name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

 

 

 

শুভময় সরকার
 
 একটি অসমাপ্ত খসড়া

 

 

 

অন্যান্যদের গল্প

অলোক গোস্বামী

আনোয়ার সাদাত শিমুল

দেবাশিস চক্রবর্তী

বিপুল দাস

শিবাশীষ রায়

শুভময় সরকার

এই শহরকে যেন ঠিক শহর বলা যায় না, সমস্ত কিছুর মধ্যেই এক অস্থায়ী ব্যাপার। আটষট্টির ভয়াবহ বন্যার পর থেকেই শহর জুড়ে বিষন্নতা ছেয়ে রয়েছে। একদিন যেন সবকিছু গুটিয়ে ফেলবে মানুষগুলো, চলে যাবে অন্য কোথাও। এই শহর হয়ে যাবে তেপান্তরের মাঠ, যেতে যেতে একসময় হঠাৎ করেই মিশে যাবে দিগন্তে। সবকিছু যেন একদিন চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেছে মানুষের স্বপ্নের মত। মানুষ হঠাৎ করেই জেগে উঠে দেখছিল এক বিষাদ নগরীকে। 

শহরে চারটি প্রবেশ মুখ। একদিকে আপাত শান্ত তিস্তা, পূর্বে লম্বা হাইওয়ে, বাকি দু'দিকে লেভেলক্রশিং, পাশে রেলগুমটি, যাওয়া-আসার এক নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে লোহার ভারী গেট আড়াআড়ি শুয়ে পড়লে ট্রেন আসার আগাম খবর জানা যায়। ট্রেন আসে যায়, কিছু মালগাড়ি এবং দিনে তিনবার পাশের শহরের সঙ্গে যোগাযোগের প্যাসেঞ্জার ট্রেন। অনন্তকাল ধরে এই ট্রেন নিত্যযাত্রীদের এ-শহর ও-শহর করাচ্ছে। সার সার বাস, ট্রাক, রিক্সা দু'পাশে থমকে থাকে। গেট তোলা হলে সরব হয় দু'পাশের সদাপ্রস্তুত যানবাহন। তারপর মিলিয়ে যায় যে যার নিজস্ব গন্তব্যে। রেলগুমটির লোকটা সবুজ নিশান ভাঁজ করে দিনগত আলস্যে ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে একটা ভাঙাচোরা শহরের আপৎকালীন চলাচল। 

