name
প্রথম পাতা গল্প  

 

 

 

 

 

দেবাশীস চক্রবর্তী
 
 অনাবাদী জমি

 

 

 

অন্যান্যদের গল্প

অলোক গোস্বামী

আনোয়ার সাদাত শিমুল

দেবাশিস চক্রবর্তী

বিপুল দাস

শিবাশীষ রায়

শুভময় সরকার

 

অনুসন্ধিৎসা হইতেই যে জ্ঞানের জন্ম হয়, এ বিষয়ে আনন্দচন্দ্রের কোন প্রকার দ্বিধাবোধ আর নাই বর্তমানে। প্রায় মধ্যবয়সে উপনীত আনন্দ তাহার স্মৃতি নামক সেই অদৃশ্য যন্ত্রটির চাকা ঘুরাইয়া জীবনের প্রথম জ্ঞানের ঘটনাটি তাহার মানসপটে প্রস্ফুটিত করিতে সমর্থ হইল। তাহা আগুন। পিতামহী নিয়মিত স্নানান্তে ঠাকুরঘরে পূজা-আর্চা করিতেন। সে একদা পূজার ঘরে ঢুকিয়া তাহার ঠাকুমার অনুপস্থিতিতে দিয়াবাতি লইয়া ঠাকুমার অনুকরণে প্রদীপ জ্বালাইবার প্রচেষ্টা করিল এবং সেই প্রজ্বলিত শলাকার বিচ্ছুরিত অগ্নুত্তাপে যারপরনাই অঙ্গুলিতে জ্বলন অনুভবে ভীত হইয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। মা পাকঘরে তখন। সম্ভবতঃ পুত্রের আর্তনাদ শুনিয়া ত্রস্তপদে পূজাগৃহে ঢুকিয়া আনন্দের এই কান্ড দেখিয়া বলিলেন, ওরে পোড়ামুখ, দিয়াশালাই নিয়ে অগ্নিকান্ড করতে চাস! উফ, এখন তো তোর হাতের কাছে কিছু রাখা যাবেনা দেখছি। 

পিতামহী বিনোদবালাও দৌড়াইয়া আসিলেন। আদরের নাতিটির সুরক্ষার কথাটিই তাহার মাথায় আসিল। বলিলেন, গালাগাল না দিয়ে আগে দেখ ছেলেটার হাত পুড়ল কি না! 
- পোড়াই উচিৎ, বলিয়া মা আনন্দের হাতটি নিজের করমধ্যে লইয়া কহিল, দেখি ফোস্কা পড়েছে কি না!
- জল দিওনা, বার্ণল লাগিয়ে দাও এক্ষুনি, পরামর্শ দিলেন বিনোদবালা। 

সেই প্রথম অনুভূতি বিষয়ক জ্ঞানলাভ এবং অগ্নি সম্পর্কিত ধারণা প্রাপ্তি। অঙ্গুলিতে একটি জলফোস্কা পড়িয়াছিল বলিয়া, আনন্দ প্রদীপ অথবা কোনপ্রকার অগ্নি সম্বন্ধিত বস্তুর নিকটে যাইবার দুঃসাহস দেখাইত না। 

আরও খানিকটা সময় অতিক্রান্ত হইলো। তাহার বুদ্ধি বিবেচনা সাধারণের তুলনায় কিঞ্চিৎ ঊন থাকিবার কারণে বন্ধুদের অসৎ পরামর্শগুলিকে নির্দ্বিধায় অনুসরণ করিতে গিয়া বিপাকে পড়িতে হইতো। যদিও ছাত্র হিসাবে আনন্দচন্দ্র উন্নত প্রকারের ছিল। স্বভাবতই কৌতুহলস্পৃহা তাহার বড় হইয়া উঠিবার সঙ্গে তাল মিলাইয়া তাহার জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে সে হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষাতে তারকা খচিত হইয়া প্রথম শ্রেনিতে উত্তীর্ণ হইয়া মেধার পরিচয় প্রমাণ করিয়াছিল। নিজ কৃতিত্বে চিকিৎসা বিদ্যার প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও সফলকাম হয়। তাহার পিতৃদেব ও শিক্ষককুল প্রত্যেকেই আনন্দের সাফল্যে গর্বিত এবং উৎফুল্লিত হইয়া অভিনন্দন জানাইতে কুন্ঠা করিলেন না। কলিকাতার মেডিক্যাল কলেজে পড়িতে যাইবার নিমিত্তে আনন্দকে তাহার সাধের শহর, আবাল্য বন্ধুবান্ধব ও নিকটজনদের সঙ্গ ত্যাগ করিয়া বিশাল মেট্রোপলিটান শহরে যেন তাহার বিদ্যালয়ে পড়া 'ফিস আউট অফ্‌ ওয়াটার' এর ন্যায় মনে হইতে লাগিল। কলেজের ছাত্রাবাসে নানাপ্রকারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াইতে কিঞ্চিৎ সময় লাগিল বটে, তবে তাহাদের জনা কয়েকের সঙ্গে সহজ হইতে তাহার রুমমেট প্রবালের উল্লেখ না করিলেই নয়। প্রবাল সখ্যের ব্যাপারে সহযোগিতার হাত যথাসম্ভব সম্প্রসারিত করিয়া আনন্দের অযাচিত উদ্বেগের নিরসন করিয়াছিল। 

