকতে, কাকু নয়। আমি বললাম, ধুর তাই হয়। তুমি আমার বাপীর বয়সী। তাতে বলে, তোমার বাপী আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট ছিলেন।
- আর কী &#