বাসে বসে শৌভিকের মনে পড়ে মুমুদির কথা। হয়তো বা মুমুদি দাঁড়িয়ে আছে সেই বারান্দায়। পুরোনো বনেদি কাঠের বাড়িটার জ্যামিতিক ছকের কাঠের রেলিং দেওয়া বারান্দা, ফাঁক দিয়ে চলে গেছে লতানো গাছের নকশা। মুমুদিকে বাড়িটা যেন শহরের বিষন্ন সন্ধ্যেটাকে আরও প্রকট করে তোলে। তবু শৌভিক কোথায় যেন এক দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে প্রথম দেখাতেই মুমুদি বলে উঠবে 'খুব তোর কথাই ভাবছিলাম।' একটু চটিয়ে দেবার জন্য অবিশ্বাসের হাসি দিয়ে শৌভিক বলবে, 'এ যুগে টেলিপ্যাথির কথা বললে বিশ্বাসযোগ্য লাগে না।' মুমুদি অভিমান করবে, যদিও বোঝা যায় কপট অভিমান। আকাশি রঙের চাদরটা আলতো হাতে খুলে আবার জড়িয়ে দেবে শরীরে, চুল দুলিয়ে, ভ্রু কুঁচকে অদ্ভুত গলায় বলে উঠবে, 'ভেতরে আয়।' চশমাটা তর্জনি দিয়ে অভ্যাসমত খানিক তুলে শৌভিক এরপর ভেতরে ঢুকবে। এ যেন এক চিরকালীন অপেক্ষা। গেট খুলে সামনের প্রসারিত উঠোন পেরিয়ে এগিয়ে যাবে শৌভিক। অনেক কথা বলার সাধ হয় তখন কিন্তু হয়ে ওঠে না। এ শহরের কাঠের বাড়িগুলো এখনও বনেদিয়ানা ধরে রেখেছে। চা-গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরী টেবিলের ওপর কাচেঁর টপ। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শৌভিক, তারপর একসময় মুমুদির কোনো কথাতে ঘোর ভাঙে। এরপর মুমুদি যেগুলো করবে সেগুলো শৌভিকের সব জানা। শৌভিক যে ঘরে বসে তা বাড়ীর সামনের অংশ, বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন। পেছন দিকে বাঁধানো উঠোন, উঠোনের ওপাশে বাড়ির বাকি অংশ, বেশ বড়াসড়। এখনও জয়েন্ট ফ্যামিলি মুমুদিদের। অবশ্য এক বাড়িতে থাকাটুকুই। এরপর বাঁধানো উঠোন পেরিয়ে মুমুদি ওর জন্য প্লেটে খাবার নিয়ে আসবে, মিষ্টি, কেক, চানাচুর বা ঐ জাতীয়। তারপর চা। উঠোন পেরিয়ে আসার সময় শীতের ঢলে যাওয়া রোদ পড়বে মুমুদির চুলে এবং এ ঘর থেকে স্পষ্ট দেখতে পাবে শৌভিক। মুমুদি কাঁচের টেবিলে প্লেট নামিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে খানিকক্ষন, তারপর খুব শান্ত গলায় বলবে, 'খেয়ে নে, চা আনবো।' 

দূরের কেবিন, রেলগুমটির লালচে রঙ রোদে, জলে এখন প্রায় ধূসর বাদামি। রেললাইন এক নিঃসঙ্গ পথিকের মত কোথাও হারিয়ে গেছে, একলা বিষন্ন রেলগুমটির দিকে তাকিয়ে থাকে শৌভিক। ড্রাইভারের পাশে বসেছিল। বাস থামতেই পোড়া ডিজেলের গন্ধ, বসা দায় হল। লেভেল ক্রশিং-এ আটকে থাকে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার। সারাদিনের একাকিত্ব, নিজর্নতা কাটিয়ে রেলগুমটি হঠাৎই দায়িত্ব পালনে সক্রিয়। প্রতিদিনই এই সময় ট্রেন এ-শহর ও-শহর করে। এখানে প্রায় প্রতিদিনই এই সময় দাঁড়াতে হয়। প্রাচীন সরীসৃপের মত নীল ট্রেন পার হয়ে যায়, সারবন্দী জানলায় কত অপরিচিত যাত্রী উঁকিঝুঁকি দেয়। পরিচিত মানুষের মুখ খোঁজে সে। নাহ, নেই। পরিচিত চেনাজানা কেউই হয়তো এই প্রাচীন শহর ছেড়ে যায়নি। যা যা যেখানে থাকার, যাদের যেভাবে থাকার সবাই সেভাবেই আছে, শুধু শৌভিকের জীবন থেকে সরে গেছে সময়। গুমটীম্যান গেট তুলে নেবার পরও বাস ছাড়েনা। নেমে যাওয়া যাত্রীদের এবং ড্রাইভারের ফিরে আসতে খানিকটা সময় চলে যায়। শৌভিক সিট ছেড়ে নামেনা। স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে দূরের পাহাড়ের দিকে। ধানক্ষেত চিরে চলে যাওয়া রেললাইনের পর যতদূর তাকানো যায় শুধু ধানক্ষেত। তারপর এক সময়ে মিশে যাওয়া ঐ পাহাড়ে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শৌভিক। ঝাপসা মানুষের মুখ-শরীর চোখে পড়ে। মনে হয়, তবু মানুষগুলো বড় পরিচিত ছিল এ শহরের, কোথায় যেন হারিয়ে গেল সব। না কি শৌভিক নিজেকেই সরিয়ে নিয়েছে অনেকটা। 