এই প্রবালই আনন্দের অন্যতম গুরু। প্রেম, সহবাস, নারী শরীরের নানান রহস্য ইত্যাদি বিষয়ে পাঠক্রমের অ্যানাটমি বিদ্যা অপেক্ষা অনেক সহজ এবং সরল ব্যাখ্যা সে অবসরের নানা মুহূর্তে আনন্দকে দিতে থাকিল। একদিন প্রবাল বলিল, শোন মেয়েদের শরীরকে ভাল করে না জানতে পারলে মনকে জানা যায়না। অ্যানাটমি হল থিওরী। তা থেকে তুই হয়ত সুপারফিসিয়াল আইডিয়া করতে পারবি। তবে, হোলসাম আইডিয়া নিতে হলে প্র্যাক্টিক্যাল নলেজ মাস্ট। 
-  প্র্যাক্টিক্যাল নলেজ বলতে? প্রশ্ন করিয়াছিল আনন্দ।
-  মানে, এই সহজ কথা বুঝতে পারছিস না!
-  না, ইচ্ছে করলেই মেয়ে ধরে পরীক্ষা করা যায় না কী! মেয়েরা কি গিনিপিগ? 
প্রবাল মিস্টীক হাসির রেশ তাহার ওষ্ঠাগ্রে আনিয়া উত্তর করিয়াছিল, তুই একটা গোবর গনেশ। আরে, বুদ্ধি থাকলে উপায় হয়। আমি কী করে জানলাম? এমন তো নয়, যে মেয়েরা আমার সামনে সেধে এসে নিজেকে উন্মুক্ত করে বলেছে, নাও আমার ওপর পরীক্ষা চালাও। কায়দা করে ওটা আমাকেই করে নিতে হয়েছে। কথাগুলি বলিয়া প্রবাল আনন্দকে তাহার অতীতের যে সমস্ত বিবরণ দিয়াছিল তাহা যেমন রোমহর্ষক তেমনই উত্তেজক। আনন্দের ন্যায় একজন সুস্থ স্বাভাবিক উদ্ভিন্ন যৌবন পুরুষের মনে এই বিষয়ে বিক্রিয়া না হওয়াটাই আশ্চর্যজনক। কিন্তু, ছোট শহরের এক গুডবয় কী করিয়া তাহার মূল উদ্দেশ্যকে দূরে সরাইয়া গোল্লায় যায়! প্রবাল হইতে নিজেকে তফাতে রাখিয়া সে নিজ পাঠক্রমে মনোনিবেশ করিবার প্রয়াস পাইল।  

তৃতীয় বর্ষে উঠিয়া আর পাঁচজনের মত সেও দশচক্রে ভগবান ভূতের দশাপ্রাপ্ত হইল। কোন এক সেনা অফিসারের আদুরী তনয়া ঈশিতার প্রেমে পড়িল। সুতনু, সুবেশা ও বিদ্যুৎবৎ চপল এই কন্যাটি নিজেই আনন্দকে প্রেম নিবেদন করিয়া তাহাকে হতচকিত করিয়া দিল। আসলে, ঈশিতা পিতার চাকুরি সূত্রে বহু স্থানে ঘুরিয়া ও নানান বন্ধু বান্ধবীর সংস্পর্শে আসিয়া মডার্ণ হইয়া গিয়াছে। তাহার চলন বলন আকর্ষনীয়। সে ক্ষেত্রে আনন্দের ন্যায় একজনের প্রতি ঈশিতার দৃষ্টি পড়িবার কারণ কী হইতে পারে, ইহা ভাবিয়াই কোন সিদ্ধান্তে যেমন সে তৎক্ষনাৎ আসিতে পারিল না, তেমন প্রতি উত্তর দিতে বিরত থাকিল সে। কেবল কহিল, উত্তরটা তোলা থাক আপাতত।
-  কেন, আমি কী খুবই কুশ্রী?
-  উল্টোটা, তুমি এতই সুন্দরী এবং স্মার্ট যে, আমার মত একজন সাধারণ ছেলের পক্ষে হয়ত বাঁদরের গলায় – বাকীটুকু ব্যক্ত করিবার পূর্বেই ঈশিতা বলিল, বাড়িতে আয়না নেই বুঝি? আচ্ছা আমি প্রেজেন্ট করব একটা। দেখে নেবেন। এই বলিয়াই সে পিছন ফিরিতে উদ্যত হইয়াছিল। হঠাৎ ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, ডু ইউ সাফার ফ্রম ইনফিরিয়টি কমপ্লেক্স? নো। ইউ শুডন'ট। মুখে যথাসম্ভব হাসি ছড়াইয়া, লাস্যময়ী ঈশিতা আনন্দের কনফিডেন্স বৃদ্ধি করিয়া মন্তব্য করিল, ইউ আর অ্যাজ হ্যান্ডসাম অ্যাজ উত্তমকুমার।

