name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

 

 

 

অলোক গোস্বামী

হেমন্তের নরম উৎসব

 

 

 

অন্যান্যদের গল্প

অলোক গোস্বামী

আনোয়ার সাদাত শিমুল

দেবাশিস চক্রবর্তী

বিপুল দাস

শিবাশীষ রায়

শুভময় সরকার

।।১।।
আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে ----------------।

সুরটা শুনেই গা পিত্তি জ্বলে উঠলো পূর্ণেন্দু তলাপাত্রের। এই এক নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে। রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে যখন খুশি তখন, আশপাশের কোমর বন্ধনী কিংবা বুক পকেট থেকে মুঠো মুঠো আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে বাতাসে।

সত্যি বলতে কি, প্রথম দিন খারাপ লাগেনি শুনতে। যদিও কাটাকাটা সুর, কেমন যেন আধো আধো। তবু একবার শুনেই চিনতে পেরেছিলেন গানটা। সত্যজিত রায়ের সিনেমার গান। এক সময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

প্রথমদিন শুনে আচমকাই মনে হয়েছিল কে বাজিয়েছে এই সুর, বটুক নন্দী? অবশ্য একটু খেয়াল করেই নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। গীটারে বাজানো নয়। তাহলে আরও প্রানবন্ত হতো। এমন যান্ত্রিক শোনাতো না। যদিও মোবাইল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা নেই, তবু মনে হয়েছিল গীটারে নিশ্চয়ই মোবাইলের রিং টোন বাজানো যায়না।

তাহলে হঠাৎ বটুক নন্দীর নাম মনে পড়েছিল কেন? ভেবেছেন পূর্ণেন্দু। যেটুকু থই পেয়েছেন সেটা হলো লঘু সঙ্গীত সুর শুনেই মনে পড়েছিল। একদা কোন কোন দুপুরে কিংবা রাতে রেডিওর নব ঘোরালেই ঝর্ণার মত মান্না, সন্ধ্যা, বনশ্রীর গানের সুর বেজে উঠতো। সেই বাজনার প্রতিটি স্ট্রোক এতোটাই নিখুঁত থাকতো, মনে হতো যে মূল গানই বাজছে। বাজনা শেষ হলে ঘোষিত হতো, এতক্ষন গীটারে লঘু সঙ্গীতের সুর বাজিয়ে শোনালে বটুক নন্দী।

যেদিন অনির মোবাইলেও সেই সুর বেজে উঠতে শুনেছিলেন, ভালো লেগেছিল। যাক, ছেলেটার সুর বোধ আছে। মাথা ধরানো শব্দের চেয়ে বরং এটা বেশ ভালো। কিন্তু আজ এই সুর যেন শরীরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই পড়ন্ত বিকেলে, রোদের রং যখন নিভে আসা আগুনের সমতুল্য, এই দশায় সুরটা যেন নুন-মরিচের ছিটে। মাঝ রাস্তায় এখন যদি শ্রীযুক্ত পূর্ণেন্দু তলাপাত্র, রাজ্য সরকারের আধা পদস্থ কর্মচারী, দুহাত মুঠো করে শূন্যে ঝাঁকিয়ে বলেন, কীসের এত আনন্দ হে? কোন আকাশ বাতাসে এত আনন্দ ঘুরে বেড়াচ্ছে? এই যে আমার পাশে হেঁটে চলেছে ষোল বছরের এক কিশোর, যার বুক পকেটেও আপনাদের মত আনন্দের উৎস সে ঠিক করে ফেলেছে আত্মহত্যা করবে। আর আমি হতভাগ্য এক বাপ ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি। ছেলেকে কষে থাপ্পর কিংবা সরাসরি কথা, কোনটাই করতে পারছিনা।

কথাটা চিন্তা করে মনে মনে জিভ কাটলেন পূর্ণেন্দু। দুশ্চিন্তায় শেষ পর্যন্ত মাথা খারাপ হতে চলেছে নাকি? এধরনের উদ্ভট চিন্তাকে একদম প্রশ্রয় দেওয়া উচিৎ নয়, তাহলে আর দেখতে হবেনা। পাগল ভেবে মজা দেখার নেশায় ভিড় জমে উঠবে। আর তখনই, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসব অনির্বান। তারপর কোন মুখে বাড়ি ফিরবেন পূর্ণেন্দু? বিভা পইপই করে সাবধান করে দিয়েছেন, মনে আঘাত দেবেনা একদম। একেই তোমাদের বাপ ছেলের দূরত্ব বাড়তে বাড়তে মহাসাগর হয়ে গিয়েছে ---।