বাস এগোয়। শৌভিক চেয়ে থাকে। শহরের উপকন্ঠে শেষ বিকেলের ছায়াঘেরা ভাব। এ শহরের অপরপ্রান্তে ওৎ পেতে থাকা চতুর বেড়ালের মতো ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে আপাত শান্ত তিস্তা। রমণক্লান্ত নারীর মতো, এলোমেলো এক চতুর খেলা যেন চালিয়ে যায় অলক্ষ্যে। পাশের ধানক্ষেতের দিকে আবার তাকায় শৌভিক, দূরের পাহারের দুটো চূড়োকে জোড়াস্তনের মতো মনে হয়। নীলস্তন, সবুজ চূড়োগুলোকে দূর থেকে নীল দেখায়। ঐ পাহাড়ের নীল পথ দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে নীল ছোট্ট ট্রেনটা একসময় পৌঁছে যায় ঘুম, কার্শিয়াং কিংবা দার্জিলিং স্টেশনে। শৌভিক ড্রাইভারের পাশের জানলা দিয়ে ডানদিকে তাকায়। খোলা জমি। ধানকাটা। খাকি রঙের মত রুক্ষ। জায়গাটা অপেক্ষাকৃত নীচু। বর্ষার জল জমলে নৌকো চলে; শীতে গরু চরে। এখন গরু চরছে, রাখালবিহীন। আজকাল রাখালের পাট চুকে গেছে, তা না হলে গরু আর রাখালের পায়ে ঝিলিক দিত রোদ্দুর। পৃথিবীর বহুবিধ জিনিষ স্থিরতা হারিয়ে ফেলে দ্রুত, কোনো কিছুই স্থায়ী নয় বিশেষ। সেই রাখাল নেই, গোধুলি নেই। গাভীর পায়ে নুপুরের মত ধূলো খেলার নামই তো গোধূলি, সঙ্গে রাখাল। এসব কিছুই যেন হারিয়ে গেছে, যেভাবে দ্রুত হারিয়ে যাবে আরো অনেক কিছু। 

জোড়া বটতলায় বাস আবার ব্রেক কষে, বেশ বড়সড় বাম্পার। এটা বৃষ্টির সময় নয়, কিন্তু দক্ষিণদিক থেকে ঘনমেঘ উঠে আসছে। বেশ কিছুদিন পর আবার এই প্রাগৈতিহাসিক শহরে ঢোকার মুখে নিজের উপর বিরক্ত হয় শৌভিক। কোন আপনজনের টানে সে এ শহরে কাজকর্ম বাদ দিয়ে চলে আসে? কার জন্য? মুমুদি না কি অন্য কারও জন্য? এ শহরের গুটিকয়েক বিষন্ন মানুষের জন্য? নিঃশব্দ তুষারপাতের মত বুকে জমে আছে মায়াটান। এই শহর তার রক্তে গুঁজে দিয়েছে এক নির্লিপ্ত আমন্ত্রণ। মানুষ তো মানুষেরই রক্তে আশ্রয় খোঁজে যদিও কোনোএক চলতি নিয়মে মানুষের কোন বন্ধু নেই। কিন্তু মুমুদি? কে হয় তার! 