ঈশিতার কথায় আনন্দ উৎফুল্লতা মুখে প্রকাশ না করিলেও, তাহার হৃদয় ও অভিব্যক্তিতে যে ইহা প্রকাশ পাইল, সে বিষয়টি সমুখস্থ দন্ডায়মান আধুনিকাটির গোচরে আসিল। ঈশিতা বেশ জোর দিয়াই কহিল, না না ফ্ল্যাটার করছিনা।  

সেই আধুনিকার নাগপাশ হইতে আনন্দ নিজেকে মুক্ত করিতে পারে নাই। বরং, সে দিনে দিনে ঈশিতার যাদুমন্ত্রের বশ হইয়া, তাহার মন ও শরীর সমর্পণ করিয়া দিয়া, এক ভিন্ন ব্যক্তিত্বে ও রতিক্রীড়ায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিতে পরিণত হইয়াছিল। অ্যানাটমির সমস্ত গুহ্যবিদ্যাতে মাত্র কুড়ি বৎসর বয়ঃকালের মধ্যে পারদর্শী হইয়া উঠিয়াছিল। অবশ্য, এই কারণে তাহার লেখাপড়ার বিশেষ ক্ষতি হয় নাই। পঞ্চম বর্ষে উঠিতেই একদিন ঈশিতা, যাহাকে সে ইতিমধ্যেই তাহার সম্ভাব্য স্ত্রী বলিয়া ভাবিতে শুরু করিয়াছিল, ক্যান্টিনের কোনের টেবিলে বসিয়া, উষ্ণ কফির কাপে ওষ্ঠ ভিজাইয়া সহজেই কহিল, শোন, আমি আর তোমার সঙ্গে অ্যাফেয়ারে ইন্টারেষ্টেড নই। আই ফিল, উই শ্যুড বি অ্যাপার্ট। অবশ্য, ফ্রেন্ডশিপে আপত্তি নেই আমার।  

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত ঈশিতার উচ্চারিত শব্দগুলি আনন্দের চিন্তাজগতকে আলোড়িত করিয়া দিল এক লহমায়। কী বলা উচিৎ প্রত্যুত্তরে, তাহা স্থির করিতে করিতে সে কন্ঠ হইতে নাদ তুলিল, উম ম ম ? 

ঈশিতা ততোধিক স্বাভাবিক স্বরে বলিল, আসলে কী জান আনন্দ, মাই পেরেন্টস উডন'ট লাইক ইউ অ্যাজ দে'র সন-ইন-ল। মিডল ক্লাস মেন্টালিটির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অসুবিধে হবে। প্লিইজ টেক ইট ইজি। আই অ্যাম সরি আনন্দ। বলিয়া সে তাহার হস্তটি নিজ হস্তে লইবার প্রয়াস পাইয়াছিল। মধ্যবিত্ত মানসিকতার আনন্দচন্দ্র ইষৎ কূপিত কন্ঠে বলিয়াছিল, এতদিন বিছানাতে শুয়ে সে কথাটি মনে হয়নি তোমার? না কি সে প্রয়োজন মিটে গেছে? না কি নতুন বেড পার্টনার জোগাড় হয়েছে?  

নতুন বন্ধু কিংবা শয্যাসঙ্গী যে ঈশিতার জুটিয়াছিল সে সত্য জ্ঞাতে আসিতে সময় লাগে নাই। আনন্দ খবর পাইয়াছিল, ঈশিতা একজন শিল্পপতি পুত্রকে তাহার নবতম শিকার করিয়াছে, সংবাদটি তাহাকে দিয়াছিল তাহারই একদা রুমমেট ও সাময়িক বিচ্ছেদিত বন্ধু প্রবাল। পরে মন্তব্য করিয়াছিল সে, ঈশিতা হচ্ছে সেক্স ম্যানিয়াক। শি ইউজড ইউ। অবশ্য তাতে তোর কোন লোকসান হয়নি। বরং এক্সপিরিয়েন্সড হয়েছিস। আখেরে কাজে দেবে।  