পৃথিবীর দীর্ঘতম সেতু কোনটা? মনে পড়েনি পূর্ণেন্দু। ভারতের দীর্ঘতম বোধহয় শোন নদীর সেতু। অবশ্য ইতিমধ্যে যদি সেই রেকর্ড ভেঙে গিয়ে না থাকে। আর যদি ভেঙেও থাকে তবে সেই রেকর্ড ভাঙা সেতু নিশ্চয়ই কোন মহাসাগরের দু'কূলকে একাকার করেনি! পূর্ণেন্দু কি পারবেন এই মধ্য পঞ্চাশে অসম্ভবকে সম্ভব করতে? কীভাবে?
- ওকে ইরিটেট কোরনা। জানোই তো কী রকম জেদী? যাকে বলে বাপকা বেটা।

ছেলে সম্পর্কে বিভার বরাবর শুনিয়ে আসা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ আবার শুনতে শুনতে অবাক হয়েছেন পূর্ণেন্দু, তিনি কি জেদী? ছেলের মত! একটা ঘটনাতো স্পষ্ট মনে আছে। সেবার অনি ক্লাস সিক্স। কেউ একজন এসে প্রশংসা করছিল অনির। নিজের ছেলেকে খাটো করে অনিকে প্রায় মহাপুরুষ বানিয়ে তুলছিল। মুগ্ধ ভঙ্গিতে বিভা আর অনি গিলছিল সেইসব কথাবার্তা। গোটা পবর্টাই অস্বস্তিকর লাগছিল পূর্ণেন্দুর। বক্তা যখন পড়াশোনার প্রসঙ্গে ঢুকল তখন আর নিজেকে চেপে রাখতে পারেননি। মৃদু আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, না না অনি পড়াশোনায় তেমন আহামরি কিছু নয়।

সেবার ফার্স্ট টার্মে প্রায় প্রতিটি বিষয়ে ফেল করেছিল অনি। কারণ জানতে চেয়ে স্কুল থেকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল অভিভাবককে। কিন্তু কারণটা জানলে তো বিভা জানাবে। জানা গিয়েছিল পরে। মা-কে ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল, বাবা আমার রেজাল্ট জানিয়েছে সেদিনের আঙ্কেলকে?
বিভা অবাক হয়েছিলেন, কেন!
- না হলে উনি বাবাকে লায়ার ভাববেন।

পূর্ণেন্দু কি পেরেছেন কোনদিন এত মূল্য দিয়ে নিজের জেদ বজায় রাখতে? গত আঠারো বছরের ইতিহাসে আছে তেমন প্রমান? না কি ইংরেজীতে কম্পার্টমেন্টাল পেয়ে পাশ করার দরুণ বিভা সঠিক শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন নি? শব্দটা হওয়া উচিত ছিল 'ইরিগেট'। বাপ ছেলের প্রশ্নোত্তরই তো পারে জীবনে জনসিঞ্চন করতে। না হলেই তো বরং নচিকেতা কেস। শেষ পর্যন্ত যমের হাতে সঁপে দিতে হয়। ক'জন পারে যমকে পরাস্ত করে ফিরে আসতে?

দু'দিন আগে ঘটনাটা শুনে এমনই মনে হয়েছিল পূর্ণেন্দুর। বলতে পারেননি। আঠারো বছরের বিবাহিত জীবনে বিভাকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখেননি, তাই বুঝেছিলেন ওকথা বলা উচিৎ হবেনা। তবে বিশ্বাসও করেননি। সদ্য দুধের দাঁত খসা ছেলে আত্মহত্যা করবে মানে! জীবনের কতটুকু অংশ দেখেছে যে এত বীতস্পৃহ?
- কে বললো?
- রনিত। অনির সাথে স্কুলে পড়ে। টিউটোরিয়ালেও এক ব্যাচ। অনি নাকি মোবাইলে খবর পাঠিয়েছে।
- কাকে?
- জানিনা।
- কেন?
এরপর রুখে উঠেছেন বিভা, আমাকে এত পুলিশী জেরা করছো কেন?
পূর্ণেন্দু পালটা প্রশ্ন করতেই পারতেন, তাহলে কাকে করবো? কিন্তু করেননি। হাইপ্রেশারের রোগী বিভার মুখ চোখের যা দশা ছিল তাতে স্ট্রোক হতে পারতো। তাই পা বাড়িয়ে ছিলেন অনির ঘরের দিকে। পেছন পেছন ধেয়ে এসেছিল বিভার সতর্কবানী, কোন জিনিষে হাত দেবেনা। ওলট পালট দেখলে অনি সন্দেহ করবে।

