name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

 

 

 

শিবাশীষ রায়
 
  বিন লাদেনের ঘোড়া



 

অন্যান্যদের গল্প

অলোক গোস্বামী

আনোয়ার সাদাত শিমুল

দেবাশিস চক্রবর্তী

বিপুল দাস

শিবাশীষ রায়

শুভময় সরকার

 

আচ্ছন্ন আকাশ, শুকতারা এখন মাথার পিছনে ডুবে যাবে নতুন ভোরে। ঈশান কোণে দুটো গাছ – বট আর পিপুল পাশাপাশি বেড়ে উঠেছে একই সাথে পরস্পরকে জড়িয়ে। এমন দুটো গাছেরই বিয়ে হয়। তাই গ্রামের মানুষ আঁধার থাকতে থাকতেই কাঘরা পাতা যোগাড় করে, বানায় পাতার বর-কনে লাদা-লাদি। জোনাকির মত সার বেঁধে মানুষেরা জড় হয় পিপুল-বটের থানে। সেখানে কাঠি পড়েছে ঢাকে। আর রিকেটগ্রস্ত ঈশানের হাতে কাঁসরের শব্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে সূর্য্যউপাসক মন্ত্র ঈশান-অগ্নি-নৈঋত-বায়ু-পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিন-উর্দ্ধ ও অধঃ কোণে। হৈ রৈ এক উৎসব। বিয়ে হবে পিপুল-এর সাথে বটের। বিয়ের যৌতূকে এসেছে নুপুর পড়া ঘোড়া। তার গায়ে সাজ মাথায় মুকুট। গাছে সিঁদুর লেপে দিয়েছে মেয়েরা। গেয়েছে 'বিয়াগীতি' -

"সুঁধি শালুকের ফুল
ফুটে আধা রাইতে
যার সঙ্গে যার দেখা নাই
রাজা হে, দেখা হবেক আজের রাইতে।" 

লালে লাল হয়ে উঠেছে দুটো গাছ তার পিছনে ভোরের সূর্য্য। গাছের শিকড়ে, কোটরে অর্ঘ্য রেখেছে মানুষেরা লাদা-লাদির। খুলে দিয়েছে ঘোড়ার লাগাম। উঁচু-নীচু রাঢ়ভূমির ঢিবি পেরিয়ে সে ঘোড়া মিশে গেছে সূর্য্যের দিকে সাতটি ঘোড়ার সাথে। ভিন্নকাল ভিন্নক্ষেত্র পেরিয়ে ছুটেছে সে ঘোড়া। চিহ্ন আছে খুরে, নালে। 

আর্য আগ্রাসনের ঘোড়া সে। তাদের সভ্যতা ধ্বংস করেছে যুদ্ধবাজ হুন। হুনদের হটিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে গ্রীকেরা। তাদেরও প্রতিস্থাপন করেছে তুর্কি পাঠান মোগল। অতঃপর সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ। যৌতুকের ঘোড়া এসবের সাক্ষী। তথ্যচিত্রে ইতিহাস যাত্রার শেষে পৌঁছেছে এক নদী তটে।