শহরে ঢোকার মুখে উল্টোদিক থেকে ছুটে আসা বাসগুলো দ্রুত পাশ কাটিয়ে শহর ছেড়ে চলে যায়। যেন কোনো ভীষন অঘটন ঘটে গেছে শহরে। মানুষজন ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে শহর ছেড়ে। মুমুদি বলেছিল, 'একদিন জোড়া বটের তলায় গিয়ে বসবো ...।' সংস্কার, ভক্তি না কি অন্য কারণ, শৌভিক বোঝেনি। বাসের গিয়ার প্রবলেম হচ্ছে, ঘটাং ঘটাং শব্দের ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যাচ্ছে, আবার খানিক চলছে। বিরক্ত হচ্ছে যাত্রীরা, অদ্ভুত এক সাফোকেশন বাসের মধ্যে। দমআঁটা ভাব। একটা ব্যাস্ত অটো চঞ্চল শিশুর মত পাশ কাটিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। সূর্য সরে গেছে সারাদিনের ক্লান্ত শহর ছেড়ে, এখনও রোদহীন আলো পাওয়া যাচ্ছে তবে দক্ষিণ দিকের মেঘ বেশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সারা শহরের মাথায়। এই অসময়ে কালবৈশাখীর ভ্রুকুটি লক্ষ করে শৌভিক। হাল্কা হাওয়া দিচ্ছে, বাসের ভেতর বসেই বোঝা যায়। 

মুমুদি কি আজ আকাশি রঙের চাদর জড়াবে? শীত তো অনেক কম। শুধু মুমুদির জন্যই প্রাচীন এই শহরে আসা যায়। বাস স্ট্যান্ডে ঢুকছে। একদিন ঠিক এমন সময় একটি মেয়ে দাঁড়িয়েছিল এই চত্বরে। কিছু খুঁজছিল বোধহয় এদিক ওদিক। সম্ভবত, রিক্সা। শরীরের জড়ানো নীল শিফন, ছিপছিপে, পাতলা দুধের মত গায়ের রঙ, কপালে নীল টিপ, কাঁধে এয়ার ইন্ডিয়ার ফোম ব্যাগ, ঘামভেজা কপালে দু'চারটে চুল লেপ্টে। চোখে ক্লান্তির ছাপ। এখনও বুকে মোচড় দেয়। কোথায় থাকে সেই নারী? এরকম নীলাম্বরী নারীদের বোধহয় কোনো নিবাস নেই। সময়ে অনেক জিনিষের দেখা মিলে যায়, অন্তত চোখের দেখা। পাওয়া-না-পাওয়ার প্রশ্ন অবান্তর। কোনো ভয়ানক আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে অনেক দূরে সরে যাওয়াই ভালো। সেই নারীকে দেখে মুমুদিকে বলেছিল, 'তোমার চোখে নীল জল দেখে অনেক জাহাজ ভুল পথে বন্দর ছেড়ে চলে যায়।' কপট রাগ দেখিয়েছিল মুমুদি, 'তোদের এই কবিতা টবিতা আমি বুঝিনা বাপু, আঁতেল আঁতেল কথা ভাল লাগেনা, সহজ কথা সহজবভাবে বল।' কিছু বলেনি শৌভিক। হেসেছিল, আর মনে মনে বলেছিল, 'সব সহজ কথা সহজভাবে বলা যায় না রে মুমুদি ...।' বিড়বিড় করেছিল, 'মরণ তাহার দেহ কোঁচকায়ে ফেলে গেল নদীটির পাড়ে। সফেন আলোক তাকে চেটে গেল দুপুরবেলায়।' তাকে লক্ষ্য করে মুমুদি বলে ওঠে, 'তোর কী হয়েছে রে?' 'জীবনানন্দ', বিহ্বল চোখ নিয়ে আড়ষ্ট গলায় বলে শৌভিক। মুমুদির আকাশি চাদরের উষ্ণ গহীন ছেড়ে পাখির ডানার মত পালকময় হাত নরম স্পর্শ দ্যায় শৌভিকের ধূলোমাখা কপালে। ক্লান্ত চেতনা নিতান্ত আশ্রয়ের তাগিদে, প্রচণ্ড শংকায় বলে, 'তোর বিয়ের কী হোল?' নির্বিকার শোনায় মুমুদির স্বর। এক ঝাঁক নীল পাখি এইমাত্র ফিরে যাবে মুমুদির ভরাট চোখে। শৌভিকের মন টন্‌টন্‌ করে ওঠে হঠাৎ। মুমুদি নীল চাদরে আলতো দু'চোখ ঢাকে। মুমুদির কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, 'তোর কিন্তু কোনদিন বিয়ে হবে না।' একসময় চোখ তুলে কান্নাভেজা সরল হাসি নিয়ে মুমুদি বলে, 'সেই ভাল।' 