এই ঘটনা হইতে আনন্দের উপলব্ধি হইল যে, বিশ্বে প্রকৃত প্রেম বলিয়া কিছুই নাই। সবই দেহ সর্বস্ব। কামনা বাসনার উৎস হইতে যে পারস্পরিক আকর্ষণের ঘটনা ঘটে, যাহাকে ইংরাজী ভাষায় কেমিস্ট্রি বিটুইন টু সোলস বলা হয়, তাহা সম্পুর্ণত শরীর আশ্রয়ী। সেই প্রসঙ্গে তাহার জর্জ বানার্ড শ'র একটি উক্তি স্মরণে আসিল, ম্যারেজ ইজ নাথিং বাট লিগ্যাল প্রস্টিটিট্যুশন এবং এই কারণেই আনন্দচন্দ্র এম বি বি এস উত্তীর্ণ হইবার পর হইতে ইন্টার্নশিপ ও এম এস করিবার পরও বেশ কিছুকাল ধরিয়া নারীসঙ্গ করিলেও প্রেম বা বিবাহের নিকটস্থ হয় নাই। স্ত্রী বিশেষজ্ঞ হইবার কারণে সে নারী দেহের সমস্ত গুহ্যবস্তু ও রহস্য রপ্ত করিয়া ফেলিয়াছিল।  

একবার এক নার্স, নাম কেয়া পালিত তাহার ঘনিষ্ঠ হয়। কিছুকাল উভয়েই একটি পৃথক বাসা ভাড়া করিয়া বাস করিতে থাকে। নিকট জনেরা অনুমান করেন, তাহারা বোধকরি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। কেয়া নিজেও আনন্দের সঙ্গে তাহার বিবাহ হইবে এমন স্থির বিশ্বাসে পৌঁছিয়াছিল। শেষে, এক রাত্রে কেয়া শয্যায় আনন্দকে বলিল, এবার আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলা উচিৎ।
-  কেন? তোমার পেটে কি বাচ্চা এসেছে? আনন্দ প্রশ্ন করে।
-  তা আসেনি, কিন্তু এভাবে আর কতদিন? লোকেই বা কী বলবে!
-  আমি কী কোনদিন তোমাকে বিয়ে করবো বলেছি?
এই প্রশ্নে কেয়া যেন সরাসরি তাহার গন্ডদেশে একটি চপেটাঘাত খাইল। বিস্ময়াবিষ্ট কন্ঠে জিজ্ঞাসা করিল সে, তাহলে আমাদের এই সম্পর্কের মানে? 
-  লিভ টুগেদার।
-  জাস্ট লিভ টুগেদার? উষ্মা প্রস্ফুটিত হইল কেয়ার কন্ঠস্বরে, লজ্জা করেনা এমন কথা বলতে! আমি কি প্রস্টিট্যুট?
- কে বলেছে তুমি প্রস্টিট্যুট? ইউ আর মাই ফ্রেন্ড। বিদেশে যে ছেলে মেয়েরা লিভ টুগেদার করে, তারা কি সবাই বিয়ে-থা করে? আত্ম সমর্থনের প্রচেষ্টা আনন্দচন্দ্রের।
-  তুমি কোন বিদেশি আনন্দ? তোমার মা বাবা কোন লিভ টুগেদার করতেন?
কেয়ার এই প্রকারের উক্তিতে আনন্দ রুষ্ট হইল এবং প্রতিবাদ করিয়া কহিল, সাবধান বলছি, মা বাপ তুলে কথা বলবেনা।

ইতিমধ্যে কেয়া শয্যা ত্যাগ করিয়া গৃহের মধ্যস্থানে দাঁড়াইয়াছে। আমিও দেখে নেব তুমি কতবড় ডাক্তার। কোর্ট কাছারি করব। সবাইকে ডেকে বলব। শয়তানী করবার জায়গা পাওনি! অসভ্য, ইতর কোথাকার!
কেয়া ক্রোধে গজগজ করিতে করিতে দরজার ছিটিকিনি খুলিয়া অবিন্যস্ত শাড়িটি বিন্যস্ত করিতে উদ্যত হইলে আনন্দ বোধকরি বিপদের আশঙ্কা করিল। কিঞ্চিৎ নরম সুরে কহিল, অযথা রাগারাগি করে রিলেশনটা স্ট্রেইনড করছো।
-  আমি করছি? তোমার ওপরের সুন্দর চেহারাটার ভেতরে যে এত নোংরা তা জানা ছিলনা। হতাশায় কেয়ার বুকের মধ্য হইতে কান্না বাহির হইয়া আসিল। সে দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া তড়িৎ বেগে বাহির হইয়া গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আনন্দচন্দ্র প্রায় অস্ফুটে শেষ করিল এই বলিয়া, কেয়া যেওনা, শোন প্লিইজ কেয়া ---। 

কেয়া শোনে নাই। তীব্র অভিমান এবং হতাশায় সে আনন্দের ঘর সেই যে ত্যাগ করিয়াছিল, তাহার পর আর কোনদিন একটি বারের জন্যেও এই পথে আসে নাই। তবে আনন্দের বিরুদ্ধে কেয়া প্রতিশোধমূলক কোন ব্যবস্থাও লয় নাই। আনন্দকে সে দেখিলেই অজানা অচেনা কোন ব্যক্তির ন্যায় ব্যবহার করিত। একদিন একটু নির্জন স্থানে দুইজনে সমুখস্থ হইতেই আনন্দ কহিল কেয়া, তোমার সঙ্গে ক'টা কথা ছিল।  