গুমানি নদীতে এসেছে বান, ডুবে যাচ্ছে এক দ্বীপ। সেই দ্বীপে লাদেনবাবা সংগ্রহ করে বনৌষধি। দ্বীপের পাড় ভাঙে। মাটির ভেতরে শব্দ গাছেদের শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার। ভেসে যাচ্ছে ওষধি গাছেরা, পরম্পরা, লাদেনবাবার প্রজ্ঞা। জল বাড়তে লাদেনের পা ছুঁয়ে উঠে আসে গলা পর্যন্ত। ভেসে যায় লাদেন। ঈশান ও তার মা গির্জার আশ্রিত। পুরোনো গির্জার সীমানার মধ্যেই তাদের ঘর। ভেড়া শুয়োরের খোঁয়াড়ের পাশে। প্রতিদিন সকালে মা শুয়োরগুলোকে খাবার দেয়। ভেড়াদের নিয়ে যায় চড়াতে। ঈশানের পাদুটো পঙ্গু হলেও তার হাতদুটো ততটাই শক্ত। কালো কালো কড়া হাতের চেটো। হাতে হামা দিয়ে ঈশান চলে সরীসৃপের মত। এঁকে বেঁকে ঈশান উঠে যায় গির্জার টাওয়ারে। এক বড় চাবি নিয়ে দম দেয় গির্জার ঘন্টায়। প্রতিদিনকার মত মুছে রাখে চেয়ার-টেবিল, প্রার্থনার ডায়াস আর ওল্ড টেস্টামেন্টের পাতার স্পর্শে নেয় পাঠ। তারপর ফাদার বেলকে পরিয়ে দিতে হয় গাউন। পঙ্গু ঈশান শোনে বৃদ্ধ ফাদার বেলের মুখে ঈশামুনির গল্প। সেই পশুপালক আদি পুরুষ যার হাতের লাঠি 'আশা' দুভাগ করে দিয়েছিল সমুদ্রের জল। উদ্ধার করেছিল ক্রীতদাসত্ব থেকে নিজের জনগোষ্ঠীকে। গল্প বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠে কিংবা ঘুমিয়েই পড়ে ফাদার বেল। ঈশান স্মৃতি থেকে গল্পের পাঠ নেয়। ব্রাত্য ঈশানের চোখ যেন দেখতে পায় এক দিন। ঈশ্বর মোজেস তার পশুপালক গোষ্ঠীকে মুক্তি দেবে।

গুমানির তটে ভেসে এসেছে লাদেনবাবা। উপুর হয়ে নিঃসাড় পড়ে আছে। জ্ঞান নেই। মাটির সাথে মিশে আছে কাদামাখা শরীর। অর্ধেক জলের মধ্যে। মাটি দিয়ে গড়া অবয়ব নিশ্চল। 

মা ভেড়াদের জল খাওয়াতে আসে নদীর তটে। পিপুল-বটের থান ঠিক নদীর পাড়েই। ভেড়ারা সার বেঁধে জল খায়। মা আঁচল ভিজিয়ে মুছে নেয় মুখ। উপুর হয়ে পড়ে থাকা পুরুষের দেহটাকে দেখে। মাটি ও জল থেকে উঠিয়ে আনে সেই শরীর। চিনতে পারে মানুষটিকে। আপ্রাণ হয়ে ওঠে জীবনের প্রচেষ্টা। শুশ্রুষায় জেগে ওঠে লাদেন। অথচ চিনতে পারেনা তাকে। বট-পিপুলের থানে আরেক বাস্তবতায় দেখা হয়ে দেখা হয়ে যায় দুজনের, মা ও লাদেনের। 

একতাল মাটির মুর্তি লিঙ্গের মত। ঈশান কুমোরের চাকায় চাপায় সেই তাল। দুটো জবা ফুল তার ওপর। পঙ্গু দুই পায়ের ফাঁকে ঘুরতে থাকে চাকা। মাটির লিঙ্গে ঈশানের কারু-আঙুলের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠে জরায়ুর সদৃশ্য হাঁড়ি। ঈশানের মা উঠোনে একে একে শুকোতে দেয়। সারি সারি মাটির ঘোড়ার সামনে সে হাঁড়ি শুকোয়। তার অনেক কাজ। শুয়োরদের খোঁয়াড় থেকে বার করার পর সে কান রাখে পোয়াতি ভেড়ার পেটে। ঈশানকে ডেকে শোনায় সেই শব্দ। ভেড়ার পেটের শব্দ গুমানিতে ডুবে যাওয়া দ্বীপে উপড়ে পড়া বনৌষধির শিকড়ের। গির্জার ঘন্টা বেজে উঠেছে, শুরু হবে প্রার্থনা। অথচ আজ ভীড় নেই গির্জায় শূন্য চেয়ার-টেবিল। গ্রামের মানুষেরা খোঁজ পেয়েছে এক ফকির পয়গম্বরের। যৌতুকের ঘোড়ায় চেপে এসেছে লাদেনবাবা, সংগ্রহে বীজ আর উপশমের প্রজ্ঞা। তার শুশ্রুষায় মৃতপ্রায় মানুষের দেহে এসেছে প্রাণ। ভক্তেরা সেই থান ভরে দিয়েছে মানতের মাটির ঘোড়ায়। তুলে দিয়েছে এক আটচালা। ভক্তের কপালে হাত রেখে বাবা কামনা করে চৈতন্য হোক, চৈতন্য হোক মানুষের। 