হতাশ পূর্ণেন্দুকে এরপর দাঁড়িয়ে পড়ে বলতেই হয়েছে, কারণ তো জানতে হবে।
- দেখেছি আমি সব কিছু হাতড়ে পাতড়ে, কিস্যু পাইনি।
- ট্যাবলেট? দড়ি? কোন চিঠিপত্র? ছবি? ---।
 সূত্র সাজাতে এরপর সাহস পাননি পূর্ণেন্দু। মুখে আঁচল চেপে ডুকরে কেঁদে উঠেছেন বিভা। অগত্যা কোন জিনিষে হাত দেবেননা শর্ত করে ছেলের ঘরে ঢুকেছেন। সব কিছু পরিপাটি গোছানো দেখে অবাক হয়েছেন। এই পরিপাট্যের ভেতর মৃত্যু চিন্তা ঢোকে কীভাবে? মৃত্যু মানেইতো টালমাটাল বিশৃংখলা।

অনির বিছানায় বসে বোঝার চেষ্টা করেছেন বিষাদের উৎস। বলাবাহূল্য বিভ্রান্ত হয়েছেন। আত্মহত্যা তো কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়! তাহলে দেয়ালে ঝোলানো বিবেকানন্দের ছবি এত ঝকঝকে থাকে কীভাবে? বছর দুয়েক আগে কেনা ছবিটা। ছেলের বিছানার চাদর ধুতে গিয়ে বিভার প্রায় দিনই চোখে পড়েছে শুকিয়ে চটচটে হয়ে থাকা কিছু অংশ। এনে দেখিয়েছেন পূর্ণেন্দুকে। চিন্তিত স্বরে বলেছেন, একেই তো যা স্বাস্থ্য, তার ওপরে যদি নিয়মিত ওসব ---।

বিভার দায়িত্ববোধ অসাধারণ। কখনো কাউকে কর্তব্য বোঝাতে বাক্য সম্পূর্ণ করেননা। তাতেই বুঝে নিতে হয় কি বলতে চাইছেন। আর সেটা বুঝে বরাবরের মত সেদিনও দিশেহারা হয়েছেন পূর্ণেন্দু। কীভাবে এগোবেন বুঝে উঠতে পারেননি। অনেক রাত অবধি টি.ভি. চলতে দেখলে গলা খাঁকারি দিয়েছেন। বাথরুমে গেছেন বারবার। তাতেও কাজ হয়নি দেখে বিবেকানন্দের ছবি টাঙিয়ে দিয়েছিলেন ছেলের ঘরে। ভীষন জীবন্ত ছবি। সচরাচর যেমন দেখা যায় তেমন নয়। এ ছবিতে তিনি মহাপুরুষ নন, আত্মপ্রত্যয়ী এক যুবক। চোখের সামনে এমন ছবি থাকলে কেউ আত্মপ্রত্যয় হারাতে পারে?

বেজেই চলেছে মোবাইলটা। অনির্বান কি শুনতে পাচ্ছে না? এত অন্যমনস্ক কেন? ঘাড় না বাঁকিয়ে ছেলের দিকে তেরছা চোখে তাকালেন, কিন্তু কিছুই আঁচ করতে পারলেন না। এভাবে তো তাকানোর অভ্যেস নেই। এমন কী পেছন থেকে কেউ ডাকলেও শুধু ঘাড় নয়, গোটা শরীরটা ঘুরিয়ে দেখার আবাল্য অভ্যেস।

বিরক্ত হয়েছেন বিভা। কনুইয়ের খোঁচা মেরে মৃদুস্বরে ভ্রুকুটি করেছেন, জগদ্দল পাথর না হয়ে পা বাড়াও। যার দরকার সে নিজে এগিয়ে আসবে। পারেন নি পূর্ণেন্দু। অশিষ্টাচারে অনভ্যস্ত পা এগোতে চায়নি। অগত্যা বিভা এগিয়ে গিয়েছেন। পূর্ণেন্দু খেয়াল করেননি। আগন্তুকের সাথে বিভার পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়েছেন। তবু অভ্যেস ছাড়তে পারেননি। অথচ আজ সেই চেষ্টাই করলেন এবং ব্যর্থ হলেন। অগত্যা ঘাড় ঘুরিয়ে বিরক্ত স্বরে বললেন, মোবাইলটা ধর।

বুক পকেটে হাত ঠেকিয়ে মোবাইল থামিয়ে দিল অনির্বান। এই উদাসীনতায় আরও বিরক্ত হলেন পূর্ণেন্দু, দেখলিনা কার ফোন?
- ফালতু।