কেয়া না শুনিবার ভান করিয়া পাশ কাটিয়া যাইবার উপক্রম করিতেই আনন্দ তাহার বাঁ হাতটি ধরিল।
-  অসভ্যতা করবেন না, লোক ডাকব কিন্তু। বলিয়া কেয়া হাত ছাড়াইয়া লইল।
-  আমার কি দোষ, বলবে তো!
-  আহা, ভাজা মাছ উলটে খেতে জানেন না! কচি খোকা! ভেংচি কাটিল কেয়া। মধু খাওয়া শেষ। এখন অন্য ফুলে যান। সব ফাঁস করে দেব আমি। হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে দেব।

আনন্দ বিব্রত বোধ করিল। চারিপাশে একবার চোখ ফিরাইয়া দেখিল। ধারে কাছে কেহ নাই। কাজেই সাহস করিয়া সে কহিল, শোন কেয়া সামান্য কথা কাটাকাটির জন্যে এতদিনের সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলবে?
-  সামান্য কথা কাটাকাটি।
-  নয়?
-  অবশ্যই না। তুমি লিভ টুগেদার ছাড়া আর কিছুই চাওনা। আমি এ সম্পর্কে রাজী নই। তোমার কাছে মেয়ে মানেই সেক্স। এর বাইরে কিছু ভাবতে শিখেছ তুমি? শরীর ছাড়াও যে মন বলে একটা জিনিস আছে, কোনদিন ভেবে দেখেছ? কেয়া প্রতিবাদ করিয়া উঠিল। তাহার কন্ঠস্বর উন্নীত হইল।

গত্যন্তর না দেখিয়া আনন্দ বলিল, আস্তে, উত্তেজিত হচ্ছ কেন? আই অ্যাডমিট মাই ফল্ট।
-  তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
-  ও নিয়েতো ভাবিনি। ভাবব। আই নীড সাম টাইম। বিয়েটা হল একটা ইসে, মানে বুঝতেই পারছ। একটু চিন্তাভাবনা না করেই কী ঝট করে কোন ডিশিসন নেয়া যায় এতবড় বিষয়ে। এসো সন্ধ্যেবেলা, কথা হবে।

কোন প্রত্যুত্তর করিলনা কেয়া। একবার কেবল আনন্দচন্দ্রের মুখপানে চাহিয়া তাহার মনোভাব বুঝিতে চেষ্টা করিল। অতঃপর সে নীরবে স্থান ত্যাগ করিল।
 
আনন্দ সেইদিন সন্ধ্যা কালে কেয়ার পথ চাহিয়া রহিল। কেয়া আসিলনা। একান্তে তাহার কর্ণকূহরে কেয়ার সেই উক্তি নিয়ত প্রতিধ্বনিত হইতে থাকিল। 'শরীর ছাড়াও মন বলে যে একটা জিনিস আছে, কোনদিন ভেবে দেখেছ?' ভাবিয়া যে সত্যই দেখে নাই তাহা প্রতিপন্ন হইতে সময় লাগে নাই। কেয়া বিশ্বাসভঙ্গের কারণে আনন্দকে দূরে সরাইয়া দিল। পক্ষান্তরে, আনন্দ কোনপ্রকার অনুতপ্ত না হইয়া নিজের শরীরবৃত্তিকে অগ্রাধিকার দিয়া অন্য আর একটি নারীর সহিত নিজেকে জড়াইয়া ফেলিল। ইহার সপক্ষে তাহার এম এস পাঠক্রম ও ডাক্তার হইবার যোগ্যতা কাজে লাগিল।
গাইনোকলজি শাস্ত্র যাহা মূলত নারী শরীরের রোগ লইয়া কার্য করে তাহাতে ডিগ্রী লাভ করিয়া মেডিক্যাল কলেজের চাকুরিতে বহাল হইবার অব্যবহিত পরেই আনন্দের পিতামাতা তাহার বিবাহের সম্বন্ধ করিলেন। আনন্দ প্রথমে মৃদু আপত্তির সুরে কহিল, এখনি এসবের কি প্রয়োজন আছে? একটু সেটলড হয়ে নিই।

মা বলিলেন, বয়স তোমার জন্য বসে থাকবে? আমরা মেয়ে দেখছি। ভাল মেয়ে, সুন্দরী ও সুশিক্ষিতা। ফ্যামিলিও ভাল। তুমি একবার কেবল এসে দেখে যাও।