মা পোয়াতি ভেড়াটাকে খুঁজে পায়না দলের মধ্যে। নদীর তীরে খুঁজে দেখে নদীতো এখন শান্ত। লুকিয়ে লুকিয়ে এগিয়ে যায় বট-পিপুলের থানে। সেখানে সদ্যজাত ভেড়াশাবকের নাড়ি কেটে দিচ্ছে লাদেন। ভেড়াটার কানে দিচ্ছে মন্ত্র, 'আর একটু কষ্ট করো মা, আর একটু কষ্ট।' পশুটা চেটে দেয় লাদেনের গাল। লাদেন আর ভেড়া যেন একই সঙ্গে প্রসব করছে, তার পেটে হাত বুলিয়ে দেয় লাদেন। গায়ের পোষাক আলুথালু এক আদিম মানুষ ও পশুর মধ্যে স্নেহ যেন বিলীন করে তাদের দূরত্ব। জলের থলি ফাটিয়ে পরিস্কার করে সেই শাবককে। জন্মজাত নখ ভেঙে দেয়। টালমাটাল প্রানীটিকে হাঁটানোর চেষ্টা করে লাদেন এক পা দুপা। মুখে ধরিয়ে দেয় স্তন। আর কানে ফুঁ দিয়ে শিশুকে শোনায় স্তব, পশু জন্মের – 'হাঁটো হাঁটো হাঁটো, আমার দেশে ঘাস নাই, মুখ করো খাটো।' মানতের ঘোড়ার সাথে এঁকে বেঁকে লাল ধুলোয় দাগ রেখে চলে থানে, ঈশান। মা তার কপালে এঁকে দিয়েছিল নজর-টিপ। লাদেন বাবার কাছে ঈশান আড়ষ্ট – সখ্যতা, স্নেহে দুই পা স্পর্শ করে তার। ওষধি লাগায় দুটো পঙ্গু পায়ে, ঈশান দাঁড়াতে পারে লাদেনবাবার অবলম্বনে। লাদেনবাবা তাকে দেয় একটা বীজ আর মন্ত্র –

'মিনহা খালা কুনা কাম'
এই মাটিতেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি

'ওয়াফিহা নইদুকুম'
এই মাটিতেই তোমাদের রেখেছি।

'ওয়ামিন্‌হা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা'
পুনরায় এই মাটিতেই তোমাদের বের করবো। 

ঈশান সে বীজ পোঁতে, পরিচর্যায় বীজ অঙ্কুরিত হয়। স্বপ্ন দেখে ঈশান বাইবেলের উপর ক্লান্ত ঘুমে, শুনছে ঈশ্বরের গল্প। ঈশ্বর তার পরিত্রাতা গ্যাব্রিয়েল- 'মিনহা খালা কুনাকুম' – যৌতুকের সেই ঘোড়ায় চেপে পৌঁছে গেছে এক অজানা ভুমিতে। সেখানে বীজের খোলা ভেঙে অঙ্কুরিত পাতাগুলো বেড়ে ওঠে, শিকড় ছড়ায়, জন্ম নেয় এক বিশাল গাছের। দিগন্তে সেই গাছের নীচে মাটিতে বশার আর নাহার – দুই কিশোর কিশোরী। নাহারের ভেড়ারা ঝিমোয় গাছের ছায়ায় বশার এসেছে এক সাইকেলে। দুজনের ভাব আছে কিন্তু প্রকাশ মানা। হৃদয় পর্যন্ত জানে যে প্রেম হৃদয় পর্যন্ত জানে। প্রত্যাখ্যানের ভয়। তাই দুটো হাত ছুঁতে চেয়েছে পরস্পরকে, ধূলোতে ছিল তার দাগ। একটা ট্রেন আর হুইসেল চমকে ঘটায় বিচ্ছেদ। অনেক না বলা বলার কথা ছিল। শুধু বশার প্রতিশ্রুত সাত সাত বছর পর সে আসবে। ফিরে আসবে শহর কোলকাতা থেকে। তাদের সাঙার, বিয়ের টাকা যোগাড় করে। নাহার ততদিন অপেক্ষা করবে তো? নাহারের প্রশ্ন কীভাবে সাতবছর পরও সে জানাবে তার অপেক্ষা।

গ্রামের প্রৌঢ়দের প্রশ্ন,
কী করে জানবে নাহারের অপেক্ষা?