মুমুদির সঙ্গে আজ দেখা হল না। গিয়েছিল শৌভিক। সদর দরজা বন্ধ, বাড়ি যেন হঠাৎই নিঃঝুম হয়ে গেছে। মুমুদিদের বাড়ির অংশের গেটের ভিতর দিকে তালা, বাইরে কলিংবেল রয়েছে। কিন্তু আঙুল থেমে গেছে, কেমন যেন শংকা, সংকোচ। অনেকক্ষন সন্ধে নেমেছে। থমথমে চারপাশ, সবুজ পর্দার আড়ালে ফ্লুরোসেন্টের আলো নেই, পেছনের দোতলা অংশে বিবর্ণ হলুদ আলো। শৌভিক বুঝতে পারে না কী হয়েছে বাড়িটার। কেউ অসুস্থ! বিষন্ন পা বাড়ায় পুরোনো নেটিভ আড্ডায়। এ শহরে তার আরও এক ঠিকানা।

আড্ডায় কেউ নেই। ফাঁকা। এত তাড়াতাড়ি কেউ আসে না। এই সময় কারও থাকবার কথাও নেই। এক কাপ চা আর সিগারেট নিয়ে অন্ধকারে বসে পড়ে। ঘর প্রায় অন্ধকার। বাইরে টিমটিমে কালিপড়া বাল্ব জ্বলছে। আনমনা হয়ে যায় শৌভিক। মুমুদিকে মনে পড়ে। কী হল মুমুদির? কোথাও বেড়াতে গেছে, ডুয়ার্সের জঙ্গলে কিংবা পাহাড়ে? যাক যেখানে খুশি। মন অন্য চিন্তায়। মনে পড়ে সেই বিকেল, সেই শীতের মাস। সেদিন ছিল ঝড়ঝঞ্ঝা। মাঘ মাসের সেই অলুক্ষণে বৃষ্টি, আগের রাতেই শিলাবৃষ্টি দিয়ে শুরু তবে বিকেল ছিল পরিস্কার, শান্ত, বর্ষণস্নাত। চারদিকের রুখা প্রকৃতি বর্ষণস্নাত হয়ে অনেক সবুজ, সতেজ। আজ বহুদিন পর হাল্কা বাতাসের মতো আচমকা উড়ে আসে শিকারপুরের সন্ন্যাসীর হাট, পথের দুধারের জঙ্গল, মাঝে মাঝে কিছু লোকালয়। খানিক দূরে শিকারপুর চা বাগান। একসময় সাহেবদের যাতায়াত ছিল এই রাস্তায়, চা বাগানের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরের পাহাড়। মাতাল মানুষজন হাট ফেরতা, চারদিকে বিবিধ মানুষজন। অবশেষে সেই দেহাতি মানুষের ভাঙাগলার স্বর, ' ... হাটে হাটে কাঁচের চুড়ি বেচি, ওতে কি আর চলে।' লোকটা ওর চিন্তায় এখন প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায় ... । লোকটা বেশ জোরেই হাঁটছে। শিকারপুরের রাস্তায় লোক চলাচল এমনিতে খুব বেশি নয় তাবে হাটের দিন অনেক মানুষজনই দেখা যায়। শৌভিক ফিরছিল শিকারপুরের দেবী চৌধুরানীর মন্দির হয়ে। বলা হয়, এই মন্দিরে পূজো দিয়েই ভবানি পাঠক ডাকাতি করতে যেতেন। শৌভিকের গন্তব্য বেলাকোবা রেলস্টেশন। লোকটার বয়স হলেও বেশ সমর্থ। হাঁটা দেখলেই বোঝা যায়। সন্ধ্যে হবে আর কিছুক্ষনের মধ্যেই।

এগিয়ে গিয়েছিল লোকটা, খানিকটা পিছিয়ে এসে বলে, মাস্টারমশাই এদিকে প্রায়ই আসেন না কি?