তোমরা দেখলেই হবে, আমার আর আলাদা করে দেখার দরকার নেই। আনন্দ ঘুরপথে সবুজ সংকেত দিল। নির্দিষ্ট দিন ও লগ্নে কৃষ্ণনগরের দর্শন শাস্ত্রের এম এ সুরূপা মৈত্রেয়ীর সঙ্গে তাহার বিবাহ পর্বটি সমাধা হইল। কিন্তু, আনন্দচন্দ্রের জীবনে কোন প্রকার বিশেষ পরিবর্তন লক্ষিত হইল বলিয়া মনে হইল না। পক্ষান্তরে আনন্দচন্দ্র নামক যুবা চিকিৎসকটি সমস্তদিনের কর্ম ব্যস্ততার পর, রাত্রিকালের বিনোদনের নূতন সঙ্গিনী কে সেইভাবেই ব্যবহার করিয়া দিনাতিপাত করিতে থাকিল। 

প্রায় দুই বৎসর অতিক্রান্তির মুখে মৈত্রেয়ীর একটি পুত্র সন্তান হইল। সন্তান জন্মের চারমাস পূর্ব হইতে পিত্রালয়ে স্ত্রীর অবস্থানকালে স্বভাবশতঃ আনন্দচন্দ্র তাহার চেম্বারের রিশেপশনিস্ট তরুনীর  সহিত ঘনিষ্ট হইল এবং এই ঘনিষ্টতা মৈত্রেয়ী গৃহে প্রত্যাবর্তনের পরও হ্রাস পাইল না বরং বৃদ্ধি পাইল।

শিশু পুত্র এক বৎসরে উপনীত হইল। একরাতে আনন্দের সঙ্গে মৈত্রেয়ীর সামান্য কারণেই বচসা শুরু হইল। মৈত্রেয়ী অভিযোগ করিল, ইদানিং দেখছি তুমি যেন একটু আলগা থাকছ! ব্যাপার কী?
-  ব্যাপার তো কিছু নয়। তুমিই ছেলে নিয়ে ব্যস্ত। আমার জন্য সময় আছে তোমার?
- নেই! অদ্ভুত কথা! বাড়ি ফিরছ, খেয়ে দেয়ে টায়ার্ড বলে শুয়ে পড়ছ ও ঘরের খাটে।
-  টায়ার্ড হলে কী করব? মন্তব্য করে আনন্দ।
-  তাই তো, আমি তো আর টায়ার্ড হইনা। মেয়েদের অবশ্য টায়ার্ড হতে নেই, মৈত্রেয়ী ক্ষুব্ধ হয়।
আনন্দ বলে, ছেলের পরিচর্যার সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর সুখের কথাও ভাবতে হয়। ভেবেছ কখনো?
-  সুখ মানে কেবল শরীর আর সহবাস?
-  আমি কি সে কথা বলেছি? পালটা প্রশ্ন করে আনন্দ।
-  মুখে না বললেও বুঝতে অসুবিধা হয়না। বিশেষ করে গত দু'বছরের বেশি তোমাকে যতটুকু জানি।
-  দর্শন পড়লে মনস্তত্ববিদ হওয়া যায়, জানা ছিলনা।
 
তর্ক বৃদ্ধি পাইতে থাকে। অবশ্য এর জন্য তারও দরকার ছিলনা। সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন যেকোন লোকই বোঝে এসব, বলিয়া মৈত্রেয়ী স্থান ত্যাগ করিল। 

আনন্দ এইসব ক্ষুদ্র বিবাদকে গুরুত্ব দেয় নাই। সে নিজের মতই চলিবার প্রয়াস করিয়াছে। পুত্র বছর পাঁচেক হইবার পর তাহাকে দার্জিলিং শহরের নামি বোর্ডিং স্কুলে দাখিল করাইয়া পিতৃদায়িত্ব পালন করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিয়াছে। পসার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আনন্দচন্দ্র ক্রমশঃ বহির্মুখী হইয়া উঠিল। স্ত্রীর প্রতি যে সামান্যমাত্র কিছু কর্তব্য রহিয়াছে তাহাও বিবেচনাধীন না হইবার কারণে মৈত্রেয়ীর সঙ্গে একটা মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হইল। মৈত্রেয়ী পতির অর্থকে নিজ বিনোদনের প্রয়োজনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বহিমুর্খী হইতে আরম্ভ করিল। তাহার দুই একজন অত্যাধুনিকা বান্ধবীর পরামর্শে এক সুপুরষ যুবকের প্রেমে পড়িল। ফলে, আনন্দ সম্পর্কে তাহার আগ্রহে ভাটা লক্ষ্য করা গেল। এই লইয়া স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রায়শই গভীর রাত্রিতে কলহ দেখা দিত। অবশ্য পরদিন প্রাতে উভয়েই মিথ্যা আনুগত্যের ছলনা করিয়া স্বাভাবিকত্বে প্রত্যাবর্তন করিত। সেই কারণেই প্রায় দশটি বৎসর পারিবারিক জীবনের সমস্ত অনভিপ্রেত ঘটনার সমাপ্তি টানিয়া আইনগত বিচ্ছেদকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হইল আনন্দ। মামলাটি কোর্টে আনিয়াছিল মৈত্রেয়ীই। অভিযোগ ছিল, স্ত্রীর প্রতি মানসিক নির্যাতন। থানা পুলিশ সেই অর্থে তেমন কিছু না হইলেও আনন্দচন্দ্র যে কিছুটা সামাজিক অস্বস্তির মধ্যে পড়িয়াছিল, একথা বলাই বাহূল্য। পিত্রালয় হইতে উকিলের নোটিশ আসিবার পর সে সরাসরি টেলিফোনে মৈত্রেয়ীর সঙ্গে বার্তালাপ করিয়াছিল।
-  এটা কি করলে মৈত্রেয়ী?
-  খুব অন্যায় করেছি বুঝি?
-  আমার সঙ্গে না পোষালে, মুখে বললেই পারতে। এফ আই আর, উকিলের নোটিশ এসবের কি দরকার ছিল? আমি কি তোমাকে ডিভোর্স দিতামনা? আনন্দ বলিয়াছিল।
-  সে তুমি জান। তবে তোমার মত চরিত্রহীনের বিরুদ্ধে যে অন্য স্টেপ নেইনি, সেটাই অনেক। ভেবেছ, আমি কোন খবর জানতাম না? জেনেও চুপ করে থেকেছি কাদা ছিটোবে বলে।