পুরো গ্রামের প্রশ্ন,
কী করে বুঝবে নাহারের ভালবাসা?

জেলার মানুষের প্রশ্ন,
কী করে জানবে সেই প্রতিশ্রুতি?

পুরো বিহারের প্রশ্ন,
কী হবে নাহারের চিহ্ন? 

এডিটিং মনিটরের সামনে লিলিথ। পাশে গার্লফ্রেন্ড এডিটর। টিভি মনিটরে নাহার আর বশার বাস্তবে তাহলে মিলবে কী করে। খুব সহজেই। নাহার একটা হলুদ সুতো বেঁধে রাখবে এই গাছের ডালে। সাত বছর পর যখন বশার ফিরবে, ট্রেনে দূর থেকে চিনে নেবে সেই অপেক্ষার চিহ্ন। ভালবাসে নাহার বশারকে। লিলিথ যাবে গুমানি নদীর তীরে তার বাবা ফাদার বেলের গির্জায়। তার ছবির শুটিং শেষ করতে হবে তাকে।

লাদেনবাবা বেতের ঝাড় কেটে তৈরী করেছে ঈশানের লাঠি। সেই লাঠিকে অবলম্বন করে খাড়া হতে পারে ঈশান। তার পা কাঁপতে থাকে। অথচ লাদেনবাবা তাকে দাঁড় করাবেই। ঈশানের চোখে মুখে ঘাম। থুতনিতে বেতের লাঠি, থরথর কাঁপতে থাকে ঈশান। এক পায়ে দু'পায়ে ধীরে ধীরে পায় আত্মবিশ্বাস। কড়া পরা দুটো হাত তুলে সে যেন নিজেই ঈশা।

গির্জায় ফাদার বেল অবিশ্বাসে তার কালো দড়ির মত পায়ে হাত বোলায় । ঈশানের লজ্জা। সে হাতে টিপে পরীক্ষা করে পায়ের অক্ষমতা, লাদেনের ওষধির। ঈশানের ঘৃণা প্রভু বেলের সাদা দুটো হাতকে।

দিগন্ত বিস্তৃত চড়াই পেরিয়ে ভেড়াদের সাথে ফেরে মা থানে। কোলে সদ্যজাত সেই শাবক। লাদেনবাবা ওজু করছিল, জল অঞ্জলি নেমে আসে কনুই এ। কানে মুখে ছোঁওয়া তার। ভেড়ার দুধ দুইয়ে রেখেছে মা। হাওয়ায় ছুঁয়ে গেছে নমনীয় সম্ভ্রম চোখে নিষ্কাম ধৈর্য্যে তার পূর্বের পুরুষ। চেয়ে দেখেনি তার মুখের দিকে চোখ তুলে। মা'র খোঁজ এই বাস্তবতার লাদেনকে। পৃথিবীর কাল ক্ষেত্রে মানুষ বদলে যায় অথচ। 'আমি' বোধটুকুতো ধ্রুব সত্য। সেই সত্যের সামনে আজ লাদেনবাবা আর গির্জার আশ্রিতা মা। চারদুয়ারী প্রেমের সাক্ষী তাদের পূর্ব ইতিহাস।

রাঢ়ভূমির উঁচু নীচু ঢিবি ভেঙে আসে লিলিথের জিপ, তারা প্রগ্রেসিভ তাই আঁটোসাঁটো। ঈশানের সংকোচ, পাপ লিলিথের সাদা দুটো পায়ের নগ্নতায়। ঈশান কনফেস করে যিশাসের কাছে তার আকাঙ্ক্ষা ও লোভ।