অবাক হয় শৌভিক, তাকে চেনে। ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য বেরিয়ে তিনমাসের জন্য বেলাকোবার হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুলে চাকরি করেছিল, ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে। কোনো কারণে স্কুল আগে ছুটি হয়ে গেলে শহরে ফেরার ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হত সন্ধ্যে অবধি। চলে যেত আশেপাশের জঙ্গলে। কোনোদিন বোদাগঞ্জ, কোনোদিন শিকারপুরের মন্দির। সেদিনও তেমনই হয়েছিল বোধহয়।

- প্রায়ই না, তবে মাঝেমধ্যে আসি। আপনি কোথায়?
- বেলাকোবা বাজার।

দু'জন পথিক দূরত্ব অতিক্রম করে ক্রমাগত। লোকটা এদিক ওদিক তাকায়। আকাশের বুকে আঁতিপাতি করে কী যেন খোঁজে। শৌভিক অবাক হয়।

- কী হল?
- না না, কিচ্ছু না, তারা খুঁজছি।
- কেন! অবাক হয়ে প্রশ্ন করে শৌভিক?
- বাঃ জানেননা বুঝি? এক তারা দেখে বাড়ি ফিরলে মানুষ একা হয়ে যায় ...

বেশ জোরেই বলে কথাগুলো। শৌভিকের অবাক লাগে। এক তারা দেখে ঘরে ফিরলে মানুষ নিঃসঙ্গ, একা হয়ে যায়। একা একা বাঁচা লোকটার কাছে অসহনীয়। জীবনের অনেক পথ তো পেরিয়ে এসেছে তবু সঙ্গ চায়। আসলে প্রতিটি মানুষই তো আসঙ্গলোভী স্পর্শকাতর ডানা। সহবাসে মানুষের ক্লান্তি নেই। ভরসন্ধ্যায় ঘরে ফিরে যাবে পরিচিত সাহচর্যের আশায়, হয়তো সবাই আছে তবু আদিম-নিঃসঙ্গতা কাটেনা কিছুতেই। সংসারে তো সন্ন্যাসীর ভিড় বেশি। একসময়ে সে চলে গিয়েছিল শৌভিকের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। ফিরে গিয়েছিল নিজস্ব আশ্রয়ে। এখনও লোকটার কথা মনে আছে। সেই মেঘ জলে সাফসুতরো বিকেল, সন্ধ্যে, ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখা রাতের আকাশে তারা, মানুষটার শংকাময় জীবনযাপন সবকিছুই যেন বড় স্পষ্ট আজও। 

চা খেয়ে শহরের পরিচিত গোপন পথগুলো দিয়ে একা একা হাঁটে আজ শৌভিক। বেশ শীত শীত করছে। সারা আকাশ মেঘে ছেয়ে গেছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। দমকা হাওয়ার সঙ্গে শীতের প্রকোপ হঠাৎই খানিক বেড়েছে। এই শহরে এখন শৌভিকের নির্দিষ্ট কোনো আস্তানা নেই, তবে যে কোনো পরিচিত বাড়িতেই থেকে যেতে পারে তবু ডান হাতে ঘড়িতে সময় দেখে নেয়। শেষ বাসে ফিরতে হবে পাশের শহরে, ঝাঁ চকচকে আবাসনে দোতলার নির্দিষ্ট বর্গফুটে। ফেলে আসা এই শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তা শৌভিকের বিভিন্ন সময়ের সাক্ষী। সে ফিরে যায় মুমুদির বাড়ির গলিতে। একটা রিক্সা থামে গলিমুখে । টলমল করে রিক্সা থেকে নেমে আসা মানুষটিকে চিনতে এই আধো অন্ধকারেও ভুল হয় না, ত্রিদিবেশদা। ভাড়া মিটিয়ে হাঁটছে গলিপথে একা। এলোমেলো চলা, নেশা করেছে। শৌভিক ডেকে ওঠে, 'ত্রিদিবেশদা!'