সংক্ষিপ্ত কথোপকথনেই আনন্দ অনুধাবন করিয়াছিল, তাহার বিচক্ষণ স্ত্রীর অজ্ঞাতে কিছুই নাই। তাহার সমস্ত ছল চাতুরি সে ধরিয়া ফেলিয়াছে।
 
বিবাহ বিচ্ছেদ আপোষেই হইল। পুত্রের দায়িত্ব পাইল মৈত্রেয়ী। আনন্দ তাহার পর হইতেই নিজেকে কেমন যেন অসহায় ভাবিতে লাগিল। একদিন সে সংবাদ পাইল যে, মৈত্রেয়ী না কি এক সুদর্শন যুবকের সঙ্গে প্রেমে লিপ্ত এবং বিচ্ছেদপর্বের কিছুকাল হইতেই চলিতেছিল। জ্ঞাত হইবার পর খানিকটা ক্রোধের বশবর্তী হইয়া সেই রাত্রিতে সে মৈত্রেয়ীকে টেলিফোন করিল।
-  আমাকে তো চরিত্রহীন বলে নিজের পথ পরিস্কার করে নিয়েছ। কিন্তু নিজের বেলায়?
-  সে পথ তুমিই দেখিয়েছ আনন্দ। একটা রক্ত মাংসের মানুষ বছরের পর বছর প্রতারণার শিকার হয়ে থাকবে? এই ভাবনা তোমার এল কী করে? না কি তোমরা পুরুষেরা এখনো নারীকে দেহ সর্বস্ব অবলা জীব বলেই মনে কর। দিন এখন পাল্টেছে।
-  তুমি কি ডিসিশন নিয়ে ফেলেছ? প্রশ্ন করিল আনন্দ।
-  কী বিষয়ে?
-  চিরন্তন না কি, তাকে বিয়ে করবার ব্যাপারে?
-  ইয়েস, ডেট ফিক্সড হয়ে গেছে।
-  একটা সেকেন্ড থট দিলে হোত না? অনুরোধ করিল আনন্দ। ছেলেটার কথা ভেবেও যদি আমরা আবার –
-  তা হয়না। যে মানুষের কাছে মন বা হৃদয়ের কোন মূল্য নেই, তার সঙ্গে জীবন কাটিয়ে বাকী সময় কষ্ট পেতে চাইনা আমি। এনাফ ইস এনাফ। গুড নাইট। রিসিভার নামাইয়া রাখিয়াছিল মৈত্রেয়ী। 

ইহার পর, প্রায় বৎসরাধিককাল আনন্দচন্দ্র তাহার অনভ্যস্ত একাকীত্বে মানসিক যন্ত্রণা ব্যাতিরেকে কিছুই পায় নাই। কেননা, সে জ্ঞাত হইয়াছিল তাহার বিচ্ছেদিত স্ত্রী এবং তাহার একমাত্র পুত্র সন্তানের মা, মৈত্রেয়ী তাহার প্রেমিক ও বন্ধুকে বিবাহ করিয়া সুখে দিনাতিপাত করিতেছে। একবার সে পুত্রের সঙ্গে পাহাড়ের স্কুলের ছাত্রাবাসে গিয়া সাক্ষাৎ করিয়া বিফল মনোরথে প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হইয়াছিল। পুত্র সরাসরি আনন্দের মুখের ওপর বলিয়াছিল, ইউ আর আ ন্যাষ্টি চ্যাপ। আমি তোমার সাথে কথা বলব না।  

আজ এই প্রায় চল্লিশে উপনীত হইয়া আনন্দচন্দ্রের উপলব্ধি অনেকাংশেই ভিন্নমাত্রার। তাহার ধারণা প্রেম এবং সুখী দাম্পত্যজীবনের জন্য দেহের সঙ্গে মনের যৌগ রসায়নের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। নারী শরীরের ব্যবচ্ছেদে এবং শরীর বিষয়ক ক্রীড়ায় সে যতই পারদর্শী হউক না কেন, তাহাতে পারিবারিক শান্তি রচিত হয়না।  