অনির্বানের সংক্ষিপ্ত মন্তব্যটি বিশেষণ না বিশেষ্য, বুঝে না উঠতে পারলেও কথা বাড়ালেন না। ভাবলেন, বিভাকে সাথে নিয়ে এলে হতো। এই জেদী ঘোড়াকে বশ মানানো চাট্টিখানি কথা নয়। অবশ্য বিভার হাতেও আর লাগাম নেই। নাহলে কী আর পূর্ণেন্দুর সাহায্য দরকার হয়। সেদিনের থেকে ঘুম গেছে বিভার। কাল রাতে জিজ্ঞেস করেছেন, আচ্ছা আত্মহত্যা কি কোন রোগ?
বিভার প্রশ্নের উত্তর যথারীতি খুঁজে পাননি পূর্ণেন্দু। বিভা আবার জিজ্ঞাসা করেছেন, আচ্ছা তোমার এক দাদা আত্মহত্যা করেছিল না?
চমকে উঠেছেন পূর্ণেন্দু, আমার দাদা!
- হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার দাদা, শিবেন্দু না কী নাম, কেন করেছিল আত্মহত্যা?
চুলচেরা তল্লাশী চালিয়ে অবশেষে শিবেন্দুকে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন তিনি।
- সে তো পাগল ছিল। তাছাড়া আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা বোঝা যায়নি। আমি তখন একদম ছোট। কিন্তু, তার কথা এতদিন পর?
- নাহ, এমনি।
বিভার চিন্তা পড়তে অসুবিধে হয়না। হালকা গলায় বলেছেন, তুমিও পারো। শিবেন্দু কি আমার নিজের দাদা ছিল? দূরসম্পর্কের, কোন রক্তের ব্যাপার স্যাপার নেই।

বলেছেন বটে, তবে চোখের সামনে এই মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে ঝুলে আছে শিবেন্দুর বিকৃত লাশ। ছটফট করেছেন দিনের আলো ফোটার অপেক্ষায়।
- আজ কোথায় যাচ্ছি আমরা, জিজ্ঞেস করে অনির্বান।

খুব স্বাভাবিক কৌতুহল। এক মহাসাগর দূরত্বে থাকা কারও সাথে যদি পর পর তিন দিন বৈকালিক ভ্রমণে বের হতে হয়, তার ওপর আগের দুদিনের গন্তব্য যদি হাসপাতাল এবং শ্মশান হয়, তবে তো তৃতীয়দিন বেরোনোরই কথা নয়। কে জানে কী বুঝিয়েছে বিভা। অনির্বান রাজি হয়েছে। তা বলে কি আজকের গন্তব্য বিষয়ে কৌতুহল থাকতে পারে না?

কৌতুহল স্বাভাবিক। তবু ছেলের প্রশ্নে ভীষন আমোদ অনুভব করলেন। বিজ্ঞান যদিও বলে কোন শব্দই হারায় না, রয়ে যায় ইথারের কোঁচড়ে। কিন্তু সময় সুযোগ মত ইথার সেই কোঁচড় উপুর করে ফিরিয়ে দেয় শব্দাবলী, কে জানত?

আঠারো বছর আগে ঠিক এই প্রশ্নই করেছিলেন পূর্ণেন্দু । হোটেলের ছোট্ট এবং অস্বচ্ছ আয়নায় দৃশ্যমান না হওয়া চুলগুলোকে কব্জা করতে ব্যস্ত বিভা পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, কেন? জেনে কী হবে? নিশ্চয়ই এমন কোথাও নিয়ে যাবোনা যেখানে অসম্মান হয়ে যাবে তোমার।

ছমাস পুরোন বউয়ের অভ্যেস ততদিনে জেনে ফেলেছিলেন। প্রশ্নের বদলে পালটা প্রশ্নের ঝড় তোলাটাই পছন্দ করেন বিভা এবং উত্তর আশা করেন না। তাহলে তো আরও এক ঝাঁক প্রশ্ন ছুঁড়তে হয়। সুতরাং পাল্টা যুক্তি ছোঁড়ার প্রবনতা বিভার কাছ থেকে দূরে রাখার অভ্যেস রপ্ত করছিলেন। আর সেদিন উত্তর দেওয়ার অর্থই ফুলমাসীর প্রসঙ্গ অবধারিত চলে আসা। হনিমুনে এসে কে আর অপ্রীতিকর পরিস্থিতি চাইবে।

দীঘা, পুরী, দার্জিলিং এর বদলে কোলকাতা কেন? নির্জনতা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য একাকার না হলে চন্দ্রিমা কি মধুময় হয়? পূর্ণেন্দু অন্ততঃ এরকমটাই ভাবতেন। তাবলে বিরুদ্ধ ভাবনাতেও আপত্তি করেন নি। আপত্তি করেন নি মহানগরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভার আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি বাড়ি মিষ্টি আর দেঁতো হাসি বিতরণ করতে।

একদিনই শুধু নিজের দিকের আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া হয়েছিল। অবশ্য না গেলেও চলতো, ফেরার পথে এরকমই মনে হয়েছিল। জানা ছিল যখন ফুলমাসীর বেঁফাস রসিকতার অভ্যেস। অবশ্য তেমন বেঁফাস কিছু বলেননি মাসী। বিভার চিবুক ধরে বলেছিলেন, তুই তো রাজা নোস পুনু! এমন রানী বাছলি কেন? শোকেসে তুলে রাখতে পারবি?