গির্জার টাওয়ারে সরীসৃপের মত ওঠে ঈশান। সেই বড় চাবি ঘন্টায় দেবার দম। চিলেকোঠায় খুঁজে পায় এক সিন্দুক। তারমধ্যে সারি সারি সাজানো মানচিত্র। ঈশান মানচিত্র খোলে একটার পর একটা। বিছিয়ে দেয় বিশাল মেঝেতে। মেঝে ঢেকে যায় প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের বৈপরীত্যের রঙে। তার উপর ছড়ানো গির্জার রত্নভান্ডারের মধ্যে ঘুমিয়ে জরায়ুর আশ্রয়ে স্বপ্ন দেখে ঈশান – 'ওয়াফিদা নইদুকুম।'

নাহার বলেছিলতো হলুদ সুতো বেঁধে রাখবে গাছের ডালে। দূরে রেলের কামরা থেকেই দেখতে পাবে বশার। কিন্তু পৃথিবীরর বর্ষবলয় আরও তাড়াতাড়ি বদলায়। নাহার ফ্রক ছেড়ে শাড়ী পরে, তার ভেড়াদের নিয়ে চরাতে যেতে হবে আরও দূরে। গ্রামে এখন ভূমি সংস্কার হচ্ছে । ভেড়া চরাতে তাই যেতে হয় বনে। কখনো অবসরে ভেড়াদের ফেলে বিকেলে চলে যায় সেই গাছটার নীচে। রাত কথা বলে গাছের সাথে। শিকার উৎসবের রাতে ওঠে বুদ্ধপূর্ণিমার চাঁদ। সব মেয়েরা শিকারে। একা নাহার দৌড়ায়। তার কৈশোর পিছনে পুরুষ, বনের লতা, শাখা অথবা কাঁটারা ছুঁয়ে যায়, ছিঁড়ে যায় পোষাক ত্বক, তার বুক আর তাকে। দেখে রক্ত। চাঁদের আলোয় তার দু'পায়ের ফাঁকে চুঁইয়ে নেমে ভিজিয়ে দিচ্ছে টিলার পাথর। প্রেম হয় জমি জরিপ কালেক্টরের সাথে। ভাগ বাটোয়ারার পর সেও চলে যায়। জমির পূজো হয়। নাহারের ভেড়ার রক্তে ভিজিয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয় মাটিতে। লাঙল পড়ে জমিতে। নাহারের সিঁথিতে সিঁদুর। ফসল ওঠে বছরের পর বছর। নাহার জন্ম দেয় সাংসারিক নিয়মে ঈশানের। একার অপেক্ষায় বার বার ফিরে আসে গাছের তলায়। 

তুলসী মন্ডপ নিকোয় নাহার। নিকোনো উঠোন, সাজানো ঘর আল্পনায়। সাত বছরের সেই দিন। নাহার সুগৃহিনীর সমস্ত কাজ গুছিয়ে ধান সিদ্ধ ভরে মড়াইয়ে।শিশুকে ঘুম পাড়ায় ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর রূপকথায়। ঘর ছেড়ে ফিরে আসে তার নানির ভিটায়। কাল সূর্য উঠলে ট্রেন আসবে, আসবে বশার, হলুদ সুতো বেঁধে রাখতে হবে মাঠের শেষের সেই গাছে। বিস্তার হয়েছে, শীতে পাতা ঝরিয়ে আবার ভরে উঠেছে কচি সবুজ বসন্তে। কিন্তু এত রঙের মধ্যে কী করে চিনবে সে হলুদ সুতো? কত তাগড়া হতে হবে? 

নানির কাছে নাহারের প্রশ্ন, কেমন হবে সেই ধাগা?
পুরো গ্রামের মানুষের প্রশ্ন, কতটা হলুদ হবে সেই ধাগা?
পুরো জেলার মানুষের প্রশ্ন, কী রঙে রাঙাবে তাকে নাহার?
পুরো বিহারের প্রশ্ন, কীভাবে পারবে নাহার? 