সম্প্রতি আনন্দ একজন বিধবা যুবতীর সান্নিধ্যে আসিয়াছে। তাহার প্রতিবেশি। নিঃসন্তান। আনন্দের নিঃসঙ্গতা ও ছন্নছাড়া জীবন লক্ষ্য করিয়া সেই মহিলা প্রায়শই আনন্দের কুশল জিজ্ঞাসা করিতে আইসে। মাঝে মধ্যে সে ডাক্তারবাবুর জন্য নিজের হাতে পাক করা ভালমন্দ খাদ্যবস্তুও লইয়া আইসে। তাহার চক্ষের ভাষায় আনন্দ প্রেম ও মমতার লিপি পড়িতে পারে। সে নিজেও দুর্বল হইতেছে ক্রমশ তাহার উপর, ইহা অনুধাবন করিয়াই আনন্দ তাহাকে প্রশ্ন করিল গত সন্ধ্যায়, এমন জীবন ভাল লাগে তোমার?
-  কেমন জীবন? জানিতে চায় সে।
-  এই যে স্বামী সন্তানহীন একাকীত্বের জীবন। ভাইয়ের সংসারে থেকে পরাধীনতার জীবন।

সে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করিয়া উত্তর করিল, একাকীত্ব আপনার নেই? আমার তো স্বামী অকালে মারা গিয়েছে। সন্তান হবার আগেই। আপনার তো সব ছিল। তা সত্ত্বেও আপনি একা হয়ে গেলেন যে?

নীরব থাকিল আনন্দ। এমন যুক্তিপূর্ণ কথা তনয়া নাম্নী এই বিধবা যুবতীর মুখ হইতে তাহাকে শুনিতে হইবে এ জাতীয় ভাবনা কস্মিনকালেও সে করে নাই। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া সে কহিল, ভুল বলতে পার আমারই। লেখাপড়ার শুরু থেকে আজ অব্দি মেয়েদের শরীর নিয়েই ভেবেছি। কিন্তু মন নিয়ে ভাববার সময় হয়নি। তাই বলতে পার, খেসারত দিচ্ছি।

তনয়া বলিল, জানি। সব জানি। আসলে কি জানেন, সব পুরুষই যৌবনকালে বোধহয় ভাবে, মেয়েদের শরীর জয় করতে পারলেই বুঝি সব জিতে নেয়া হল। তা নয়। যারা বুদ্ধিমান, তারা জানে যে নারীর মন জয় করলেই পেয়ে যাবে সে তার গুপ্তধন। এইটেই আসল সত্য। 

গতকাল তনয়া ফিরিয়া গেলে সারা রাত্রি প্রায় বিনিদ্র কাটিয়াছে আনন্দের। জীবন সম্পর্কে এমন অকাট্য বচন ইতিপূর্বে সে কদাপি কাহারও মুখ হইতে শুনিয়াছে বলিয়া স্মরণে আইসে না। ভাবিতে ভাবিতে রাত্রি শেষ হইয়া গিয়াছে। সূর্যোদয়ের পূর্বেই শয্যাত্যাগ করিয়া সে তাহার দ্বিতলের ঝুল বারান্দায় আসিয়া বসিল। বাড়ির কাজের মাসীর আসিবার সময় হয় নাই। দৈনিক পত্রিকাও এত ভোরে ফেলেনা হকার। ইজিচেয়ারে গত রাত্রির অবসাদগ্রস্ত শরীর এলাইয়া দিয়া আনন্দচন্দ্র মনের ভিতরকার বীক্ষিপ্ত সব চিন্তারাশিকে দূরীভূত করিবার নিমিত্তে তনয়ার মুখচ্ছবি মনোমুকুরে প্রস্ফুটিত করিয়া কল্পনা করিতে লাগিল। যদি এই মহিলাটিকে সে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করে তাহাতে কি উভয়ের সুখ চিরস্থায়ী হইবে? অবশ্য তৎপূর্বে আনন্দকে নারীর মন সম্বন্ধিত জ্ঞান অর্জন করিতে হইবে। জমি প্রস্তুত করিতে হইবে।
- কী ব্যাপার, আজ এত সকালে উঠে পড়েছেন?
আনন্দ লক্ষ্য করিল, পাশের বাড়ির ছাদে তনয়া পুষ্প চয়ন করিতেছে টবের গাছ হইতে। প্রফুল্লিত কন্ঠে সে উত্তর করিল, ঘুম হয়নি রাত্তিরে।
-  আমারও, কহিল তনয়া।
আনন্দচন্দ্রের অনুসন্ধানের নতুন বিষয়টি বোধকরি কোন পথ খুঁজিয়া পাইল অথবা পাইল না।