খুব বেশী বললে একে ব্যাজস্তুতি বলা যেতে পারে। বয়স্কদের কথার ধরন কখনো এমনই। অথচ বিভা ভীষন অপমান বোধ করেছিলেন। ফেরার পথে ট্যাকসিতে একটা কথাও বলেন নি।

পরদিন দুপুরে নিমন্ত্রন করেছিলেন মাসী, যাওয়া হয়নি। সকাল থেকেই বিভার মাথা ব্যথা, গা বমি বমি। টেলিফোনে মধ্যাহ্নভোজ বাতিল করে যে পরিচ্ছেদ চাপা দিয়েছিলেন তা আবার জাগিয়ে তোলার অর্থ হয়না, তাই বিভার এক ঝাঁক প্রশ্নের উত্তর দেননি পূর্ণেন্দু। গন্তব্য না জেনেই চটপট প্রস্তুত হয়ে নিয়েছিলেন।

গিয়ে অবশ্য ভালোই হয়েছিল। এতদিন ধারনা ছিল মিলিটারী মানেই মদ, মেয়ে মানুষ আর মুখ খিস্তির চলমান প্রজ্ঞাপন। সেই ধারনা ভেঙে দিয়েছিলেন বিভার মাসতুতো জামাইবাবু। মদ তো দূরস্থান, সিগারেট, মাছ-মাংস পর্যন্ত ছোঁননা আশুতোষ চৌধুরী। তাছাড়াও অমন ভদ্র, মার্জিত, সুরসিক, অতিথি বৎসল মানুষ সিভিলিয়ানদের মধ্যে খুঁজলেও খুব কম পাওয়া যাবে। দরজা খুলেই বাঁধ ভাঙা উচ্ছাস দেখিয়ে ছিলেন, আরে ভিভা হোয়াট আ সারপ্রাইজ! এসো এসো।
পূর্ণেন্দুকে বলেছিলেন, আমি বিভাকে ভিভা বলি ওর কোয়ালিটির জন্য। 'ভিভা' শব্দের অর্থ জানেন?
কফিতে সুগার কিউব ঢালতে ঢালতে পূর্ণেন্দু বলেছিলেন, ইতালিয়ান শব্দ। অর্থ হলো জিন্দাবাদ।
আর তাতেই এই ছমাসে সেই প্রথমবার বিভার কোয়ালিটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। পরাজিত গলায় বিভা বলেছিলেন, ভীষন বই পড়ার নেশা ওঁর। তাও আবার কবিতার বই।
কফিতে বিষম খেয়েছিলেন চৌধুরী সাহেব। নিখুঁত সামলে বলেছিলেন, বলো কী হে, সোলজারের ভায়রা কবিতাখোর!

'কবিতাখোর' শব্দ জীবনে প্রথমবার শুনে তৃপ্ত হয়েছিলেন পূর্ণেন্দু। উপযুক্ত শব্দ। কবিতা তো এক ধরনের নেশাই। তাই বুঁদ হয়ে থাকা স্বরে বলেছিলেন, এতে অবাক হওয়ার কী আছে। বন্দুকের নলে কি প্রজাপতি বসে না?
- মাই গড, এ যে পোয়েট!
পায়ের কাছে গ্রেনেড ফাটার আতঙ্ক ফুটে উঠেছিল জামাইবাবুর গলায়। অবশ্য খুবই সামান্যক্ষণ। তারপরই মিষ্টি হেসে বিভাকে বলেছিলেন, এ কী করেছ ভিভা! সরি টু সে --- বাট আই মাষ্ট ফোরকাষ্ট –
- তোমার কপালে দুঃখ আছে। ভুগতে হবে।

এরপর ঘরময় হাসির হল্লা উঠেছিল। বিভার দিদি হাসিতে গলে পড়তে পড়তে বলেছিলেন, আশুর প্রেডিকশন না ভী-ষ-ন মিলে যায়।
আর বিভা গর্বিত গলায় বলেছিলেন, আমি জানি এটাও মিলে যাবে।