ঈশান কারু হাতে বানায় মানতের ঘোড়া। খন্ড দেহ খন্ডে খন্ডে গলা, কান, লেজ যেন হয়ে ওঠে জীবন্ত লিলিথের ক্যামেরায়। এক্সপোর্ট করবে ঈশানের ঘোড়া। তাই ডকুমেন্টরি বানাচ্ছে শিল্পী ও শিল্পকর্মের। ঈশান লিলিথদের সাথে জিপে চড়ে চলে যায় গ্রামের সীমানায়। লাদেনবাবার থানে মানুষেরা গায় গান। এক আধ্যাত্মবোধে ঘুরতে থাকে লাদেনবাবাকে ঘিরে। লিলিথ ছবি তোলে সেই ধ্যানের, বট-পিপুল মাটির ঘোড়া। সুফী মঞ্চে নেচে ওঠে পঙ্গু ঈশান, লয় বাড়তে থাকে। মাথার উপর দু'হাতে তোলা 'আশা'।

গির্জার ছাদে ঘুড়ি ওড়ায় ঈশান। ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব আজ। আকাশ ছেয়ে গেছে ময়ূরপঙ্খী, পেটকাটা, চাঁদামারা ঘুড়িতে। লোটা ঘুড়ি, কাটা ঘুড়ি, ভো-কাট্টা ঘুড়ি। ঈশান আসে চিলেকোঠার ঘরে। এক আশ্লেষের শব্দে লাঠিতে ভর দিয়ে উঁকি মারে লিলিথের ঘরে। মেরী মূর্ত্তির নীচে যৌনতায় লিলিথ ও তার গার্লফ্রেন্ড মেভিল। পরস্পরকে ছুঁয়ে সংবেদনশিলতায়। ঈশান প্রার্থনা ঘরের ওল্ড টেস্টামেন্ট-এর পাতা ওল্টাতে থাকে। খুঁজে পায় গ্যাব্রিয়েল আর ইবলিশের সংজ্ঞা।

সকাল হতে আজান দেয় লাদেন। আল্লার সেই বানী অনুসরণ করে মেভিল। গির্জার ফটক খুলে ঢিবি পেরিয়ে চলে থানে। সেখানে উপস্থিত ফাদার বেল, যে মানুষের পাপ পুণ্যের কথা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে দেয় অথচ লাদেন ঈশ্বরের বানী ছড়িয়ে দেয় প্রকৃতিতে। হাতের দুটো চেটো মেলে লাদেন ফাদার বেলের সামনে। দু'হাতে ভিন্ন আঁকিবুঁকি। অথচ দু'হাত এক করলেই থাকেনা কোন বিভেদের রেখা। মানুষের চৈতন্য হোক। কিন্তু ফাদার বেলের মহাপ্লাবনে ডুবে যাবে পৃথিবী, সব মানুষ আর বোধ। লাদেনবাবা শোনায় নাজারেল আর হাদিসের আলদিনা হাদুর মুক্তির দূতের কথা। মহাপ্লাবনে খুঁজে পাবে মাটি, সেই মাটিতে রোপন করবে নতুন বীজ। 

মা ভেড়াদের সাথে বট-পিপুলের থানে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে সেখানে মেভিল্‌। পিঠের নগ্ন ত্বকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়েছে মৌচাকের মধু, কোন হুঁশ নেই। মা স্পর্শ করে, মেভিল সামনে তাকিয়ে দেখে নেই বাবা লাদেন, নেই ফাদার বেল। শুধু দুটো গাছ বট আর পিপুল, তার থানে মাটির ঘোড়া, মা ও ভেড়ার দল। পিঠের মধুতে আটকে অনেক প্রজাপতি। 

লিলিথ মেভিল ইলেকট্রনিক মনিটরে মিলিয়ে উঠতে পারেনা লাদেনের দৃশ্য আর ভাষ্য – পয়গম্বর ইবান ইসমাইল আল-বুখারি ইমান মালিক আবুহানিফা সইফিই ইবান হানবল মহম্মদ বিন লাদেন। দৃশ্যের অন্য মানুষদের ভাষ্য মিলে যায় সাউন্ড ট্র্যাকে। লাদেনবাবার শব্দ-ভাষ্য কেটে জুড়ে মিল খাওয়াতে হয় এডিটিং-এ। লিলিথ দেখায় আর এক ছবি।

'ওয়ামিন্‌হা নুখরিজুকুম তারাকান উখরা।'