- ইয়েস, তারপর ফেরে শৌভিকের দিকে।
- কোথায় যাচ্ছিস? তোর মুমুদির কাছে? যাস না ...নেশার ঘোরে বকবক করতে থাকে ত্রিদিবেশদা।
- তুই যাও পাখি পড়েছিস? শীর্ষেন্দু ... শীর্ষেন্দু ...

শিথিল শরীরে জাপটে ধরে শৌভিককে, নিতান্ত উদাসীন গলায় এক সরল অথচ বয়সহীন সত্য উচ্চারণ করে – 'শি'স সিক্রেটলি ম্যারেড এন্ড ফ্লিউ ...' 

আজ তিস্তার বুকে বোধহয় একটু বেশি কুয়াশা। হাওয়াও বেড়েছে। আকাশে আজ কোনো তারা নেই, একাকী কিংবা যূথবদ্ধ। বৃষ্টি নেমে যাবে, শেষ বাসের ও খুব দেরী নেই। ত্রিদিবেশদাকে ছেড়ে দেয় শৌভিক। টালমাটাল পায়ে এগিয়ে যাওয়া মানুষটার জন্য খুব কষ্ট হয়, বেচারা সংসারই করলো না মুমুদির জন্য। একপেশে প্রেমিক। শালা ইমোশনাল ফুল। বহুদিন পর আজ তিস্তাপারে এসে দাঁড়ায় শৌভিক। জলে কোনো নৌকো নেই, ডিঙ্গি নেই। অন্ধকারে এই শীতের শান্ত তিস্তা যেন আকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিংসাহেবের ঘাটকে ভাসিয়ে নিতে চায়। এই অন্ধকারে নদী আর আকাশ মিলেমিশে আজ যেন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে চাইছে। হঠাৎ ক্ষীণ তরঙ্গের মতো মুমুদির কোনো এক বষর্ণসন্ধ্যায় বলা কথাগুলো ভেসে আসে, 'আমি চলে গেলে তোর কী হবে রে?'

'কিস্যু হবে না,' তিস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে ঝোড়ো বাতাসে কথাগুলো ছেড়ে দেয়। যা হবার ঐ গান্ডু ত্রিদিবেশের হবে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা বোধ করে শৌভিক। সিগারেটে জোরে টান দেয়, কাশে, পাঁজরে টান ধরে। আলুথালু চুলে হাত বুলিয়ে ধোঁয়ার রিং ছাড়ার বৃথা চেষ্টা করে, কোনো বৃত্ত রচনা করতে পারে না। অসহনীয় সুখ এখন নির্লিপ্ত হয়ে দাঁড়ায় – 'কিস্যু হবেনা।' 

দু'হাত প্রসারিত করে তিস্তার বুক থেকে বৃষ্টি এগিয়ে আসে ওর দিকে। এখনও বেঁচে থাকার ক্ষীণ সাধ বুকের গহীনে। বহুদিন আগে দেখা তিস্তাপারের জোড়া শালিখদুটো আবার যেন দেখতে পায়। বৃষ্টিতে ভিজে নিভে যাবার আগেই দু'আঙুলের টোকায় ছুঁড়ে ফেলে জ্বলন্ত সিগারেট। কিংসাহেবের ঘাট থেকে সরীসৃপের মত রাস্তা ধরে নেমে আসে শৌভিক। নিশ্চিত হয়েই এগোয় যে শেষ বাস অপেক্ষায় থাকবে ওর জন্য।