আঠারোটা বছর খুব একটা কম সময় নয়? অথচ ছেলের এক নিরীহ প্রশ্নে বালি সিমেন্টের পলেস্তারা খসিয়ে খসিয়ে বেরিয়ে এল স্মৃতিগুলো। কেন এল? এখন কি স্মৃতিচারণের সময়? তাছাড়া আশুতোষ চৌধুরীর প্রেডিকশন তো ঠিকঠাক খাটছে না। কবিতার বই পড়া তো কবে ছেড়ে দিয়েছেন। যদিও যত্নে তোলা আছে সে সব কোন একদিন পড়বেন সেই আশায়। বিভার কপালের দুঃখ তো কেটে যাওয়ার কথা। তবে কি এই দুঃখের জন্যেও সেই দায়ী?
- কী হোল, বলো কোন দিকে যাবে?
উত্তর না পেয়ে আবার প্রশ্ন করলো অনির্বান। কী উত্তর দেবেন? নিজেই কি জানেন কোথায় যাবেন আজ! পরিস্থিতি নিয়ে কারও সাথে আলোচনা করতে নিষেধ করে দিয়েছেন বিভা। ভাগ্যিস করেছেন, না হলে কার সাথে আলোচনা করতেন পূর্ণেন্দু? পঞ্চাশ পেরোনোর পরও তেমন সহমর্মী কোথায়?

রাজদ্বার কিংবা দুর্ভিক্ষ দেখা হয়নি। রাষ্ট্র বিপ্লবের কালে তিনি নিতান্তই কিশোর। আর বাপ মায়ের মৃত্যু ছাড়া শ্মশানে যাওয়া হয়নি। সে সময় যারা সাথে ছিল তাদের কাছ থেকে তো বহু আগেই সরে আসা হয়েছে। ছেলের জন্মের পর সেই সরে আসাকে সরকারী স্বীকৃত দিয়েছেন বিভা। পূর্ণেন্দু তলাপাত্রের ছেলে, সুখেন্দু তলাপাত্রের নাতি, অমলেন্দু, নবেন্দু, সুধেন্দু তলাপাত্রের ভাইপো অনির্বান তলাপাত্র।
- ইঁদুরদের ভিড়ে আমার ছেলে থাকবেনা। ও থাকবে নিজের জোরে, সিংহের তেজে।

বিভার এই ঘোষনায় আপত্তি না তোলা পূর্ণেন্দু কোথায় যাবেন আজ? কার কাছে পরামর্শ চাইবেন? প্রথমদিন যাওয়া হয়েছিল হাসপাতালে। কাউকে খুঁজতে এসেছেন, এমন ভান করে প্রতিটা বেডে উঁকি মেরেছেন, দাঁড়িয়েছেন বেশী সময় ধরে সেইসব রুগীদের শিয়রে যাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। ছেলেকে আটকে রাখতে এমন ছলে হাত ধরে রেখেছেন যেন নির্ভরতা খুঁজছেন। অথচ একবারের জন্যও অনির্বানের মুখের দিকে তাকাননি।

পরদিন যাওয়া হয়েছিল শ্মশানে। ঠিক শ্মশানে নয়, সামনের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়েছিলেন। কাছেই একটা চিতা জ্বলছিল, হাওয়ার তোড়ে মাংসের পোড়া ঘ্রাণ ভেসে আসছিল।

দু'জায়গাতেই মুহুর্মুহু বেজেছে অনির্বানের মোবাইল। সন্তুষ্ট হয়েছেন পূর্ণেন্দু । বুঝুক ব্যাটা, মৃত্যু এক স্বাভাবিক পরিণতি। বরং বেঁচে থাকা এক রহস্যময় প্রক্রিয়া। আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে থাকা আনন্দকে উপেক্ষা করে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করা মূর্খামী। বিশেষ করে যার নাম শুভেন্দু কিংবা কৃষ্ণেন্দু নয়, তার পক্ষে। তলাপাত্র পরিবারের মতো যে কোলকুঁজো, অপদার্থ, ক্যালাইকেষ্ট, একলাষেঁড়ে, আহম্মক নয়, তার তো দ্বিগুন তেজে উদ্ধর্তন চোদ্দ পুরুষকে আলো দেখিয়ে, বংশের নাম উজ্জ্বল করে বেঁচেবর্তে থাকা উচিত। মৃত্যুচিন্তা কি সিংহকে মানায়?