নাহার কথা দিয়েছে হলুদ ধাগা বেঁধে রাখবে সাত বছর পর। শহর কোলকাতার লাল বাড়ী রাইটার্সের সামনে বিহারী জাতভাইদের মত বশার দিন আনে দিন খায়, ফুটপাতে শোয়। সকাল দশটা থেকে চাকরির আবেদনপত্র, জমি-জরিপের কাগজ বিক্রি করে। ভূমি সংস্কার দপ্তরের ঘরে ঘরে চা দেয়। মিছিলের লাল ঝান্ডা বয়ে হয়ে যায় দপ্তরের দারোয়ান। যে সব মানুষেরা দরজা পেরিয়ে আবেদনপত্র পৌঁছাতে পারে তাদের নজরানা জমিয়ে রাখে মাথার কাছে সাদাটুপির নীচে। প্রতিরাতে টাকা গোনে, সাত বছর পরে ফিরে যেতে হবে গ্রামে, সাঙা যে তার। বশার বিহারীকে খুব পছন্দ মন্ত্রীর, বাবুলোকেদের। কথা নেই মুখে বেশি, কাজ আছে। তাই মন্ত্রীর চাপরাসী থেকে ডানহাত আজ। যতধরনের ঝামেলা, অনিয়ম ও নিয়ম সামলে দিতে পারে অনায়াসে। সাত বছরের সঞ্চয় বশারের। মনে আছে এবার ফিরে আসার দিন। কিন্তু সেটা তো অসম্ভব। নিজের উর্দি-টুপি জমা দিয়ে বশার বেড়িয়ে পড়ে। তাকে আটকায় মন্ত্রীর লোক, তবু বশার পালায় হাওড়া স্টেশনে। অনুসরণ করে মানুষটাকে খুঁজে পায়না। হাজিরা খাতায় ঠিকানা খোঁজে সেখানে শুধু নাম বিহারী, কোন ঠিকানাই নেই। ট্রেনে চেপে শহর ছাড়ে বশার। রাত পেরোলেই ট্রেন ভোরের আলোয় পৌঁছে যাবে সেই দিগন্তের মাঠে। দূর থেকে দেখা যায় গাছটাকে। ট্রেন যত এগোয় ততই দ্বন্দ মনে বশারের। যদি হলুদ সুতো না থাকে গাছে। যদি নাহার সূতো না বাঁধে, কোন ধাগা না বাঁধে ভালবাসার চিহ্নের। বশার তবে পারবেনা, পারবেনা বেঁচে থাকতে। সে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেবে কিংবা ইস্পাতের লাইনে গলা। না না সে চলে যাবে এসব কিছু ছেড়ে অন্য কোথাও, অন্য কোন স্বান্তনায়। তবু পারবে কি বশার? 

নানি নাহারের যোগাড় করে অনেক হলুদ কাপড়। তাদের পাকিয়ে পাকিয়ে আঙুলের ফাঁকে মোটা এক হলুদ ধাগা। রাত ভোরে নাহার বেঁধে দেবে সেই ধাগা।

ট্রেন ছুটছে। বশারের উত্তেজনা ভোরের আলোর সাথে প্রখর। না সে নিজের চোখে তাকাতে পারবেনা গাছটার দিকে। মাঠ পেরিয়ে গেছে ট্রেন। নাহার বেঁধেছে তার হলুদ ধাগা। সকালের আলোয় নাহার আর বশার দুজনে দিগন্তে পুরো গাছটায় ভরে হলুদ ধাগায়। গ্রামের লোকেরা ধাগা বেঁধে দিয়েছে গাছটার সমস্ত ডালে ডালে। গাছটা আজ পিলা ধাগার বিস্তারে ডালপালাফুল সম্পূর্ন হলুদ। তার আশ্রয়ে নাহার-বশার।

অথচ তাদের সাঙা হয়নি। মিলতে পারেনি সিনেমার মানব-মানবী। একটা ঘোড়া তার খুরের শব্দে চমকে বিচ্ছেদ করেছে নাহারকে বশারের থেকে।