।।২।।

রেস্তঁরার নাম 'কোজি'। সুন্দর নাম। নতুন হয়েছে বোধহয়। কিংবা হয়তো আগেও ছিল জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডার বা ঐ জাতীয় কোন নামে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কালো কাঁচ আর শীততাপ নিয়ন্ত্রক মেশিনে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। ভেতরের মৃদু আলোয় খানিকক্ষণ কিছুই দেখতে পেলেননা পূর্ণেন্দু। অভ্যেস নেই এমন জায়গায় আসার। বিয়ের পরপর বার দুয়েক বিভার সাথে যেসব জায়গায় বসেছিলেন সে সবই ছিল বিশুদ্ধ মিষ্টির দোকান। চারদিক খোলামেলা। অফুরন্ত আলো, বাতাস, মাছি। ঘুপচি মতো কেবিন সেসব দোকানে থাকতো বটে তবে পূর্ণেন্দু বসেননি কখনো। কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকতো।

মেয়েটি বোধহয় এরকম পরিবেশে অভ্যস্ত। দিব্যি চেয়ার টেনে বসে বললো, বসুন। কী খাবেন বলুন? বুঝলেন মেয়েটি বাচাল প্রকৃতির। বাপের বয়সী লোকের সাথে এমন ভঙ্গীতে কথা বলছে যেন বয়ফ্রেন্ডের সাথে এসেছে। তাই ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে গম্ভীর স্বরে বললেন, কিছুনা।
- বারে তাই বললে হয় না কি? কিছু না খেলে ওরা এখানে বসতে দেবে?
- 'ওরা' শব্দের প্রতিক্রিয়ায় চারদিকে এবার দেখলেন। জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে বসে আছে, অধিকাংশই অনির্বানের বয়সী। কেউ কেউ তাকাচ্ছেও এদিকে। এ কোথায় এলেন! ঘাড় হেঁট করে বললেন, কী বলবে তাড়াতাড়ি বলো।
- বলছি বলছি। আগে অর্ডার দিই। বলার জন্যই তো ডেকেছি। দরকার যখন আপনার তখন ধৈর্য্য তো আপনাকে ধরতেই হবে।

হ্যাঁ, দরকার যে পূর্ণেন্দুর ফোনেও জানিয়েছিল মেয়েটি। অথচ দরকার কী তা আর বলেনি। বলার জন্যই দেখা করতে বলেছিল এখানে। প্রথমে টেলি টিজিং ভেবেছিলেন। আজকাল তো আর এসব কাজ ছেলেদের একচেটিয়া নয়। খবরের কাগজের আকছার চোখে পড়ে নারী-পুরুষের এহেন কীর্তিকলাপ। পরে মনে হয়েছিল কোন ফাঁদ নয়তো! তবু অনির্বান সংক্রান্ত খবর শুনে চলেই এসেছেন।

বেয়ারা ডেকে খাবারের অর্ডার দিল মেয়েটি। পূর্ণেন্দু মনেমনে নিজের মানিব্যাগের ভেতরের ছবি একবার দেখে নিলেন। খুব বেশি পরিমান টাকা নেই। কুলোবে তো?
- আমি এককাপ চা ছাড়া কিছুই খাবো না।
- এখানে চা পাওয়া যায় না। মিনিমাম কফি। তাঁকে এমন হেলায় কেটে দিল মেয়েটি যে তিনি রেগে ওঠার বদলে আমোদ পেলেন। ভাবলেন, দেখা যাক জল কতদূর গড়ায়। এরাই তো সেই প্রজন্ম, যাদের সাথে এক মহাসাগর দূরত্ব।
- অনি আমাকে এস. এম. এস. করেছে সুইসাইড করবে।
কাঁটা চামচে চাউমিন পাকাতে পাকাতে বললো মেয়েটি। বুঝলেন, এই ছদ্ম উদাসীনতাও একধরনের পরিকল্পিত নাটকীয়তা। তাই ঠাট্টামাখানো গলায় বললেন, তোমাকে কেন!
খাবার আর মুখে তোলা হলোনা। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাঁর দিকে। সেই দৃষ্টির অর্থ একটাই, আমাকে নয় কেন?
- এনি রিলেশান উইদ ইউ? প্রশ্ন ছুঁড়লেন আবার।
- আপনার ছেলের সাথে? কুলকুল হাসিতে বেঁকেচুরে যায় মেয়েটি।

রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে ওঠে পূর্ণেন্দুর। বাচাল মেয়ে, কী ভাবে নিজের সম্পর্কে? এই প্রথম ভালো করে দেখলেন। চেহারায় আলগা চটক আছে, কিন্তু সুন্দরী নয়। এই বয়সে বিভা এর চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী ছিল। বিভার রূপের যেটুকু ছিটেফোঁটা পেয়েছে অনির্বান তাতে রীতিমত সুশ্রী কিশোর বলা যায়। তাছাড়া পড়াশোনা, স্বভাব, ব্যবহার, স্মার্টনেস। আর কী আশা করে একজন পুরুষের কাছে একজন নারী! এসবের অভাবই তো কুড়ে কুড়ে খেয়েছে বিভাকে।
- আপনি হলে তবু ভেবে দেখতাম। ইউ আর রাদার হ্যান্ডসাম দ্যান ইওর সান।
এনাফ ইজ এনাফ। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীর স্বরে বললেন, বেয়ারাকে ডাকো, বিল দিয়ে দি।
- মেসেজ দেখবেন না?
দেখলেন পূর্ণেন্দু। FURAYEAJIBANERSABLENDEN