নদী যেন চিৎ হয়ে থাকা নারী। ভেসে আনে শব। পুরুষ মৃত উপুর ভাসে, চিৎ মেয়ে মানুষের শরীর মৃত্যুর পরও প্রকৃতি দেখে, দেখে আকাশের আল্লা-ঈশ্বর, দেখে কাক-শকুন-চিল। বন্যা হবে আবার গুমানিতে। জল বাড়ছে। মা লাশ ঠেলে স্নান করে ফেরে গির্জায়। ঈশান লোটা ঘুড়ি দিয়ে গির্জার ছাদে চুপিসারে বানায় দুটো কাগজের প্লেন। উঁকি মেরে দেখে চুল ঝাড়ছে মা, বান আসছে গুমানিতে। গির্জার টাওয়ারে উড়িয়ে দেয় কাগজের প্লেন। সেই প্লেন ভিন্নকাল ভিন্নক্ষেত্রে উড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বোম্বার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিমানের পেট খুলে ফেলে বোমার মালা, গালফ ওয়ারের স্মার্ট মিশাইল আর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের আত্মঘাতী দুটো বোয়িং। যেন হিরোসিমা-নাগাসাকির আনবিক বিষ্ফোরণ, তথ্যচিত্রের ধ্বংসের শেষে ঈশানের কাগজের প্লেন এসে আঘাত করে থানের দুটো লম্বা মানতি ঘোড়াকে। ঘোড়া দুটো ভেঙে পড়ে তাদের সভ্যতা সংকটে।

গুমানি নদীর জল ফেঁপে উঠেছে, ডুবে যাচ্ছে লাদেনের থান। নদী গর্জে ভাসিয়ে নিয়েছে গির্জাকেও। লাদেনবাবার নির্দেশ মানুষদের নতুন ভূমিতে যেতে। ঈশান ভেলা এনেছে । তাতে তোলে বাবা ও মাকে আর তার পশুদের। ভেড়া শিশুটা নেই। সেই শাবকের মা চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় জলেই। গির্জার ঘন্টা পাগলের মত নাড়তে থাকে ফাদার বেল। ভেড়া শাবককে খুঁজে পায় মৃত। ফাদার বেল তার সিন্দুকের সম্পত্তি টেনে হিঁচড়ে বার করে আনে। ডুবে যায় সিন্দুকের সাথে। থেকে যায় ফাদার বেলের গির্জার চূড়ায় যীশাস। আর জলে ভাসা বিশাল যুদ্ধ আগ্রাসন শোষনের মানচিত্রের রং ও গতিপথ। মৃত ভেড়া শাবকের হৃৎপিন্ড, ঘিলু, পেট চিরে খড় আর বাখারির কাঠামোয় দুধ দোয়ায় মা। ভেড়া-মা চাটে মৃত শাবকের দেহ। ভেলা ভেসে চলে অথৈ জলে, ঈশান দূরে দেখতে পায় এক দ্বীপ জেগে আছে। সেই হলুদ সুতো বাঁধা গাছ তার নীচে যৌতুকের নুপূর পরা ঘোড়া। সে গাছের নীচে লাদেনবাবা চিনতে পারে প্রতিশ্রুতির নাহার-মাকে। অপেক্ষা ছিল কোচর ভরা মুড়ি নিয়ে। সে মুড়ি খেয়ে গেছে কাকপক্ষী, পিঁপড়েরা। অথচ প্রতিশ্রুতির বশার তো আসেনি। 

লাদেন বাড়িয়ে দিয়েছে হাত মা'র হাতের দিকে। বিভিন্ন স্থান কালের প্রেক্ষাপটে সে হাত ছুঁয়েছে পরস্পর। আজ আত্ম চৈতন্যে কন্ঠিবদল দুজনের। মস্তক মুন্ডিত দুই নরনারী। কারো প্রেক্ষাপটে সবুজ ধানের ক্ষেত অপরের প্রেক্ষাপটে ঊষর ভূমি। শহরের প্রেক্ষাপটে মানুষে মানুষে অজানা ভীড়। তারই মধ্যে দুটো প্রাণ খুঁজে পেয়েছে তাদের হলুদ ধাগায় গাছকে। আর পশুপালক ঈশান সেই ঘোড়ার নুপূর খুলে নেচেছে ঘোড়া নাচ, হাতে তার 'আশা'। 'নতুন ভূমি নতুন সভ্যতা নতুন পৃথিবীর আশ্বাস।'