প্রথমে কিছুই বুঝলেননা। আবার পড়লেন। তারপর রেঁস্তোরা কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন, অসভ্যের মত। জীবনে প্রথমবার। তারপর মেয়েটির গাল সামান্য টিপে দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে অস্ফুটে বললেন, থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর কমপ্লিমেন্ট।

।।৩।।

বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে হলোনা। টেবিলের ওপর রাখা বইগুলোর ভেতরেই পাওয়া গেল জীবনানন্দের শ্রেষ্ঠ কবিতা। অত বইয়ের মধ্যে এই বই কেন বেছে নিল অনি? তেমন আহামরি মলাটও তো নয়। মলাটে আদরমাখানো হাত বোলালেন। কত বছর পর এই বইয়ের স্পর্শ পাওয়া গেল।

অনির বিছানায় বসেই খুলে ফেললেন। প্রথম পাতাতেই গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা, 'কোন এক কবিতা পাগলের জন্য।' সময়ের আঁচড়ে কালির রঙ বিবর্ণ হয়ে এসেছে। তবু, লাইনটিতে নাক ঠেকিয়ে পরিচিত গন্ধ পেলেন। বনলতা সেন কবিতা খুলে দেখলেন, 'সব পাখী ঘরে ফেরে সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন।' লাইনটির নীচে লাল কালির দাগ টানা আছে দেখে হাসতে লাগলেন। একা একাই। পাগলের মতো? না কি কবিতা-খোরের মতো? না কি সংক্রমণ ছড়ানো রোগীর মতো? মহাসাগরের দুকূলকে অনায়াসে জুড়ে দিতে পারা সেতুকে আবিষ্কার করলে এমন হাসিই তো স্বাভাবিক।
- এভাবে হাসছো কেন একা একা? পাগল হলে না কি?
হাসির শব্দে বিভা এসে দাঁড়িয়েছেন দরজায়। দু'চোখে অভিভাবকীয় ভ্রুকুটি। অথচ এক ফুঁয়ে সেই অভিভাবকত্ব উড়িয়ে সাফ জবাব, হাসি পাচ্ছে তাই হাসছি।
- তুমি হঠাৎ এ ঘরে কেন? অনি টিউশ্যন থেকে ফিরে দেখলে কিন্তু বিরক্ত হবে।
ছেলের বিরক্তির কথা ভেবেই কি বিভা বিরক্ত? কে জানে! পরোয়া না করেই বই থেকে একটা কবিতা বেছে নিয়ে আবৃত্তি করতে শুরু করলেন –
''একদিন ম্লান হেসে আমি
তোমার মতন এক মহিলার কাছে
যুগের সঞ্চিত পণ্যে লীন হতে গিয়ে
অগ্নি পরিধির মাঝে সহসা দাঁড়িয়ে
শুনেছি কিন্নরকন্ঠ দেবদারু গাছে,
দেখেছি অমৃত সূর্য আছে।''

ঘাবড়ে গেলেন বিভা। স্খলিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, আজ হঠাৎ এমন করছো কেন! কি হয়েছে বলো তো?
বিভার শঙ্কা পুরোমাত্রায় উপভোগ করতে করতে পূর্ণেন্দু পড়লেন –
''সবচেয়ে আকাশ নক্ষত্র ঘাস চন্দ্রমল্লিকার রাত্রি ভালো,
তবুও সময় স্থির নয়;
আরেক গভীরতর শেষ রূপ চেয়ে
দেখেছে সে তোমার বলয়।''

পিছু হটলেন বিভা। চলে যেতে যেতে ফেঁসে যাওয়া গলায় বলে গেলেন, আবার পাগলামী মাথা চাড়া দিচ্ছে! রক্তের দোষ যাবে কোথায়। পাগলের ছেলেও তো পাগলই হবে।
এহেন প্রশংসায় তৃপ্ত পূর্ণেন্দু শেষ করলেন কবিতাটি –
''এই পৃথিবীর ভালো পরিচিত রোদের মতন
তোমার শরীর; তুমি দান করোনি তো;
সময় তোমাকে সব দান করে মৃতদার বলে
সুদর্শনা তুমি আজ মৃত।''